বাজেট প্রত্যাশা ২০২৬-২৭
বাজেট বাস্তবায়ন ও সমন্বয়ই বড় চ্যালেঞ্জ: ‘ডট কানেক্ট’ করার আহ্বান
বাংলাদেশে জাতীয় বাজেট ঘোষণার আগে প্রতি বছরই বিভিন্ন খাতের অংশীজনদের কাছ থেকে নানা প্রত্যাশা ও প্রস্তাব নেওয়া হয়। কিন্তু বাজেট ঘোষণার পর দেখা যায়, সেসব প্রস্তাবের খুব সামান্যই বাস্তবায়িত হয়েছে। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি (আইসিটি) খাতের ক্ষেত্রে বাজেট ঘোষণা ও তার প্রকৃত বাস্তবায়নের মধ্যে এক বিশাল দূরত্ব রয়ে গেছে। আইসিটি খাতের উন্নয়ন কেবল একটি মন্ত্রণালয়ের কাজ নয়, বরং এর সঙ্গে একাধিক মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। এই মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় বা ‘ডট কানেক্ট’ করা না গেলে ডিজিটাল সমৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।
জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ সামনে রেখে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিভিন্ন অংশীজনের অংশগ্রহণে বৃহস্পতিবার (২১ মে) ‘টেকওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ’ আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নিয়ে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও টেকনোলজি মিডিয়া গিল্ড বাংলাদেশ (টিএমজিবি)-এর সভাপতি মোহাম্মদ কাওছার উদ্দীন এসব কথা বলেন। তিনি তার দীর্ঘ পেশাগত অভিজ্ঞতার আলোকে বাজেট প্রক্রিয়ার সীমাবদ্ধতা এবং বাস্তবায়নের পথে বিদ্যমান প্রশাসনিক বাধাগুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।
প্রত্যাশা বনাম প্রাপ্তির ব্যবধান
মোহাম্মদ কাওছার উদ্দীন তার বক্তব্যের শুরুতে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন,‘প্রতি বছর বাজেটের এক-দুই সপ্তাহ আগে থেকে আমাদের কাছে প্রশ্ন করা হয়- আমরা কেমন বাজেট চাই? আমরাও খাতের সবার মতামত নিয়ে এনবিআর বা নীতিনির্ধারকদের কাছে প্রস্তাব পাঠাই। কিন্তু বাজেট ঘোষণার পর যখন আমরা পর্যালোচনা করি, তখন দেখা যায় আমাদের মৌলিক দাবিগুলোর অধিকাংশেরই প্রতিফলন ঘটেনি।’ তিনি আক্ষেপ করে বলেন,‘কোনো একটি আয়োজন বা নীতির সফলতা নির্ভর করে তার বাস্তব প্রয়োগ ও ফলাফলের ওপর। কিন্তু বাজেটের ক্ষেত্রে অনেক সময় দেখা যায়, আলোচনার টেবিল থেকে ফাইল যখন বাস্তবায়নের স্তরে পৌঁছায়, তখন তার মূল সুর হারিয়ে যায়।’
ইন্টারনেটে কর কমানোর অমীমাংসিত দাবি
আইসিটি খাতের একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার উদাহরণ দিয়ে কাওছার উদ্দীন বলেন,‘ইন্টারনেটের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক ও কর প্রত্যাহারের দাবি আমরা বছরের পর বছর ধরে জানিয়ে আসছি। এ নিয়ে অসংখ্য চিঠি চালাচালি হয়েছে, অনেক বৈঠক হয়েছে। কিন্তু আজও এই সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। এতেই বোঝা যায় যে, সম্মিলিত প্রচেষ্টা থাকলেও প্রশাসনিক জটিলতা বা নীতিনির্ধারণী অনীহার কারণে আইসিটি খাতের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলো অনেক সময় আটকে থাকে।’ তিনি মনে করেন, অন্যান্য বড় খাতের তুলনায় আইসিটি খাতের ওপর বাজেটের ইতিবাচক প্রভাব অত্যন্ত সীমিত।
হার্ডওয়্যার ও এইচএস কোডের জটিলতা
