আইফোনের ইউএসবি-সি পোর্টের ১৩ অজানা ব্যবহার
আইফোনের ইউএসবি-সি পোর্ট সাধারণত চার্জ দেওয়ার কাজে ব্যবহার করা হলেও এর মাধ্যমে আরও অনেক ধরনের ডিভাইস সংযুক্ত করা যায়। কিবোর্ড, মাউস, এক্সটার্নাল মনিটর ও স্টোরেজ ড্রাইভ থেকে শুরু করে গেম কন্ট্রোলার, মাইক্রোফোন এবং ডিজিটাল ক্যামেরাও যুক্ত করা সম্ভব। এতে কম্পিউটার ছাড়াই বিভিন্ন কাজ করা যায়। প্রযুক্তিবিষয়ক ওয়েবসাইট হাউ-টু গিকের এক প্রতিবেদনে আইফোনের ইউএসবি-সি পোর্টের এমন ১৩টি ব্যবহারের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
১. কিবোর্ড, মাউস ও ট্র্যাকপ্যাড

সঠিক কেবল বা অ্যাডাপ্টার ব্যবহার করে প্রায় যেকোনো ইউএসবি কিবোর্ড, মাউস ও ট্র্যাকপ্যাড আইফোনে যুক্ত করা যায়। এমনকি লাইটনিং পোর্টযুক্ত অ্যাপলের ম্যাজিক কিবোর্ড ও ম্যাজিক ট্র্যাকপ্যাডও ইউএসবি-এ থেকে ইউএসবি-সি অ্যাডাপ্টারের মাধ্যমে ব্যবহার করা সম্ভব। কিবোর্ড যুক্ত করলেই টাইপ করা যায়। তবে মাউসের কার্সর দেখতে আইফোনের সেটিংস থেকে অ্যাক্সেসিবিলিটি > টাচ > অ্যাসিস্টিভটাচ চালু করতে হবে। এরপর দুই আঙুল দিয়ে স্ক্রল করার সুবিধাও পাওয়া যায়।
ব্লুটুথের মাধ্যমে এসব ডিভাইস ব্যবহার করা গেলেও তারযুক্ত সংযোগে বিলম্ব প্রায় থাকে না। তবে তারযুক্ত ডিভাইস আইফোনের ব্যাটারি থেকে বিদ্যুৎ নিতে পারে।
২. ইউএসবি-সি হাব

ইউএসবি-সি হাবের মাধ্যমে আইফোনে একাধিক পোর্ট যুক্ত করা যায়। একটি কেবলের সাহায্যে কিবোর্ড, স্টোরেজ ড্রাইভসহ বিভিন্ন ডিভাইস সংযুক্ত করা সম্ভব। বিদ্যুৎ সংযোগ সুবিধাযুক্ত বা পাসথ্রু চার্জিং সমর্থনকারী হাব ব্যবহার করলে একই সঙ্গে আইফোন চার্জ দেওয়ার পাশাপাশি অন্য ডিভাইসও ব্যবহার করা যায়। নতুন হাব কেনার আগে সেটির বিবরণে আইফোন বা আইওএস সমর্থনের কথা উল্লেখ আছে কি না, তা দেখে নেওয়া ভালো। তবে আগে থেকে থাকা ইউএসবি-সি হাবও আইফোনে কাজ করতে পারে।
৩. এক্সটার্নাল মনিটর, টিভি ও প্রজেক্টর

