বাজেট প্রত্যাশা ২০২৬-২৭

বিনিয়োগ টানতে দীর্ঘমেয়াদি নীতি জরুরি, আইটি খাতে সংস্কারের তাগিদ

Mahbub Sharif

মাহবুব শরীফ

সোমবার, ১ জুন ২০২৬, ১৭:০১

বিনিয়োগ টানতে দীর্ঘমেয়াদি নীতি জরুরি, আইটি খাতে সংস্কারের তাগিদ
বেসিস-এর সাবেক সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর -ছবি স্বত্ত্ব : টেকওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ

দেশের তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) ও আইটি এনাবলড সার্ভিসেস (আইটিইএস) খাতের টেকসই উন্নয়নের পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালার অভাব। বিশেষ করে প্রতি বছর বাজেট আসার আগে করসুবিধা বা ‘ট্যাক্স হলিডে’ নিয়ে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা এই খাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে। 

জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ সামনে রেখে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিভিন্ন অংশীজনের অংশগ্রহণে বৃহস্পতিবার (২১ মে) ‘টেকওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ’ আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের অন্যতম ব্যক্তিত্ব ও বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস)-এর সাবেক সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর এসব কথা বলেন।

তিনি জানিয়েছেন, জোড়াতালি দেওয়া নীতি দিয়ে ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়া সম্ভব নয়।

ট্যাক্স হলিডের অনিশ্চয়তা ও বিনিয়োগ সংকট

বাজেটকে সামনে রেখে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের অংশীজনদের নিয়ে আয়োজিত এই আলোচনায় সৈয়দ আলমাস কবীর বলেন,

আলমাস কবীর এই সুবিধাটি অন্তত আগামী ১০ বছরের জন্য স্থায়ী করার দাবি জানান, যাতে উদ্যোক্তারা নির্ভয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে পারেন।

অনলাইন কেনাকাটায় ভ্যাটের খড়গ

ডিজিটাল কমার্স বা ই-কমার্সের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন,‘অনলাইন লেনদেনে ভ্যাট ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে, যা কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। বাংলাদেশ এখনো ই-কমার্সে শৈশবকাল পার করছে। এই সময়ে উচ্চ হারের ভ্যাট আরোপ করার ফলে সাধারণ ক্রেতারা অনলাইনে কেনাকাটায় আগ্রহ হারাচ্ছেন।’

আলমাস কবীরের প্রস্তাব হলো, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এই ভ্যাট পুরোপুরি প্রত্যাহার করা উচিত। এতে মানুষের মধ্যে ডিজিটাল লেনদেনের অভ্যাস বাড়বে। যা দীর্ঘমেয়াদে সরকারের রাজস্ব আদায়ের ভিত্তিকেই শক্তিশালী করবে।

ইন্টারনেট যখন শিল্পের কাঁচামাল

বৈঠকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন সৈয়দ আলমাস কবীর। তিনি বলেন,‘একটি পোশাক কারখানার জন্য সুতা বা কাপড় যেমন কাঁচামাল, তথ্যপ্রযুক্তি খাতের জন্য ইন্টারনেট ঠিক তেমনি একটি অপরিহার্য কাঁচামাল। অথচ এই ইন্টারনেটের ওপর এখনো উচ্চ হারে কর ও শুল্ক দিতে হচ্ছে।’ তিনি দাবি করেন, ইন্টারনেটকে মৌলিক ইউটিলিটি বা কাঁচামাল হিসেবে ঘোষণা করে এর ওপর সব ধরনের কর কমিয়ে সাধারণ মানুষের নাগালে নিয়ে আসতে হবে। সুলভ মূল্যে উচ্চগতির ইন্টারনেট নিশ্চিত করা না গেলে ডিজিটাল অর্থনীতির প্রসার সম্ভব নয়।

অর্থায়নের বাধা ও জামানতবিহীন ঋণ

আইটি খাতের নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য সবচেয়ে বড় সংকট হলো অর্থায়ন। আলমাস কবীর উল্লেখ করেন, ব্যাংকগুলো এখনো লোন দেওয়ার ক্ষেত্রে জমি বা স্থাবর সম্পত্তির জামানত খোঁজে। কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের মূল সম্পদ হলো মেধা, সফটওয়্যার বা কোডিং। যেহেতু উদ্যোক্তাদের কাছে জমা রাখার মতো বড় কোনো জমি নেই, তাই তারা ব্যাংক লোন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আসন্ন বাজেটে আইটি খাতের জন্য বিশেষ তহবিল গঠন এবং কোনো ধরনের স্থাবর সম্পত্তির জামানত ছাড়াই দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ব্যবস্থা করার ওপর জোর দেন তিনি।

পুরনো প্রশিক্ষণ পদ্ধতিতে সময় অপচয়

দক্ষতা উন্নয়নের বিষয়ে সৈয়দ আলমাস কবীর সরকারের বর্তমান প্রশিক্ষণ প্রকল্পগুলোর সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন,‘অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে সরকার এখনো এমন সব বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে যা এখন সেকেলে হয়ে গেছে।’ উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন,‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই টুল ব্যবহার করে এখন কয়েক মিনিটেই একটি ওয়েবসাইট তৈরি করা সম্ভব। অথচ প্রশিক্ষণের তালিকায় এখনো মাসব্যাপী ওয়েব ডেভেলপমেন্ট বা এসইও কোর্স রাখা হয়েছে।’

তিনি মনে করেন, প্রশিক্ষণের তালিকায় দ্রুত পরিবর্তন আনা জরুরি। বর্তমান বিশ্বের চাহিদার সঙ্গে মিল রেখে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ব্লকচেইন, ডেটা সায়েন্স এবং সাইবার সিকিউরিটির মতো ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি বা আধুনিক প্রযুক্তিগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সঠিক সময়ে সঠিক প্রশিক্ষণ দিতে না পারায় আউটসোর্সিং বা ফ্রিল্যান্সিং খাতে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি কমছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম ও তারুণ্যের শক্তি

দেশের তরুণ প্রজন্মকে উদ্ভাবনী কাজে যুক্ত করতে একটি শক্তিশালী স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। সৈয়দ আলমাস কবীর বলেন,‘মেধাবী তরুণদের উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগাতে বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ থাকা দরকার। তরুণরা যেন শুধু চাকরির পেছনে না ছুটে নিজেরাই কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।’

সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বয়ে গবেষণা ও উন্নয়নের (আরঅ্যান্ডডি) জন্য বড় ধরনের বিনিয়োগের আহ্বান জানান তিনি।

সবশেষে তিনি বলেন,‘তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সংকট নিরসনে নীতিনির্ধারকদের আরও দূরদর্শী হতে হবে। কেবল কর আদায় বাড়ানোর লক্ষ্য না নিয়ে বরং খাতটি কীভাবে বড় হবে, সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে। প্রযুক্তি খাত বিকশিত হলে কর্মসংস্থান বাড়বে এবং পরোক্ষভাবে সরকারের রাজস্ব আদায়ও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।’

টেকওয়ার্ল্ডের আপডেটেড খবর পেতে WhatsApp চ্যানেল ফলো করুন