হার্ডওয়্যার খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য বড় একটি বিড়ম্বনার নাম হলো হারমোনাইজড সিস্টেম বা এইচএস কোড। কাওছার উদ্দীন বলেন,‘একটি নির্দিষ্ট পণ্যের ওপর কত শতাংশ শুল্ক প্রযোজ্য হবে, তা অনেক সময় এইচএস কোডের অস্পষ্টতার কারণে ব্যবসায়ীরা বুঝতে পারেন না। কাস্টমস পর্যায়ে গিয়ে তারা নানা ধরনের হয়রানি ও জটিলতার শিকার হন।’ তিনি দাবি করেন, এই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনা এবং কোডগুলোকে সহজ করা জরুরি। আধুনিক প্রযুক্তির অনেক পণ্য এখন বহুমুখী কাজে ব্যবহৃত হয়, তাই পুরনো কোড দিয়ে সেগুলোকে মূল্যায়ন করা ব্যবসায়ীদের জন্য প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।
সমন্বয়হীনতার সংকট ও ‘ডট কানেক্ট’ করার প্রস্তাব
কাওছার উদ্দীনের বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে আইসিটি বিভাগ, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন বিভাগ আলাদা আলাদাভাবে একই ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। যেমন- সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বা ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়নের প্রকল্প প্রতিটি মন্ত্রণালয় আলাদাভাবে চালাচ্ছে। কিন্তু এদের মধ্যে তথ্যের আদান-প্রদান বা কাজের কোনো সমন্বয় নেই।
তিনি বলেন,‘যদি এই সব উদ্যোগকে একটি ছাতার নিচে নিয়ে এসে সমন্বিতভাবে পরিচালিত করা যেত, তবে সরকারি অর্থের অপচয় কমত এবং ফলাফল অনেক বেশি কার্যকর হতো।’ তিনি নীতিনির্ধারকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন,‘এখন সময় এসেছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কাজের মধ্যে ‘ডট কানেক্ট’ করার। অর্থাৎ একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে সব দপ্তরের কাজকে একীভূত করতে হবে। সমন্বয়হীনতা দূর করা না গেলে সাইবার নিরাপত্তা বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো উদীয়মান প্রযুক্তিগুলোর সুফল দেশ পাবে না।’
বাস্তবায়নই শেষ কথা
বাজেটকে কেবল আয়-ব্যয়ের খতিয়ান হিসেবে না দেখে একে উন্নয়নের হাতিয়ার করার পরামর্শ দেন কাওছার উদ্দীন। তিনি বলেন,‘বাজেট ঘোষণার পর তার লক্ষ্য অর্জনে নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন। আমরা অনেক সময় দেখি বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তা সময়মতো খরচ হয় না বা ভুল খাতে খরচ হয়। আইসিটি খাতে বাস্তব অগ্রগতি প্রত্যাশার তুলনায় কম হওয়ার পেছনে এই তদারকির অভাবও একটি বড় কারণ।’
ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি ও নীতিনির্ধারণ
সাইবার নিরাপত্তা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-এর মতো আধুনিক প্রযুক্তিগুলোর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বর্তমান বাজেট প্রক্রিয়া কতটা প্রস্তুত, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। কাওছার উদ্দীনের মতে, প্রযুক্তি দ্রুত বদলে যাচ্ছে, কিন্তু আমাদের বাজেট ও নীতি কাঠামো এখনো অনেক পুরোনো ধাচের। প্রযুক্তি খাতের জন্য বিশেষায়িত একটি উইং তৈরি করা প্রয়োজন যারা সারাবছর খাতের পরিবর্তনগুলো পর্যবেক্ষণ করবে এবং পরবর্তী বাজেটে তার প্রতিফলন ঘটাবে। কেবল মে-জুন মাসে আলোচনা করে আইসিটি খাতের জন্য একটি কার্যকর বাজেট তৈরি করা সম্ভব নয়।
সবশেষে তিনি বলেন,‘আমাদের স্বপ্ন অনেক বড়, কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য প্রয়োজন আন্তরিকতা ও দাপ্তরিক সমন্বয়। বাজেটে যে ঘোষণাগুলো দেওয়া হয়, তা যেন কেবল কাগজের পাতায় সীমাবদ্ধ না থাকে। যদি সরকার আইসিটি খাতের অংশীজনদের প্রস্তাব গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে এবং বাস্তবায়ন পর্যায়ে কঠোর তদারকি নিশ্চিত করে, তবেই একটি সমৃদ্ধ ও নতুন বাংলাদেশ গড়া সম্ভব হবে।’