বাজেট প্রত্যাশা ২০২৬-২৭
বিপিও খাতে ‘ট্রেন দ্য ট্রেইনার’ মডেল ও ১০ বছরের কর সুবিধার দাবি
দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে প্রতিবছর যে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী স্নাতক শেষ করে বের হচ্ছেন, তাদের একটি বড় অংশের কর্মসংস্থানের প্রধান ঠিকানা হয়ে উঠেছে বিপিও (বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং) খাত। তবে এই খাতের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে দীর্ঘমেয়াদি নীতি সহায়তা প্রয়োজন। বিশেষ করে আইটি এনাবলড সার্ভিসেস (আইটিইএস) খাতের কর সুবিধার মেয়াদ আরও অন্তত ১০ বছর বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি মানসম্মত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে ‘ট্রেন দ্য ট্রেইনার’ মডেল চালু করাও জরুরি।
জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ সামনে রেখে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিভিন্ন অংশীজনের অংশগ্রহণে বৃহস্পতিবার (২১ মে) ‘টেকওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ’ আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কন্ট্যাক্ট সেন্টার অ্যান্ড আউটসোর্সিং (বাক্কো)-এর অর্থ সম্পাদক মোহাম্মদ আমিনুল হক। তিনি দেশের শ্রমবাজারে বিপিও খাতের অবদান এবং এই খাতের বিকাশে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতাগুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।
তরুণদের আস্থার নাম বিপিও
মোহাম্মদ আমিনুল হক তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, বিপিও খাত বর্তমানে দেশে সর্বোচ্চ সংখ্যক ‘ফ্রেশ গ্র্যাজুয়েট’ বা সদ্য পাস করা শিক্ষার্থীদের চাকরির সুযোগ করে দিচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকাকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা তরুণরা সরাসরি কাজের সুযোগ পাচ্ছেন।
তিনি বলেন,
তার মতে, বিপিও কেবল একটি সাধারণ চাকরি নয়, বরং এটি তরুণদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করছে। এখান থেকেই কর্মীরা পেশাদার জীবনে প্রয়োজনীয় মৌলিক জ্ঞান অর্জন করছেন। তিনি আরও জানান, বিপিও খাতে কাজের মাধ্যমে তরুণরা এমন কিছু ‘ট্রান্সফারেবল স্কিল’ বা হস্তান্তরযোগ্য দক্ষতা অর্জন করেন, যা তাদের পরবর্তী জীবনে অন্যান্য বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান বা আন্তর্জাতিক সংস্থায় উচ্চ বেতনে কাজের সুযোগ করে দেয়।
শিক্ষা ও শিল্পের বিস্তর ফারাক
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার সাথে বর্তমান শিল্পখাতের চাহিদার যে বড় একটি দূরত্ব রয়েছে, আমিনুল হক তা গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘স্নাতক শেষ করার পরও অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যে মৌলিক যোগাযোগ দক্ষতা (কমিউনিকেশন স্কিল) এবং সাধারণ কম্পিউটার জ্ঞানের অভাব দেখা যায়। একাডেমিক পর্যায়ে যে জ্ঞান তাদের অর্জনের কথা ছিল, কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের পর বিপিও প্রতিষ্ঠানগুলোকে সেই দায়িত্ব নিতে হচ্ছে। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন কর্মীদের নিজেদের খরচে পুনরায় প্রশিক্ষণ দিয়ে কাজের উপযোগী করে তুলছে।’
এই সমস্যা সমাধানে তিনি একাডেমিয়া ও শিল্পখাতের মধ্যে সমন্বয় জোরদারের ওপর জোর দেন। তিনি প্রস্তাব করেন, স্থানীয় শিল্পের বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কেস স্টাডি তৈরি করে সেগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। এতে শিক্ষার্থীরা কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই বুঝতে পারবে বাজারে কোন ধরনের দক্ষতার চাহিদা রয়েছে।
প্রশিক্ষক সংকট ও ‘ট্রেন দ্য ট্রেইনার’ মডেল
