পুরোনো ইউএসবি ড্রাইভের ব্যতিক্রমী ৯ ব্যবহার

Staff Reporter

নিজস্ব প্রতিবেদক

শুক্রবার, ৩ অক্টোবর ২০২৫, ১৮:২৬

পুরোনো ইউএসবি ড্রাইভের ব্যতিক্রমী ৯ ব্যবহার
ছবি : বিজিআর

আমরা সাধারণত ইউএসবি ড্রাইভকে শুধু ডকুমেন্ট, ছবি কিংবা গান রাখার জন্য ব্যবহার করি। এক সময় ফাইল এক কম্পিউটার থেকে আরেক কম্পিউটারে নেওয়ার জন্য এটি ছিল ভরসার একমাত্র হাতিয়ার। কিন্তু এখন ক্লাউড স্টোরেজ বা অনলাইন ফাইল শেয়ারিং এত সহজ হয়ে গেছে যে পুরোনো ইউএসবি ড্রাইভগুলো আলমারির ড্রয়ারে পড়ে ধুলো জমছে।

আসলে এই ড্রাইভগুলোর ব্যবহার এখানেই শেষ নয়। চাইলে এগুলোকে নতুনভাবে কাজে লাগানো যায়। সঠিকভাবে ব্যবহার করলে পুরোনো ও ছোট মেমোরির ইউএসবি ড্রাইভও হতে পারে নিরাপত্তা, পারফরম্যান্স বা এমনকি সৃজনশীল কাজের অংশ। অনেকগুলো ব্যবহার আবার এতটাই সহজ যে যেকেউ চেষ্টা করতে পারেন। এখানে থাকছে এমনই নয়টি স্মার্ট উপায়, যা ইউএসবি ড্রাইভকে শুধু স্টোরেজের বাইরে নিয়ে গিয়ে নতুন জীবন দেবে।

১. ইউএসবি ড্রাইভকে বানান লগ-ইন উপকরণ
আমরা সবাই জানি পাসওয়ার্ডে ভরসা করা পুরোপুরি নিরাপদ নয়। সাধারণ পাসওয়ার্ড সহজেই অনুমান করা যায়, আবার ভুলেও যাওয়া যায়। টাইপ করাও বিরক্তিকর হয়ে ওঠে। এই সমস্যার সমাধান হতে পারে একটি পুরোনো ইউএসবি ড্রাইভকে লগ-ইনের ফিজিক্যাল চাবি বানানো।

‘ইউএসবি র‌্যাপ্টর’ বা ‘রোহোস লগ-অন কী’ এর মতো সফটওয়্যার ব্যবহার করে কম্পিউটারকে এমনভাবে সেটআপ করা যায় যাতে শুধু নির্দিষ্ট একটি ইউএসবি লাগালে তবেই কম্পিউটার চালু হবে। ইউএসবি সরিয়ে ফেললেই আবার লক হয়ে যাবে।

এতে আলাদা পাসওয়ার্ড টাইপের ঝামেলা কমে যায়, আবার নিরাপত্তাও বেড়ে যায়। ছোট আকারের ড্রাইভও এই কাজে যথেষ্ট।

২. ইউএসবি দিয়ে বহন করুন লিনাক্স অপারেটিং সিস্টেম
একটা পুরো অপারেটিং সিস্টেম পকেটে বহন করা শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও ইউএসবি দিয়ে তা সম্ভব। হালকা সংস্করণের লিনাক্স অপারেটিং সিস্টেম যেমন পাপি লিনাক্স, স্ল্যাক্স বা পোর্টিয়াস সহজেই একটি ইউএসবিতে ইনস্টল করা যায়।

একবার সেটআপ হয়ে গেলে যেকোনো কম্পিউটারে ইউএসবি থেকে সরাসরি লিনাক্স চালানো যায়, মূল মেশিনে কোনো প্রভাব না ফেলেই। এটা কাজে লাগবে পিসি ঠিকঠাক না চালু হলে, নতুন সফটওয়্যার পরীক্ষা করতে বা অন্যের কম্পিউটারে নিজের পরিবেশে কাজ করতে।

প্রক্রিয়াটাও কঠিন নয়। আপনার পছন্দের লিনাক্স ভার্সন ডাউনলোড করে ‘রুফাস’ বা ‘ব্যালেনা এচার’ সফটওয়্যারের সাহায্যে বুটেবল ইউএসবি তৈরি করতে হবে। এরপর ইউএসবি লাগালেই সেটি থেকে কম্পিউটার চালু করা যাবে।