ইউএসবি-সি পোর্টের মাধ্যমে আইফোনের ডিসপ্লে এক্সটার্নাল মনিটর, টিভি বা প্রজেক্টরে দেখানো যায়। ভিডিও সিগন্যাল বহনে সক্ষম ইউএসবি-সি কেবল ব্যবহার করে সরাসরি সমর্থিত ডিসপ্লেতে সংযোগ দেওয়া সম্ভব। এ ছাড়া এইচডিএমআই ও ভিজিএ পোর্টযুক্ত অ্যাডাপ্টার এবং ভিডিও আউটপুট সুবিধার ইউএসবি-সি হাবও ব্যবহার করা যায়। লাইটনিং পোর্টযুক্ত আইফোনের ক্ষেত্রে লাইটনিং থেকে ইউএসবি-সি অ্যাডাপ্টার প্রয়োজন হবে।
তবে আইফোনে আইপ্যাড বা ম্যাকের মতো ডেস্কটপ ইন্টারফেস দেখা যাবে না। এতে মূলত আইফোনের ডিসপ্লের উল্লম্ব দৃশ্যই বড় পর্দায় প্রতিফলিত হবে। প্রেজেন্টেশন বা প্রদর্শনীর কাজে এটি উপযোগী হলেও স্যামসাং ডেক্সের মতো ডেস্কটপ অভিজ্ঞতা পাওয়া যাবে না।
৪. এক্সটার্নাল স্টোরেজ ড্রাইভ

ইউএসবি-সি পোর্টে পেনড্রাইভ, এক্সটার্নাল হার্ডড্রাইভ ও এসএসডি যুক্ত করে ফাইল দেখা, কপি করা এবং সংরক্ষণ করা যায়। এমনকি আইফোনের ফাইলস অ্যাপ ব্যবহার করে ড্রাইভ ফরম্যাটও করা সম্ভব। তবে ড্রাইভের ফাইল সিস্টেম হতে হবে এপিএফএস, ম্যাকওএস এক্সটেন্ডেড (এইচএফএস+), এক্সফ্যাট, এফএটি৩২ অথবা এফএটি। ড্রাইভে একটি মাত্র পার্টিশন থাকতে হবে। উইন্ডোজের এনটিএফএস ফরম্যাট সমর্থিত নয়।
আইফোন ১৫ প্রো, ১৬ প্রো ও ১৭ প্রো মডেলে সরাসরি এসএসডিতে উচ্চ বিটরেটের প্রোরেস ভিডিও ধারণ করা যায়। এ ক্ষেত্রে এক্সফ্যাট ফরম্যাটের ড্রাইভ, ১০ গিগাবিট প্রতি সেকেন্ড গতির ইউএসবি ৩ কেবল এবং নির্দিষ্ট রাইট স্পিড প্রয়োজন। ৪কে ৬০ ফ্রেম প্রতি সেকেন্ড ভিডিওর জন্য কমপক্ষে ২২০ মেগাবাইট প্রতি সেকেন্ড এবং ৪কে ১২০ ফ্রেম প্রতি সেকেন্ড ভিডিওর জন্য ৪৪০ মেগাবাইট প্রতি সেকেন্ড রাইট স্পিড থাকতে হবে।
অন্য পোর্টের ড্রাইভও অ্যাডাপ্টারের মাধ্যমে যুক্ত করা যায়। তবে ইউএসবি ৩.০ ড্রাইভ ইউএসবি ২.০ অ্যাডাপ্টারে যুক্ত করলে গতি কমে যাবে। সংযোগ দেওয়ার পর সাধারণত ফাইলস অ্যাপে ড্রাইভটি দেখা যায়।
৫. হেডফোন ও ইয়ারবাড

ইউএসবি-সি থেকে ৩ দশমিক ৫ মিলিমিটার হেডফোন জ্যাকের অ্যাডাপ্টার ব্যবহার করে তারযুক্ত হেডফোন আইফোনে যুক্ত করা যায়। অ্যাপলের নিজস্ব অ্যাডাপ্টারের দাম ৯ মার্কিন ডলার। অন্য প্রতিষ্ঠানের অ্যাডাপ্টারও ব্যবহার করা সম্ভব। এসব অ্যাডাপ্টারের ভেতরে ডিজিটাল অডিও সিগন্যালকে অ্যানালগে রূপান্তরের জন্য ডিএসি বা ডিজিটাল-টু-অ্যানালগ কনভার্টার থাকে।
এ ছাড়া ইউএসবি হেডফোন ও ইয়ারবাড সরাসরি আইফোনে যুক্ত করা যায়। কিছু গেমিং হেডসেট ইউএসবি-সি সমর্থন করে। লাইটনিং পোর্টযুক্ত পুরোনো অ্যাপল ইয়ারপডসও লাইটনিং থেকে ইউএসবি-সি অ্যাডাপ্টারের মাধ্যমে ব্যবহার করা যায়।
৬. তারযুক্ত গেম কন্ট্রোলার

