শিশু নিখোঁজ হলে প্রযুক্তির সহায়তা পাবেন যেভাবে

Staff Reporter

নিজস্ব প্রতিবেদক

রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৬:২৭

শিশু নিখোঁজ হলে প্রযুক্তির সহায়তা পাবেন যেভাবে

কোনো শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের মধ্যে যত বেশি মানুষের কাছে শিশুটির ছবি ও পরিচয়ের তথ্য পৌঁছানো যায়, তাকে খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনাও তত বাড়ে। বাংলাদেশে চালু হওয়া ‘মুন অ্যালার্ট’ এই কাজকে প্রযুক্তিনির্ভর করে তুলেছে। বিশেষ করে মেটার প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিখোঁজ শিশুর তথ্য ফেসবুক, মেসেঞ্জার ও ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমে সম্ভাব্য প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছে অবস্থানভিত্তিকভাবে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

মুন অ্যালার্ট কী?

মুন অ্যালার্টের পূর্ণ নাম ‘মিসিং আর্জেন্ট নোটিফিকেশন’। এটি নিখোঁজ বা অপহৃত শিশুদের দ্রুত খুঁজে পেতে তৈরি জাতীয় জরুরি সতর্কতা ব্যবস্থা। ২০২৬ সালের ১৩ জানুয়ারি সিআইডি ও অ্যাম্বার অ্যালার্ট ফর বাংলাদেশের উদ্যোগে ব্যবস্থাটি চালু করা হয়।

মুন অ্যালার্টের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকেও নিখোঁজ শিশুদের বিভিন্ন তথ্য দেখা যায়। তবে ওয়েবসাইটে তথ্য প্রকাশ করাই পুরো ব্যবস্থার শেষ ধাপ নয়। মূল লক্ষ্য হলো যাচাই করা তথ্য দ্রুত এমন মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া, যারা শিশুটিকে দেখে থাকতে পারেন বা তার অবস্থান সম্পর্কে তথ্য দিতে পারেন।

শিশু নিখোঁজ হলে পরিবারের করণীয়

কোনো শিশু নিখোঁজ হলে পরিবারের সদস্যদের প্রথমে ১৩২১৯ নম্বরে মুন অ্যালার্টের টোল ফ্রি হেল্পলাইনে তথ্য জানাতে হবে। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ অথবা সিআইডির মিসিং চিলড্রেন সেলের ০১৩২০০১৭০৬০ নম্বরেও তথ্য জানানো যায়। মুন অ্যালার্টের মাধ্যমে ওয়েবসাইটেও নিখোঁজ শিশুর তথ্য জানানো যায়। তবে পরিবারের সদস্যকে সরাসরি ফেসবুকে গিয়ে মেটার কাছে আবেদন করতে হয় না। প্রথমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তথ্য পৌঁছাতে হয়। এরপর সিআইডির মিসিং চিলড্রেন সেল তথ্য যাচাই করে এবং শিশুটিকে খুঁজে পেতে জরুরি সতর্কবার্তা প্রয়োজন কি না, তা মূল্যায়ন করে এবং সতর্কবার্তা জারি করে।

তথ্য যাচাইয়ের পর কী হয়?

শিশুর ছবি, নাম, বয়স, সর্বশেষ কোথায় দেখা গেছে এবং প্রয়োজনীয় যোগাযোগের তথ্যসহ একটি সতর্কবার্তা তৈরি করা হয়। এরপর মুন অ্যালার্টের নিজস্ব প্ল্যাটফর্মের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর মাধ্যমে সেটি ছড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ওয়েব পোর্টাল ও মোবাইল অ্যাপের পাশাপাশি অনলাইন ও অফলাইন সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ডিজিটাল বিলবোর্ড, এসএমএস ও সেল ব্রডকাস্টিংয়ের মতো মাধ্যমও ব্যবহার করা যেতে পারে। অর্থাৎ একটি তথ্যকে একই সময়ে একাধিক মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

ফেসবুকের যেভাবে কাজ করে

মুন অ্যালার্টের এই পুরো ব্যবস্থায় ফেসবুকের কাজ হলো নিখোঁজ শিশুর তথ্য সম্ভাব্য প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছে দ্রুত পৌঁছে দেওয়া। ফেসবুক নিজে শিশুটিকে খুঁজে বের করে না এবং শিশুটির অবস্থান সরাসরি শনাক্ত করে না।

মুন অ্যালার্ট থেকে যাচাই করা তথ্য মেটার সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে ফেসবুক, মেসেঞ্জার ও ইনস্টাগ্রামে অবস্থানভিত্তিক সতর্কবার্তা হিসেবে পৌঁছানো হয়। মেটার প্রযুক্তি শিশুটির সর্বশেষ জানা অবস্থান ও সক্রিয় অনুসন্ধান এলাকার ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট এলাকার ব্যবহারকারীদের কাছে সতর্কবার্তা পৌঁছে দিতে পারে।

অর্থাৎ এখানে ফেসবুককে একটি ডিজিটাল সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়ার নেটওয়ার্ক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

যেভাবে ফোনে নোটিফিকেশন আসে 

প্রক্রিয়াটি সহজ করে বললে কয়েকটি ধাপে কাজ করে।

শিশু নিখোঁজ → পরিবার তথ্য জানায় → তথ্য যাচাই → মুন অ্যালার্ট সতর্কবার্তা জারি → মেটার প্রযুক্তিতে তথ্য পাঠানো → অবস্থানভিত্তিক ব্যবহারকারীদের কাছে নোটিফিকেশন আসে। পরবর্তীতে সম্ভাব্য প্রত্যক্ষদর্শীরা তথ্য দেন।