বিপিও খাতের আধুনিকায়নের জন্য এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের মতো প্রযুক্তির ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। কিন্তু এসব প্রযুক্তিতে কর্মীদের দক্ষ করে তোলার জন্য দেশে দক্ষ প্রশিক্ষকের বড় অভাব রয়েছে। আমিনুল হক বলেন, সরাসরি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালনার পাশাপাশি এখন ‘ট্রেন দ্য ট্রেইনার’ মডেল চালু করা জরুরি। এর মাধ্যমে একদল দক্ষ প্রশিক্ষক তৈরি করা হবে, যারা পরবর্তীতে দেশজুড়ে মানসম্মত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে পারবেন। তিনি বর্তমান প্রশিক্ষণ নীতিমালার সমালোচনা করে বলেন,‘অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় প্রশিক্ষণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কোনো বিশেষ প্রণোদনা বা মোটিভেশন রাখা হয় না। এর ফলে প্রশিক্ষণের গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যদি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোকে উৎসাহিত করা যায় এবং মানসম্মত প্রশিক্ষক তৈরি করা যায়, তবেই আইটি খাতে দক্ষ জনশক্তির অভাব দূর করা সম্ভব হবে।’
কর সুবিধার মেয়াদ বাড়ানোর দাবি
বিপিও খাতের কোম্পানিগুলো বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে ভারত, ফিলিপাইন বা ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোর সাথে পাল্লা দিচ্ছে। আমিনুল হক মনে করেন, এই অসম প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে সরকারি নীতি সহায়তা ছাড়া উপায় নেই। বর্তমানে আইটিইএস খাতে কিছু কর সুবিধা থাকলেও তার স্থায়িত্ব নিয়ে উদ্যোক্তাদের মনে শঙ্কা রয়েছে। তিনি দাবি করেন, এই কর সুবিধার মেয়াদ আরও অন্তত ১০ বছর বাড়ানো উচিত। দীর্ঘমেয়াদি নীতি নিশ্চয়তা থাকলে উদ্যোক্তারা নতুন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতে এবং বড় ধরনের ব্যবসায়িক পরিকল্পনা নিতে উৎসাহিত হবেন।

ব্যবস্থাপনা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড
বিপিও খাতের জন্য দক্ষ ব্যবস্থাপকের (মিড-লেভেল ম্যানেজমেন্ট) ঘাটতির বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে। আমিনুল হক বলেন,‘আন্তর্জাতিক বাজারে কাজ করতে হলে আমাদের সেবার মান ও স্ট্যান্ডার্ড বজায় রাখতে হবে। যদিও অনেক প্রতিষ্ঠান আইএসও (আইএসও) সনদ নিচ্ছে, কিন্তু তার যথাযথ অনুসরণ নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী সেবার মান নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশের বিপিও খাত আরও দ্রুত বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম বড় উৎসে পরিণত হবে।’ তিনি আরও বলেন,‘আসন্ন ডেটা সিকিউরিটি বা তথ্য সুরক্ষা আইন বাস্তবায়িত হলে এই খাতে আরও শৃঙ্খলা আসবে এবং আন্তর্জাতিক গ্রাহকদের আস্থাও বাড়বে।’ তবে একইসাথে ব্যবসা পরিচালনার খরচ কমানো এবং শ্রম আইনের কিছু জটিলতা নিরসন করা দরকার বলে তিনি মনে করেন।
জাতীয় অর্থনীতিতে বিপিও’র প্রভাব
সংলাপে আমিনুল হক একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন,‘বিপিও খাতের প্রবৃদ্ধি কেবল এই খাতের কর্মীদেরই উপকার করছে না, বরং এটি পুরো অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনছে। যখন হাজার হাজার তরুণ নিয়মিত বেতন পাচ্ছেন, তখন তারা বাজারে অর্থ ব্যয় করছেন। এই বর্ধিত ভোগব্যয় দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখছে।’ তাই সরকারকে বিপিও খাতকে কেবল একটি প্রযুক্তি খাত হিসেবে না দেখে একটি বড় কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী খাত হিসেবে বিবেচনা করে বাজেটে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সবশেষে তিনি বলেন,‘আমাদের সামনে অপার সম্ভাবনা রয়েছে। যদি আমরা সঠিক সময়ে সঠিক নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে পারি এবং দক্ষ প্রশিক্ষক তৈরির মাধ্যমে কর্মীদের মান উন্নত করতে পারি, তবে বিপিও খাতই হবে বাংলাদেশের ‘স্মার্ট ইকোনমি’র মূল চালিকাশক্তি।’