জাতীয় এআই ইকোসিস্টেম গড়ার আহ্বানে অনুষ্ঠিত হলো এআই বিজনেস সামিট

TechWorld Desk

টেকওয়ার্ল্ড ডেস্ক

শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬, ১৯:৩০

জাতীয় এআই ইকোসিস্টেম গড়ার আহ্বানে অনুষ্ঠিত হলো এআই বিজনেস সামিট
ছবি : সংগৃহীত

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) বৈশ্বিক অগ্রগতির সঙ্গে তাল মেলাতে এবং দেশের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে একটি সমন্বিত জাতীয় এআই ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন নীতিনির্ধারক, ব্যবসায়ী ও প্রযুক্তি খাতের উদ্যোক্তারা। তাদের মতে, এআই খাতে দেশীয় সক্ষমতা বাড়ানো, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, গবেষণা ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে সরকার, বেসরকারি খাত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর অংশীদারত্ব প্রয়োজন।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হয়েছে দিনব্যাপী ‘বাংলাদেশ এআই বিজনেস সামিট ২০২৬’। দেশে প্রথমবারের মতো আয়োজিত এ সামিটের যৌথ আয়োজক ছিল ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) ও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়।

সামিটের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস দুলু এবং ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান।

উদ্বোধনী পর্বের পর এআইয়ের সম্ভাবনা, প্রতিবন্ধকতা ও ব্যবসায়িক প্রয়োগ নিয়ে তিনটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সরকারের নীতিনির্ধারক, ব্যবসায়ী নেতা, উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও তরুণ গবেষকরা অংশ নেন।

প্রথম অধিবেশনে এআইয়ের রূপান্তর, প্রয়োগ, সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা হয়। এতে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, এআই বিশ্ব অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনছে। ব্যবসা পরিচালনা, শিল্প উৎপাদন ও প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে এ প্রযুক্তির প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে। বাংলাদেশেও ডিজিটাল সেবা, স্বয়ংক্রিয়করণ, তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসায়িক সমাধানে এআইয়ের ব্যবহার বাড়ছে।

তবে সীমিত প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, দক্ষ পেশাজীবীর অভাব, বাস্তবায়নে উচ্চ ব্যয় এবং সাইবার নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ এ খাতের অগ্রগতিতে বাধা তৈরি করছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

দ্বিতীয় অধিবেশনে শিল্প ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সংযোগ এবং ব্যবসায়িক উদ্ভাবনে এআইয়ের প্রয়োগ নিয়ে আলোচনা হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। তিনি বলেন, দেশে পর্যাপ্ত সুযোগের অভাবে অনেক মেধাবী তরুণ বিদেশে কাজ করছেন এবং বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করছেন। তাদের মেধা ও বিনিয়োগ দেশের উন্নয়নে কাজে লাগাতে সরকার কার্যকর পরিবেশ বা ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে চায়। এ লক্ষ্যে নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে।

এ অধিবেশনে ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি রিজওয়ান রহমান বলেন, এআই উপযোগী দক্ষ জনশক্তি ও ব্যবসায়িক পরিবেশ গড়ে তুলতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠ্যক্রমের সঙ্গে শিল্প ও ব্যবসায়িক খাতের চাহিদার সমন্বয় জরুরি। এআই বিষয়ে মৌলিক জ্ঞান, তথ্য বিশ্লেষণ এবং বাস্তব সমস্যার সমাধানের দক্ষতা অর্জনে গুরুত্ব দিতে হবে।

এফএলএএক্সের সভাপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর শিক্ষা ও গবেষণায় বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। এ জন্য বিনিয়োগের ক্ষেত্রে শুল্ক অব্যাহতির সুযোগ এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে মেধাস্বত্ব আইন আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন তিনি। পাশাপাশি শিল্প খাতের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের এআইভিত্তিক সেবা চালুর বড় সুযোগ রয়েছে বলে মন্তব্য করেন।

অন্যদিকে ট্রান্সকম লিমিটেডের গ্রুপ সিইও সিমিন রহমান শিল্প খাতের উৎপাদনশীলতা ও সক্ষমতা বাড়াতে এআইয়ের ব্যবহার সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেন।

তৃতীয় অধিবেশনে স্থানীয় মেধা ও প্রযুক্তির মাধ্যমে সবার জন্য এআই নিশ্চিত করার বিষয়ে আলোচনা হয়। এতে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে এআইয়ের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে এআই এজেন্টগুলোকে দেশের ভাষা, সংস্কৃতি ও জীবনাচরণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। একই সঙ্গে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকেও এ প্রযুক্তির আওতায় আনতে হবে। দেশীয় এআই অ্যাপ্লিকেশনের সম্প্রসারণে কূটনৈতিক আলোচনা ও বৈশ্বিক অংশীদারত্ব বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।

সামিটের সমাপনী অধিবেশনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বয়ে দেশে একটি জাতীয় এআই ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন।

সামিটের বিভিন্ন অধিবেশনে আরও বক্তব্য দেন ডিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি ও ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ড. মো. সবুর খান, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক (আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও তথ্যপ্রযুক্তি) ড. সৈয়দ মুনতাসির মামুন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. আবদুর রাজ্জাক, ব্রেইন স্টেশন ২৩-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা রাইসুল কবীর, মার্কোপোলোর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তাসফিয়া তাসবীন, পাঠাওয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফাহিম আহমেদ, বুয়েটের শিক্ষার্থী মো. রাহিনুর রহমান এবং ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির শিক্ষার্থী তৌসিফা ইসলাম।

সামিট উপলক্ষে আয়োজিত ‘এআই বিজনেস এক্সপো’তে দেড় শতাধিক স্টলে এআইভিত্তিক পণ্য ও সেবা প্রদর্শন করেন দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তারা। পাশাপাশি দেশের ২০টি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ উদ্ভাবক ও উদ্যোক্তারা নিজেদের উদ্ভাবিত পণ্য ও প্রযুক্তি তুলে ধরেন।

আয়োজকদের মতে, এ প্রদর্শনীর মাধ্যমে তরুণ উদ্ভাবক, স্থানীয় উদ্যোক্তা ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ব্যবসায়িক ধারণা বিনিময় এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।

টেকওয়ার্ল্ডের আপডেটেড খবর পেতে WhatsApp চ্যানেল ফলো করুন