ই-ক্যাব সদস্যদের সরকারি সেবায় কেন জরুরি একটি রেগুলেটরি হেল্পডেস্ক
একজন ছোট অনলাইন উদ্যোক্তার দিনটা কেমন যায়, একবার ভাবুন। সকালে অর্ডার প্যাক করা, দুপুরে কুরিয়ারে পাঠানো, সন্ধ্যায় পেজের মেসেজের উত্তর দেওয়া। এর মধ্যে যদি ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন, ভ্যাট নিবন্ধন বা ডিজিটাল বিজনেস আইডেন্টিটি (ডিবিআইডি) আবেদন আটকে যায়, তাহলে পুরো সপ্তাহটাই চলে যায় দপ্তরে দপ্তরে ঘুরে। বাংলাদেশের ই-কমার্সের বড় অংশই এমন ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা (এসএমই)। তাঁদের সবচেয়ে বড় বাধা অনেক সময় বাজার বা পুঁজি নয়। বাধা হলো নিয়মকানুনের জটিলতা।
একটি সংখ্যা দিয়ে শুরু করি
ই-কমার্সে শৃঙ্খলা ও গ্রাহকের আস্থা ফেরাতে সরকার ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ডিবিআইডি চালু করে। কিন্তু দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানের ৮৫ শতাংশের বেশি সনদ পায়নি। খাতসংশ্লিষ্টরা এর কারণ হিসেবে জটিল ও দীর্ঘ প্রক্রিয়াকে দায়ী করেছেন। আরেক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ই-ক্যাবের আওতাধীন প্ল্যাটফর্মগুলোর মাত্র ২ শতাংশ আবেদন করেছে, আর তাদের প্রায় ১৪ শতাংশ আইডি পেয়েছে।
অর্থাৎ নীতি আছে, কিন্তু উদ্যোক্তা আর নীতির মাঝখানে কোনো সেতু নেই।
এই ঝুঁকি এখন আরও বাড়ছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের খসড়া ক্রস-বর্ডার ডিজিটাল কমার্স নীতি ২০২৬-এ সীমান্তপারের সব ডিজিটাল বাণিজ্যের জন্য ডিবিআইডি বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব আছে। যে উদ্যোক্তা আজ দেশীয় নিবন্ধনেই আটকে আছেন, কাল তিনি রপ্তানির সুযোগ থেকেও ছিটকে পড়বেন।
ই-ক্যাব কী করেছে, কী বাকি আছে
ই-ক্যাব শুরু থেকেই ডিবিআইডির পক্ষে ছিল। প্রক্রিয়া সহজ করতে মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার প্রস্তাবও দিয়েছে। কিন্তু এগুলো মূলত নীতি-পর্যায়ের অ্যাডভোকেসি। একজন নির্দিষ্ট সদস্যের নির্দিষ্ট ফাইল আটকে গেলে তিনি কোথায় যাবেন, কে বিষয়টি দেখবেন, কত দিনে উত্তর পাবেন, এর কোনো স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা আমার চোখে পড়েনি। এই শূন্যতা পূরণ করতে পারে একটি রেগুলেটরি হেল্পডেস্ক।
হেল্পডেস্ক কেমন হবে
হেল্পডেস্ক মানে তদবিরের দোকান নয়। নিয়মের বাইরে কিছু পাইয়ে দেওয়াও এর কাজ নয়। এর কাজ হবে সদস্যকে সঠিক পথ দেখানো, আর যেখানে সমস্যাটা পদ্ধতিগত, সেটা সরকারের টেবিলে তোলা। আমার প্রস্তাব চার স্তরের:
