আসছে ওয়াই-ফাই ৮, বদলে যাবে ইন্টারনেট সংযোগের অভিজ্ঞতা
প্রযুক্তির জগতে এতদিন ওয়াই-ফাই মানেই ছিল গতি বাড়ানোর প্রতিযোগিতা। নতুন সংস্করণ এলেই বাড়ত গিগাবিটের হিসাব। তবে সেই ধারা থেকে সরে এসে নতুন দিগন্তের সূচনা করছে ওয়াই-ফাই ৮। এখানে গতি নয়, গুরুত্ব পাচ্ছে স্থিতিশীলতা, নির্ভরযোগ্য সংযোগ এবং বাস্তব ব্যবহার অভিজ্ঞতা। ফলে ভবিষ্যতের বেতার নেটওয়ার্ক হতে যাচ্ছে আরও মসৃণ ও নিরবচ্ছিন্ন।
সম্প্রতি টিপি-লিংক ‘আর্চার ৮’ নামে প্রথম ভোক্তাপর্যায়ের ওয়াই-ফাই ৮ রাউটার প্ল্যাটফর্ম উন্মোচন করেছে। চলতি বছর (২০২৬ সালে) অক্টোবর মাস নাগাদ এটি বাজারে আসতে পারে। তবে সবচেয়ে বড় চমক হলো, এতে গতি বাড়ানোর কোনো বড় প্রতিশ্রুতি নেই। বরং ঘরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত সমান কভারেজ, কম সংযোগ বিচ্ছিন্নতা, উন্নত মেশ রোমিং এবং কম ল্যাটেন্সির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
এই পরিবর্তনের ধারায় শুধু টিপি-লিংকই নয়, যুক্ত হয়েছে আরও বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। ব্রডকম ইতোমধ্যে তাদের প্রথম ওয়াই-ফাই ৮ চিপ উন্মোচন করেছে। আসুস নতুন রাউটার প্রদর্শন করেছে। কোয়ালকম ও মিডিয়াটেকও নিজেদের সিলিকন বাজারে এনেছে। আর্চার ৮ এই প্রযুক্তির প্রথম পূর্ণাঙ্গ ভোক্তা পণ্য, যার সঙ্গে পর্যায়ক্রমে ‘ডেকো ৮’ মেশ সিস্টেম ও ‘রোম ৮’ ট্রাভেল রাউটার যুক্ত হবে।
ওয়াই-ফাই ৮-এর আনুষ্ঠানিক নাম আইইইই ৮০২.১১বিএন, যার ডাকনাম ‘আল্ট্রা হাই রিলায়েবিলিটি’। যদিও ২০২৮ সালের আগে এটি চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার কথা নয়, তবুও এর লক্ষ্য এখনই স্পষ্ট। গত দুই দশকের মতো গতি বাড়ানো নয়, বরং সংযোগকে আরও নির্ভরযোগ্য করে তোলাই এর মূল উদ্দেশ্য।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতীতে প্রতিটি ওয়াই-ফাই মান বাজারে এসেছে সর্বোচ্চ গতির প্রতিশ্রুতি নিয়ে। কিন্তু বাস্তবে সেই গতি খুব কম ক্ষেত্রেই পাওয়া যায়। উদাহরণ হিসেবে, ওয়াই-ফাই ৭ তাত্ত্বিকভাবে ৪৬ গিগাবিট প্রতি সেকেন্ড পর্যন্ত গতি দিতে পারলেও তা প্রায় সবসময়ই পরীক্ষাগারেই সীমাবদ্ধ থাকে।
এ বাস্তবতা থেকেই নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এসেছে ওয়াই-ফাই ৮। এটি একই সর্বোচ্চ সীমা বজায় রেখেও বাস্তব পারফরম্যান্স উন্নত করার ওপর জোর দিচ্ছে। এর অন্যতম প্রধান প্রযুক্তি ‘মাল্টি-অ্যাকসেস পয়েন্ট কো-অর্ডিনেশন’। বর্তমানে একাধিক রাউটার একই স্পেকট্রামে কাজ করতে গিয়ে একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়। ফলে সংযোগ ধীর হয়ে যায় এবং ল্যাটেন্সি বেড়ে যায়। নতুন ব্যবস্থায় রাউটারগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করবে। এতে ডেটা আদান-প্রদান হবে আরও দ্রুত ও স্থিতিশীলভাবে।
এই উন্নয়ন বড় পরিসরের নেটওয়ার্কে সবচেয়ে বেশি কার্যকর হবে। স্টেডিয়াম, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস বা বড় অফিসের মতো জায়গায়, যেখানে হাজারো ডিভাইস একসঙ্গে সংযুক্ত থাকে, সেখানে সংযোগের মান উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। আগে যেখানে চাপ বাড়লে নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়ত, সেখানে এখন তা স্থির থাকবে।
এদিকে দক্ষিণ আফ্রিকায় নতুন স্পেকট্রাম নীতিমালা এই প্রযুক্তির গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। দেশটির নিয়ন্ত্রক সংস্থা সম্প্রতি ৬ গিগাহার্টজ ব্যান্ডের একটি বড় অংশ উন্মুক্ত করেছে। ফলে ওয়্যারলেস ইন্টারনেট সেবাদাতারা এখন আরও বেশি ব্যান্ডউইথ ব্যবহার করতে পারবে এবং উচ্চগতির সেবা দেওয়ার সুযোগ পাবে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এতদিন সীমিত স্পেকট্রামের কারণে ওয়্যারলেস সেবাদাতাদের ভিড়ের মধ্যে কাজ করতে হতো। এখন নতুন ব্যান্ড উন্মুক্ত হওয়ায় তারা ফাইবার সংযোগের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতায় নামতে পারবে।
প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আরেকটি প্রশ্ন হলো, তারা কি ওয়াই-ফাই ৮-এর জন্য অপেক্ষা করবে, নাকি প্রাইভেট ৫জি নেটওয়ার্কে বিনিয়োগ করবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি প্রতিযোগিতা নয়। প্রাইভেট ৫জি স্থাপন ব্যয়বহুল এবং জটিল, অন্যদিকে ওয়াই-ফাই সহজলভ্য এবং তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ওয়াই-ফাই ৮ গতি বাড়ানোর দৌড় থেকে সরে এসে ব্যবহারকারীর বাস্তব অভিজ্ঞতাকে প্রাধান্য দিচ্ছে। এর ফলে ভবিষ্যতে ইন্টারনেট সংযোগ হবে আরও নির্ভরযোগ্য, স্থিতিশীল এবং ব্যবহারবান্ধব।
সূত্র : টেক সেন্ট্রাল