বাজেট প্রত্যাশা ২০২৬-২৭

ফ্রিল্যান্সারদের প্রণোদনা নিশ্চিত ও ট্রেড লাইসেন্স সহজীকরণের দাবি

Mahbub Sharif

মাহবুব শরীফ

সোমবার, ১ জুন ২০২৬, ১৫:৪৩

ফ্রিল্যান্সারদের প্রণোদনা নিশ্চিত ও ট্রেড লাইসেন্স সহজীকরণের দাবি
এমরাজিনা ইসলাম - ছবি স্বত্ত্ব : টেকওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ

বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির অন্যতম শক্তিশালী স্তম্ভ হিসেবে দাঁড়িয়েছে ফ্রিল্যান্সিং খাত। কয়েক লাখ তরুণ ফ্রিল্যান্সার তাদের মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে নিয়ে আসছেন। তৈরি পোশাক খাতের পর বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম বড় সম্ভাবনা হিসেবে দেখা হচ্ছে এই খাতকে। কিন্তু নীতিমালার মারপ্যাঁচে ব্যক্তি পর্যায়ের ফ্রিল্যান্সাররা প্রাপ্য সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিশেষ করে রপ্তানি আয়ের ওপর ঘোষিত ১০ শতাংশ নগদ প্রণোদনা কেবল নিবন্ধিত আইটি প্রতিষ্ঠানগুলো পেলেও ব্যক্তিগত পর্যায়ে কাজ করা সাধারণ ফ্রিল্যান্সাররা তা পাচ্ছেন না। এর ফলে বৈদেশিক আয় দেশে আনার ক্ষেত্রে তারা আনুষ্ঠানিক চ্যানেলের পরিবর্তে বিকল্প পথ বেছে নিচ্ছেন, যা জাতীয় পরিসংখ্যানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ সামনে রেখে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিভিন্ন অংশীজনের অংশগ্রহণে বৃহস্পতিবার (২১ মে) ‘টেকওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ’ আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে ফ্রিল্যান্সারদের এই সংকটের কথা তুলে ধরেন এমরাজিনা টেকনোলজিস-এর কো-ফাউন্ডার এমরাজিনা ইসলাম। তিনি সাফ জানিয়েছেন যে, ট্রেড লাইসেন্স থেকে শুরু করে ব্যাংকিং পেমেন্ট-প্রতিটি স্তরে আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা ফ্রিল্যান্সিং খাতের বিকাশে প্রধান দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রণোদনার বৈষম্য ও পরিসংখ্যানের ঘাটতি

এমরাজিনা ইসলাম তার বক্তব্যে বলেন,

তিনি দাবি করেন, ব্যক্তি পর্যায়ের ফ্রিল্যান্সারদের জন্যও এই প্রণোদনা সহজলভ্য করা উচিত এবং ব্যাংকগুলোকে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া প্রয়োজন।

বাসার ঠিকানায় ট্রেড লাইসেন্সের বিড়ম্বনা

ফ্রিল্যান্সারদের জন্য একটি বড় বাধা হলো ট্রেড লাইসেন্স সংগ্রহ করা। এমরাজিনা ইসলাম উল্লেখ করেন যে, দেশে কর্মসংস্থান তৈরিতে ফ্রিল্যান্সাররা বড় ভূমিকা রাখলেও তারা আইনি স্বীকৃতির ক্ষেত্রে নানা সমস্যায় পড়েন। বর্তমানে বেশিরভাগ ফ্রিল্যান্সার নিজেদের বাসা থেকেই কাজ করেন। কিন্তু সিটি কর্পোরেশন বা ইউনিয়ন পরিষদের নিয়ম অনুযায়ী, ট্রেড লাইসেন্স পেতে হলে একটি বাণিজ্যিক ঠিকানার প্রয়োজন হয়। একজন তরুণ ফ্রিল্যান্সার বা শিক্ষার্থীর পক্ষে কেবল ট্রেড লাইসেন্সের জন্য বাণিজ্যিক অফিস ভাড়া করা অসম্ভব এবং ব্যয়বহুল। অথচ ট্রেড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংকিং সুবিধা, লোন বা সরকারি স্বীকৃতি পাওয়া কঠিন। তিনি প্রস্তাব করেন, ফ্রিল্যান্সারদের জন্য তাদের বাসার ঠিকানাতেই ট্রেড লাইসেন্স দেওয়ার বিশেষ ব্যবস্থা থাকতে হবে। আইনি এই সংস্কার না হলে ফ্রিল্যান্সিংকে একটি স্বীকৃত পেশা হিসেবে মূলধারায় প্রতিষ্ঠিত করা চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়বে।