৩. বানিয়ে নিন উইন্ডোজ রিকভারি ড্রাইভ
কম্পিউটার চালু না হলে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি পোহাতে হয়। ভাইরাস, ফাইল নষ্ট হওয়া বা আপডেট ব্যর্থ হওয়ার মতো কারণে উইন্ডোজ বুট করতে পারে না। এই পরিস্থিতিতে ইউএসবি ড্রাইভকে বানানো যায় রিকভারি টুল।

একটি সচল উইন্ডোজ পিসিতে গিয়ে সার্চ বক্সে লিখতে হবে ‘ক্রিয়েট আ রিকভারি ড্রাইভ’। নির্দেশনা অনুযায়ী একটি ইউএসবি ড্রাইভ লাগালে উইন্ডোজ প্রয়োজনীয় ফাইলগুলো সেখানে কপি করে দেবে। অন্তত ১৬ গিগাবাইটের ড্রাইভ ব্যবহার করা ভালো, কারণ এতে সিস্টেম ফাইলও যুক্ত থাকে। এই রিকভারি ড্রাইভ দিয়ে প্রয়োজনে উইন্ডোজ মেরামত বা পুনরায় ইনস্টল করা যায়। জরুরি সময়ে এটি জীবনরক্ষক হয়ে উঠতে পারে।

৪. ইউএসবি ডেড ড্রপ তৈরি করুন
‘ডেড ড্রপ’ শব্দটি এসেছে গুপ্তচর কাহিনি থেকে, যেখানে গোপন বার্তা রেখে যাওয়া হতো নির্দিষ্ট জায়গায়। ২০১০ সালে শিল্পী আরাম বারথল এই কনসেপ্টকে আধুনিক রূপ দেন। তিনি শহরের দেয়াল বা পাবলিক স্পেসে ইউএসবি লাগিয়ে দেন, যেখানে মানুষ এসে ডাটা শেয়ার করতে পারে।

আপনিও চাইলে পুরোনো ইউএসবিকে ডেড ড্রপ বানাতে পারেন। সেখানে ছবি, কবিতা, ছোট গল্প বা যে কোনো সৃজনশীল কনটেন্ট রেখে পাবলিক জায়গায় সেটি বসিয়ে দিলে অন্যরা এসে আবিষ্কার করতে পারবে। চাইলে তারাও নতুন কনটেন্ট যোগ করতে পারবে।

তবে সতর্কতা জরুরি। পাবলিক ইউএসবি ব্যবহারে ভাইরাসের ঝুঁকি থাকে। তাই আলাদা বা পুরোনো কম্পিউটারে এই পরীক্ষা করা ভালো। নিরাপদভাবে করলে এটি হয়ে উঠতে পারে মজার এক শিল্প ও যোগাযোগ মাধ্যম।

৫. ইউএসবি থেকে চালান পোর্টেবল অ্যাপ

অপারেটিং সিস্টেম ইনস্টল না করেও শুধু প্রিয় সফটওয়্যারগুলো ইউএসবিতে বহন করা যায়। এ ধরনের অ্যাপকে বলে পোর্টেবল অ্যাপ। যেমন ব্রাউজার, মিডিয়া প্লেয়ার বা অফিস টুলের পোর্টেবল ভার্সন পাওয়া যায়। চাইলে ‘পোর্টেবলঅ্যাপস’ প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সব অ্যাপ এক জায়গায় ম্যানেজও করতে পারবেন। জনপ্রিয় সফটওয়্যার যেমন ক্রোম, লিব্রেঅফিস, জিম্প বা ভিএলসি মিডিয়া প্লেয়ার পাওয়া যায় পোর্টেবল ফরম্যাটে।

এভাবে ইউএসবিতে রাখা অ্যাপ অন্য কারও কম্পিউটারে চালালে কোনো ডাটা ফেলে যায় না। বিশেষ করে অফিস বা লাইব্রেরির কম্পিউটার যেখানে কিছু ইনস্টল করার অনুমতি থাকে না, সেখানে এটি কার্যকর।

৬. বানান পোর্টেবল অ্যান্টিভাইরাস স্টিক

কিছু ভাইরাস এতটাই শক্তিশালী হয় যে কম্পিউটারই চালু হতে দেয় না। ইনস্টল করা অ্যান্টিভাইরাসও বন্ধ করে দেয়। এই ক্ষেত্রে কাজে আসে পোর্টেবল অ্যান্টিভাইরাস ইউএসবি।