১. ফোন, হোয়াটসঅ্যাপ ও অনলাইন ফর্মে সমস্যা জমা দেওয়া যাবে। প্রতিটি অনুরোধের একটি টিকিট নম্বর থাকবে, আর ৭২ ঘণ্টার মধ্যে প্রথম সাড়া দেওয়া হবে।
২. ট্রেড লাইসেন্স, ডিবিআইডি, ভ্যাট ও কোম্পানি নিবন্ধনের প্রতিটির জন্য বাংলায় হালনাগাদ চেকলিস্ট ও সাধারণ ভুলের তালিকা থাকবে। কারণ অধিকাংশ আবেদন বাতিল হয় ছোটখাটো ভুলে।
৩. সদস্যদের মধ্য থেকেই আইনজীবী, হিসাববিদ ও কাস্টমস-অভিজ্ঞদের নিয়ে একটি প্যানেল হবে। তাঁরা নির্ধারিত দিনে বিনামূল্যে বা নামমাত্র ফিতে পরামর্শ দেবেন।
৪. কোন সমস্যা কতবার এল, কোথায় আটকাল, সেই তথ্য দিয়ে প্রতি তিন মাসে একটি প্রতিবেদন তৈরি হবে। প্রতিবেদনটি যাবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল কমার্স সেল, আরজেএসসি, এনবিআর ও সিটি করপোরেশনের কাছে।
চতুর্থ স্তরটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আজ আমরা সরকারের কাছে যাই উদাহরণ নিয়ে, কাল যাব সংখ্যা নিয়ে। "উদ্যোক্তারা হয়রানির শিকার" বলার চেয়ে "গত তিন মাসে এতগুলো ডিবিআইডি আবেদন একই কারণে আটকেছে" বলা অনেক বেশি কার্যকর।
কেন ই-ক্যাবের নিজস্ব কার্যালয় দরকার
হেল্পডেস্ক চালাতে লাগে স্থায়ী জায়গা, প্রশিক্ষিত কর্মী আর ধারাবাহিকতা। কমিটি বদলালে এগুলো হারিয়ে যাওয়া উচিত নয়। তাই ঢাকায় ই-ক্যাবের নিজস্ব স্থায়ী কার্যালয় আর সেখানে হেল্পডেস্ক স্থাপন একই পরিকল্পনার দুই অংশ।
হেল্পডেস্কে যে প্রশ্নগুলো বারবার আসবে, সেগুলোই হবে সদস্যদের বিনামূল্যে প্রশিক্ষণের বিষয়। যেমন ভ্যাট কমপ্লায়েন্স, ডিজিটাল ইনভয়েসিং, ডিবিআইডি আবেদন। ভবিষ্যতে একটি ই-ক্যাব ইনস্টিটিউটের ভিত্তিও তৈরি হতে পারে এখান থেকেই। সমস্যা থেকে শেখা, আর শেখা থেকে সমাধান।
ই-ক্যাবের সদস্যরা সচেতন ও নীতি বোঝেন এমন উদ্যোক্তা। তাঁরা প্রতিশ্রুতি নয়, কাঠামো চান। আমি বিশ্বাস করি, একটি বাণিজ্য সংগঠনের সাফল্য মাপা উচিত অনুষ্ঠানের সংখ্যা দিয়ে নয়। মাপা উচিত কতজন সদস্যের আটকে থাকা ফাইল সচল হলো, তা দিয়ে। রেগুলেটরি হেল্পডেস্ক সেই মাপকাঠি তৈরির প্রথম ধাপ।
লেখক পরিচিতি:
কাজী মুকিতুজ্জামান উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারী। তিনি টপ মোর-এর স্বত্বাধিকারী, যা প্যাকেজিং, উৎপাদন ও ট্রেডিংয়ে যুক্ত; কেয়ার বিজনেস-এর মাধ্যমে অনলাইন রিটেইলেও কাজ করছেন।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ, ঢাকা কলেজ থেকে বিবিএ এবং পরবর্তীতে এলএলবি সম্পন্ন করেছেন; ব্যবস্থাপনা ও আইনের এই সমন্বয়ই তাঁর ব্যবসা ও নীতি-ভাবনার ভিত্তি।
*এই লেখায় প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব; এটি টেকওয়ার্ল্ড বাংলাদেশের সম্পাদকীয় অবস্থানের প্রতিফলন নয়।