কোনো ব্যবহারকারীর ফেসবুক বা মেসেঞ্জারে তখন ‘Find a missing child in your area’ ধরনের বার্তা দেখা যেতে পারে। ব্যবহারকারী নোটিফিকেশনে প্রবেশ করে শিশুটির ছবি ও প্রয়োজনীয় তথ্য দেখতে পারেন। আশপাশে শিশুটিকে দেখে থাকলে তিনি পুলিশ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তথ্য দিতে পারেন।

এটি সাধারণ ফেসবুক পোস্টের মতো সবার নিউজফিডে একইভাবে দেখানোর ব্যবস্থা নয়। মেটার তথ্য অনুযায়ী, সক্রিয় অনুসন্ধান এলাকার ব্যবহারকারীদের লক্ষ্য করে অবস্থানভিত্তিক সতর্কবার্তা দেওয়া হয়।

প্রযুক্তিটি বাস্তবে যেভাবে কাজে এসেছে

মুন অ্যালার্ট ও মেটার সমন্বিত ব্যবস্থার কার্যকারিতার একটি উদাহরণও রয়েছে। ঢাকার মিরপুরে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন এক শিশুকে খুঁজে পেতে একজন ফার্মেসি কর্মী মেসেঞ্জারে পাওয়া নিখোঁজ শিশুর সতর্কবার্তা দেখেছিলেন। প্রায় এক ঘণ্টা পর নিজের দোকানের কাছে একই শিশুকে দেখতে পেয়ে তিনি পুলিশকে খবর দেন। পরে শিশুটিকে উদ্ধার করা হয়।

এই ঘটনায় প্রযুক্তির ভূমিকা ছিল সরাসরি শিশুটিকে শনাক্ত করা নয়। বরং শিশুটির তথ্য এমন একজন মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া, যিনি ঘটনাস্থলের কাছাকাছি ছিলেন এবং শিশুটিকে দেখে চিনতে পেরেছিলেন।

সবাই কি নোটিফিকেশন পাবেন?

মুন অ্যালার্টের সতর্কবার্তা সাধারণ বিজ্ঞাপনের মতো সবার কাছে পাঠানো হয় না। সক্রিয় অনুসন্ধান এলাকা ও ব্যবহারকারীর অবস্থানের মতো বিষয় বিবেচনা করে সম্ভাব্য ব্যবহারকারীদের কাছে সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়। ফলে একই সময়ে দেশের অন্য প্রান্তে থাকা একজন ব্যবহারকারীর কাছে ওই নোটিফিকেশন নাও আসতে পারে। এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার থাকা জরুরি। অবস্থানভিত্তিক নোটিফিকেশন মানে ফেসবুক শিশুটিকে ট্র্যাক করছে না। শিশুটির সর্বশেষ জানা অবস্থান বা সক্রিয় অনুসন্ধান এলাকার তথ্য ব্যবহার করে সম্ভাব্য প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছে সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়াই এই প্রযুক্তির মূল কাজ।

পরিবারের জন্য প্রযুক্তির সুবিধা কোথায়?

আগে কোনো শিশু নিখোঁজ হলে পরিবারকে পুলিশ, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলাদাভাবে তথ্য ছড়িয়ে দিতে হতো। মুন অ্যালার্ট সেই প্রক্রিয়াকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার মধ্যে আনতে কাজ করে।

পরিবার একটি নির্দিষ্ট চ্যানেলে তথ্য জানাবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তথ্য যাচাই করবে। এরপর প্রয়োজন হলে মুন অ্যালার্ট সতর্কবার্তা জারি করবে। সেই সতর্কবার্তা মেটার প্রযুক্তির মাধ্যমে সম্ভাব্য প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছে পৌঁছে যেতে পারে।

অর্থাৎ একজন ভুক্তভোগী পরিবারের জন্য ফেসবুক ব্যবহারের মূল সুবিধা হলো নিজেদের পোস্টের ওপর নির্ভর না করেও যাচাই করা নিখোঁজ শিশুর তথ্যকে সম্ভাব্য প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ পাওয়া।

কেন প্রযুক্তিটি গুরুত্বপূর্ণ?

নিখোঁজ শিশুকে উদ্ধারে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মুন অ্যালার্টের লক্ষ্য হলো একটি শিশুর নিখোঁজ হওয়ার তথ্য দ্রুত যাচাই করে একাধিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া। আর মেটার অবস্থানভিত্তিক প্রযুক্তি সেই তথ্যকে আরও নির্দিষ্ট ব্যবহারকারীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করছে।

ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখানে শুধু তথ্য প্রকাশের জায়গা হিসেবে কাজ করছে না। বরং নিখোঁজ শিশুর তথ্য, প্রযুক্তি ও সম্ভাব্য প্রত্যক্ষদর্শীকে একই ব্যবস্থার মধ্যে যুক্ত করার একটি যোগাযোগ নেটওয়ার্ক হিসেবে কাজ করছে।

টেকওয়ার্ল্ডের আপডেটেড খবর পেতে WhatsApp চ্যানেল ফলো করুন