পুরোনো একটি ইউএসবিতে কাস্পারস্কি রেসকিউ ডিস্কের মতো বুটেবল অ্যান্টিভাইরাস টুল সেটআপ করে রাখুন। পিসি চালু না হলে হার্ডড্রাইভ থেকে না চালিয়ে ইউএসবি থেকে চালু করুন। এতে ভাইরাস সিস্টেমে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না, অ্যান্টিভাইরাস সহজে স্ক্যান ও মুছে ফেলতে পারবে।

এইভাবে পিসিকে পুনরায় ইন্সটল না করেও জটিল ভাইরাস সমস্যা সমাধান করা সম্ভব।

৭. বাড়ান কম্পিউটারের গতি
পুরোনো কম্পিউটার ধীরগতির হলে সবসময় নতুন কেনার প্রয়োজন পড়ে না। উইন্ডোজে ‘রেডিবুস্ট’ নামের একটি ফিচার আছে, যা ইউএসবি ড্রাইভকে অতিরিক্ত মেমোরি হিসেবে ব্যবহার করে।

এর ফলে প্রায়ই ব্যবহৃত ফাইলগুলো দ্রুত অ্যাক্সেস করা যায়। শুধু ইউএসবি ড্রাইভ লাগিয়ে প্রপার্টিজ থেকে রেডিবুস্ট চালু করলেই হবে। এতে সীমিত র‍্যাম বা ধীর গতির হার্ডড্রাইভের পিসিতেও কিছুটা গতি বাড়বে।

অবশ্য সলিড-স্টেট ড্রাইভের মতো দ্রুত হবে না, কিন্তু পুরোনো কম্পিউটার টেনে নেওয়ার জন্য যথেষ্ট সহায়ক।

৮. বানান নেটওয়ার্ক অ্যাটাচড স্টোরেজ
অনেক ওয়াই-ফাই রাউটারেই ইউএসবি পোর্ট থাকে। সেখানে পুরোনো ইউএসবি ড্রাইভ লাগালেই সেটি হয়ে যাবে নেটওয়ার্ক অ্যাটাচড স্টোরেজ।

এভাবে বাড়ির যে কেউ একই নেটওয়ার্কে যুক্ত থাকলেই সেই ড্রাইভে রাখা ফাইল অ্যাক্সেস করতে পারবে। আলাদা করে ইমেইল করা বা ক্লাউড সার্ভিসে আপলোড করার দরকার নেই।

সেটআপ প্রক্রিয়াও সহজ। রাউটারের সেটিংসে গিয়ে ফাইল শেয়ারিং চালু করতে হবে। চাইলে অ্যাক্সেস পারমিশনও নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। ড্রাইভটি এরপর কম্পিউটারে শেয়ার্ড ফোল্ডারের মতোই দেখা দেবে।

৯. ইউএসবি দিয়ে বানান পাসওয়ার্ড লকার
আজকের দিনে ডজন ডজন অনলাইন অ্যাকাউন্ট থাকে, আর সব পাসওয়ার্ড মনে রাখা কঠিন। ব্রাউজারে সেভ করাও নিরাপদ নয়। এর সমাধান হতে পারে একটি অফলাইন পাসওয়ার্ড লকার ইউএসবি।

সব পাসওয়ার্ড একটি ডকুমেন্টে লিখে ইউএসবিতে রাখুন। তারপর সেটিকে এনক্রিপশন দিয়ে সুরক্ষিত করুন। ফ্রি টুল যেমন ‘কিপাস’ বা ‘ভেরাক্রিপ্ট’ ব্যবহার করতে পারেন। উইন্ডোজ ব্যবহারকারীরা চাইলে ‘বিটলকার’ দিয়েও ড্রাইভ লক করতে পারবেন।

এরপর শুধু একটি মাস্টার পাসওয়ার্ড দিয়ে ইউএসবি আনলক করা যাবে। এতে পাসওয়ার্ডগুলো থাকবে অফলাইনে, হ্যাকার বা ফিশিং আক্রমণ থেকে দূরে।

পুরোনো ইউএসবি ড্রাইভকে শুধু ফাইল স্টোরেজ হিসেবে ভাবার দিন শেষ। একটু সৃজনশীল হলে এগুলো হতে পারে নিরাপত্তা চাবি, পোর্টেবল অপারেটিং সিস্টেম, রিকভারি টুল, এমনকি শিল্পকর্মের অংশ।

বর্তমান তরুণ প্রজন্মের জন্য এগুলো হয়ে উঠতে পারে প্রযুক্তি নিয়ে খেলার এক মজার উপায়। ড্রয়ারে পড়ে থাকা ইউএসবি ড্রাইভগুলোকে কাজে লাগান; দেখবেন এদের নতুন রূপ কতটা কার্যকর হতে পারে।

সূত্র : বিজিআর