বৈদেশিক লেনদেনের সীমা ও ব্যাংকিং জটিলতা

ফ্রিল্যান্সাররা সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারে কাজ করেন এবং তাদের পেমেন্টগুলো বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বা গেটওয়ের মাধ্যমে আসে। এমরাজিনা ইসলাম জানান, বৈদেশিক লেনদেনের বর্তমান সীমা এবং ব্যাংকগুলোর বাড়তি কড়াকড়ি ফ্রিল্যান্সারদের জন্য বড় ভোগান্তি তৈরি করছে। অনেক সময় ব্যাংক থেকে আয়ের উৎস সম্পর্কে অতিরিক্ত প্রমাণ চাওয়া হয়, যা একজন ব্যক্তিগত ফ্রিল্যান্সারের জন্য সংগ্রহ করা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ। এছাড়া আন্তর্জাতিক কেনাকাটা, প্রিমিয়াম সফটওয়্যার সাবস্ক্রিপশন বা সার্ভার খরচ মেটানোর ক্ষেত্রে ডলারের লিমিট থাকায় তাদের কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি বৈদেশিক লেনদেনের সীমা বাড়ানো এবং ফ্রিল্যান্সারদের জন্য ব্যাংকিং প্রক্রিয়া আরও বেশি গ্রাহকবান্ধব করার দাবি জানান।

ফ্রিল্যান্সার আইডি কার্ড ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির প্রশ্ন

সরকার ফ্রিল্যান্সারদের স্বীকৃতির জন্য ‘ফ্রিল্যান্সার আইডি কার্ড’ চালু করলেও এর কার্যকারিতা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন এমরাজিনা। তিনি বলেন,‘কার্ড দেওয়া হয়েছে ঠিকই, কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে এই কার্ড দেখিয়ে ব্যাংক লোন বা অন্যান্য নাগরিক সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না। ফ্রিল্যান্সাররা যেন সামাজিকভাবে এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে একজন উদ্যোক্তার মর্যাদা পান, বাজেটে সেই লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা থাকা দরকার। বিশেষ করে কর রেয়াত বা ট্যাক্স সুবিধা পেতে ফ্রিল্যান্সারদের যে হয়রানির শিকার হতে হয়, তা বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। সরকার যদি তাদের আয়ের ওপর কর মওকুফের ঘোষণা আরও দীর্ঘমেয়াদি করে, তবে তরুণরা এই পেশায় আসতে আরও উৎসাহিত হবে।’

দক্ষতা উন্নয়ন ও এআই যুগের চ্যালেঞ্জ

কেবল পেমেন্ট বা আইনি জটিলতাই নয়, ফ্রিল্যান্সিং খাতে টিকে থাকতে হলে বিশ্ববাজারের সাথে তাল মিলিয়ে দক্ষতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। এমরাজিনা ইসলাম মনে করেন, বাজেটে ফ্রিল্যান্সারদের উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য বিশেষ বরাদ্দ থাকা উচিত। বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও নতুন প্রযুক্তির প্রভাবে ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজের ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আগে যে কাজ মানুষ করত, এখন অনেক ক্ষেত্রে এআই চ্যাটবট বা আধুনিক টুলস দিয়ে তা সহজে করা সম্ভব হচ্ছে। এই নতুন পরিস্থিতিতে যারা নিজেদের ‘আপস্কিল’ করতে পারবে না, তারা কাজ হারাবে। তাই সরকার যদি আধুনিক প্রশিক্ষণের সুযোগ দেয় এবং ইন্টারনেটের দাম কমিয়ে সাধারণের নাগালে রাখে, তবে বাংলাদেশের তরুণরা বিশ্ববাজারে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে পারবে।

বাজেটে প্রত্যাশা ও আগামীর নতুন বাংলাদেশ

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ফ্রিল্যান্সারদের জন্য একটি বিনিয়োগবান্ধব ও হয়রানিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান এমরাজিনা ইসলাম। তার মতে, ফ্রিল্যান্সাররা রাষ্ট্রের কাছে কোনো বিশেষ বিলাসিতা চায় না, তারা শুধু চায় কাজ করার একটি মসৃণ পরিবেশ। ১০ শতাংশ প্রণোদনা ব্যক্তি পর্যায়ে নিশ্চিত করা, ট্রেড লাইসেন্স পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করা এবং পেমেন্ট গেটওয়েগুলোর বাধা দূর করা গেলেই এই খাতের সম্ভাবনা শতভাগ কাজে লাগানো সম্ভব হবে।

পরিশেষে এমরাজিনা ইসলাম বলেন,‘ফ্রিল্যান্সিং কেবল কয়েক হাজার মানুষের জীবিকা নয়, এটি বাংলাদেশের ‘স্মার্ট ইকোনমি’র প্রাণশক্তি। যদি নীতিমালার জটগুলো খুলে দেওয়া হয়, তবে আমাদের মেধাবী তরুণরা ঘরে বসেই দেশকে অর্থনৈতিকভাবে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাবে।’ তাই আসন্ন বাজেটে এই খাতের সমস্যা সমাধানে এবং ফ্রিল্যান্সারদের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নীতিনির্ধারকদের আরও দূরদর্শী হওয়ার অনুরোধ জানান তিনি।

টেকওয়ার্ল্ডের আপডেটেড খবর পেতে WhatsApp চ্যানেল ফলো করুন