যুক্তরাষ্ট্রে কিশোর সুরক্ষা আইন নিয়ে আপত্তি মেটা, গুগল ও টিকটকের
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে ১৬ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপের নতুন আইনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে মেটা, গুগল ও টিকটক। আইনটি কার্যকর হলে কিশোরদের জন্য স্বয়ংক্রিয় ভিডিও চালু এবং ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী সাজানো কনটেন্ট দেখানোর সুবিধা বন্ধ করতে হবে প্ল্যাটফর্মগুলোকে।
টেকক্রাঞ্চের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল রব বন্টাকে বিবাদী করে আলাদা মামলা করেছে তিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। গভর্নর গ্যাভিন নিউসম গত সেপ্টেম্বরে এবি ১৭০৯ নামের আইনটিতে সই করেন। আগামী বছরের শুরুতে আইনটি কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।
আইন অনুযায়ী, ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিডিও চালু এবং ব্যক্তিগত পছন্দের ভিত্তিতে কনটেন্ট সাজিয়ে দেখানো যাবে না। এসব সুবিধা বন্ধ না করলে সংশ্লিষ্ট কিশোরদের অ্যাকাউন্ট মুছে ফেলতে হবে। আইন অমান্য করলে ১৬ বছরের কম বয়সী প্রতি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবহারকারীর জন্য সর্বোচ্চ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
মেটার দাবি, আইনটি যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রথম সংশোধনীতে নিশ্চিত করা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিপন্থী। কারণ, এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোর কনটেন্ট প্রদর্শনের নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগ শালীনতা আইনের ২৩০ ধারা অনুযায়ী, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ব্যবহারকারীদের প্রকাশিত কনটেন্টের দায় থেকে সুরক্ষা পাওয়ার যে বিধান রয়েছে, নতুন আইনটি তার সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। টিকটক ও গুগলও একই ধরনের যুক্তি দেখিয়েছে।

মামলায় মেটা বলেছে, প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী কনটেন্ট সুপারিশ করে এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিডিও চালু রাখে। নতুন আইন কার্যকর হলে এসব সুবিধা পরিবর্তন না করা পর্যন্ত কিশোরদের কাছে কনটেন্ট পৌঁছে দেওয়া বেআইনি হয়ে পড়বে। এমনকি তাদের অ্যাকাউন্ট মুছে ফেলতে হবে।
টিকটকের এক মুখপাত্র ই-মেইল বার্তায় বলেছেন, এবি ১৭০৯ হলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর অসাংবিধানিক বিধিনিষেধ। ব্যবহারকারীর পছন্দ অনুযায়ী কনটেন্ট সাজানোর দীর্ঘদিনের প্রচলিত ও সুরক্ষিত ব্যবস্থাকে এটি বাধাগ্রস্ত করবে। বইয়ের দোকান, টেলিভিশন নেটওয়ার্ক ও ভিডিও সম্প্রচার সেবাগুলোও এ ধরনের ব্যবস্থা ব্যবহার করে।
কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতির লক্ষ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপের প্রবণতা বিশ্বজুড়েই বাড়ছে। তবে ডিজিটাল নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বয়স যাচাইয়ের বাধ্যবাধকতার কারণে ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে আরও ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। এতে কিশোরদের পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্কদের গোপনীয়তাও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
ইলেকট্রনিক ফ্রন্টিয়ার ফাউন্ডেশনের (ইএফএফ) স্টেট অ্যাফেয়ার্স বিভাগের সহযোগী পরিচালক রিনদালা আলাজাজি বলেন, আইনটি কার্যকর হলে সব ব্যবহারকারীর কাছ থেকে আরও বেশি তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। এতে অনলাইনে পরিচয় গোপন রাখার সুযোগ কমবে এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তার মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নজরদারি এমনিতেই ক্ষতিকর। নতুন আইন সেই নজরদারি আরও বাড়াবে এবং ব্যবহারকারীদের সুরক্ষার বদলে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে আরও ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করবে।
আলাজাজি আরও বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিশোরদের ডিজিটাল আন্দোলনে অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। পার্কল্যান্ড স্কুলে গুলির ঘটনার পর শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে গড়ে ওঠা ‘মার্চ ফর আওয়ার লাইভস’ আন্দোলন এবং জলবায়ু আন্দোলনকর্মী গ্রেটা থুনবার্গের আন্তর্জাতিক পরিচিতি এর উদাহরণ। তার মতে, ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য কার্যত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করে দিলে তরুণেরা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হবে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও একই ধরনের আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অস্ট্রেলিয়া ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করে। ফ্রান্সেও একই ধরনের আইন করা হয়েছিল। তবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা লঙ্ঘনের আশঙ্কায় দেশটির সর্বোচ্চ আদালত আইনটি বাতিল করেন।
মেটা, গুগল ও টিকটকের যুক্তি, নতুন আইন কার্যকর হলে কিশোরদের ইন্টারনেট ব্যবহার নিয়ে অভিভাবকদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতাও সীমিত হবে। গুগলের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, ইউটিউবে অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য স্বয়ংক্রিয় ভিডিও চালুর সুবিধা আগে থেকেই বন্ধ থাকে। অভিভাবকেরা চাইলে তাদের সন্তানদের জন্য ইউটিউব শর্টস ব্যবহারের সুযোগও বন্ধ করতে পারেন।
গুগলের মুখপাত্র বলেন, পরিবারের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত অভিভাবকেরাই নিতে পারেন। তাই তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিভিন্ন সুরক্ষা ও ব্যবস্থাপনার সুবিধা দেওয়া হয়েছে। তার মতে, অতিরিক্ত বিস্তৃত এই আইন শিশুদের উপযোগী মানসম্মত ভিডিও খুঁজে পেতে সহায়তার জন্য গুগলের তৈরি ব্যবস্থাগুলোও বাধাগ্রস্ত করবে।
ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল রব বন্টার এক প্রতিনিধি জানিয়েছেন, তাদের দপ্তর মামলাগুলো পর্যালোচনা করছে। অনলাইনে শিশুদের সুরক্ষায় অঙ্গরাজ্যের আইন রক্ষায় তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।