সনি, মাইক্রোসফট ও এইটবিটডোর মতো প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন গেম কন্ট্রোলার আইফোনে ব্যবহার করা যায়। এগুলোর বেশির ভাগ ব্লুটুথে কাজ করলেও ডেটা স্থানান্তর সমর্থনকারী কেবল দিয়ে তারযুক্ত সংযোগও দেওয়া সম্ভব। প্লেস্টেশন ডুয়ালসেন্স কন্ট্রোলারের ইউএসবি-সি পোর্ট থাকায় আইফোনের সঙ্গে সহজেই যুক্ত করা যায়। এ ছাড়া ব্যাকবোন প্রোর মতো কন্ট্রোলার সরাসরি আইফোনে যুক্ত করে গেম খেলা যায়।
তবে সাধারণ তারযুক্ত কন্ট্রোলার ব্যবহারের সময় একই সঙ্গে আইফোন চার্জ দেওয়া সম্ভব নাও হতে পারে। এ ক্ষেত্রে পাসথ্রু চার্জিং সুবিধাযুক্ত কন্ট্রোলার বা ইউএসবি-সি হাব ব্যবহার করা যেতে পারে।
৭. এসডি ও মাইক্রোএসডি কার্ড রিডার

ইউএসবি-সি কার্ড রিডারের মাধ্যমে এসডি ও মাইক্রোএসডি কার্ডের তথ্য আইফোনে দেখা যায়। অনেক ইউএসবি-সি হাবে কার্ড রিডার আগে থেকেই যুক্ত থাকে। কার্ড রিডারে মেমোরি কার্ড না থাকলে আইফোনে সেটি দেখা যাবে না।
কার্ডের তথ্য ফাইলস অ্যাপের মাধ্যমে পড়া ও সংরক্ষণ করা যায়। পাশাপাশি সমর্থিত ছবি সরাসরি ফটোজ অ্যাপে নেওয়ার জন্য কার্ড সংযুক্ত করার পর ইমপোর্ট অপশনও পাওয়া যায়।
৮. ইউএসবি মাইক্রোফোন

ইউএসবি মাইক্রোফোনও সরাসরি আইফোনে ব্যবহার করা যায়। এমনকি পুরোনো মাইক্রোফোনের সংযোগ পোর্ট ভিন্ন হলেও উপযুক্ত অ্যাডাপ্টার দিয়ে যুক্ত করা সম্ভব। সংযোগ দেওয়ার পর আইফোনে মাইক্রোফোন শনাক্ত হলে সেটি ব্যবহারের অনুমতি চাওয়া হয়। তবে যেসব মাইক্রোফোনের জন্য আলাদা বিদ্যুৎ সংযোগ প্রয়োজন, সেগুলোর ক্ষেত্রে কাজ করার নিশ্চয়তা নেই।
৯. ইথারনেট অ্যাডাপ্টার

ইউএসবি-সি থেকে ইথারনেট অ্যাডাপ্টার ব্যবহার করে আইফোনে তারযুক্ত ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়া যায়। অনেক ইউএসবি-সি হাবেও ইথারনেট পোর্ট থাকে। সংযোগ দেওয়ার পর আইফোনের সেটিংসে ওয়াই-ফাইয়ের নিচে আলাদা ইথারনেট অপশন দেখা যায়।
ইথারনেট সংযোগ চালু থাকলে এয়ারপ্লেন মোড ও ওয়াই-ফাই বন্ধ করেও ইন্টারনেট ব্যবহার করা সম্ভব। ওয়াই-ফাইয়ের সমস্যা শনাক্ত করা, তারহীন সংযোগ সম্ভব নয় এমন নেটওয়ার্ক ব্যবহার কিংবা দ্রুতগতিতে ফাইল ডাউনলোড ও নেটওয়ার্ক স্টোরেজ থেকে তথ্য স্থানান্তরের কাজে এটি উপযোগী।
১০. ডিজিটাল ক্যামেরা

ইউএসবি-সি পোর্টের মাধ্যমে ডিজিটাল ক্যামেরা আইফোনে যুক্ত করে ছবি ও ভিডিওসহ বিভিন্ন ফাইল দেখা এবং স্থানান্তর করা যায়। ক্যামেরার মেমোরি কার্ডের তথ্য ফাইলস অ্যাপে দেখা যায়। সমর্থিত ছবি ও ভিডিও ফটোজ অ্যাপেও নেওয়া সম্ভব। তবে কিছু ক্যামেরা স্টোরেজ ডিভাইস হিসেবে কাজ করার জন্য চালু রাখতে হয়।
১১. মিউজিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট ডিজিটাল ইন্টারফেস বা এমআইডিআই ডিভাইস
কিবোর্ডসহ বিভিন্ন এমআইডিআই ডিভাইস আইফোনে যুক্ত করে গান তৈরি ও সংগীত সম্পাদনার কাজ করা যায়। গ্যারেজব্যান্ড, কোয়ালা স্যাম্পলার এবং কেওআরজি ও মুগের মতো প্রতিষ্ঠানের সিনথেসাইজার অ্যাপে এসব ডিভাইসের বোতাম ও কি-গুলো বিভিন্ন কাজের জন্য নির্ধারণ করা যায়।
আইপ্যাডে এ ধরনের কাজ তুলনামূলক সুবিধাজনক হলেও আইফোনেও সংগীত তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় অনেক সুবিধা রয়েছে। দীর্ঘ সময় কাজ করার ক্ষেত্রে পাসথ্রু চার্জিং সুবিধাযুক্ত ইউএসবি-সি হাব ব্যবহার করা যেতে পারে।
১২. ইউএসবি অডিও ইন্টারফেস

ইউএসবি অডিও ইন্টারফেসের মাধ্যমে মাইক্রোফোন, গিটারসহ বিভিন্ন উৎসের অডিও সরাসরি আইফোনে নেওয়া যায়। এমআইডিআই ডিভাইসের মতো এটি সফটওয়্যারের কোনো বাদ্যযন্ত্র চালানোর জন্য ডিজিটাল সংকেত পাঠায় না; বরং অডিও ইনপুট হিসেবে কাজ করে। ফলে ডিজিটাল অডিও ওয়ার্কস্টেশন বা অডিও ইফেক্ট প্রসেসরের মাধ্যমে গান রেকর্ড ও সম্পাদনায় এটি কাজে লাগে।
এমনকি ইউএসবি আউটপুটযুক্ত টার্নটেবলের অডিও আইফোনের মাধ্যমে এয়ারপ্লে সমর্থিত স্পিকার, যেমন হোমপডেও পাঠানো সম্ভব।
১৩. রিচার্জেবল ইউএসবি ডিভাইস

আইফোন শুধু অন্য ডিভাইস থেকে চার্জ নিতে পারে না, প্রয়োজনে পাওয়ার ব্যাংক হিসেবেও কাজ করতে পারে। ইউএসবি কেবলের মাধ্যমে এয়ারপডস, অ্যাপল ওয়াচ কিংবা অন্য আইফোন চার্জ দেওয়া যায়। এ জন্য প্রথমে যে ডিভাইসটি চার্জ দিতে চান, সেটির সঙ্গে কেবল যুক্ত করতে হবে। এরপর কেবলের অন্য প্রান্ত আইফোনে সংযুক্ত করলেই চার্জ দেওয়া শুরু হবে। তবে আইফোনের মাধ্যমে অন্য ডিভাইস তারহীনভাবে চার্জ দেওয়ার সুবিধা নেই।