উইন্ডোজ পিসি দ্রুত ও শক্তিশালী করার ১২ কৌশল

Staff Reporter

নিজস্ব প্রতিবেদক

রবিবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১৮:০০

উইন্ডোজ পিসি দ্রুত ও শক্তিশালী করার ১২ কৌশল
ছবি : পিসিম্যাগ

বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের কাছে কম্পিউটার শুধু পড়াশোনা বা চাকরির টুল নয়, বরং বিনোদন, গেমস, ফ্রিল্যান্সিং কিংবা সৃজনশীল কাজের অন্যতম ভরসা। তবে নতুন কেনা ল্যাপটপ বা ডেস্কটপ কয়েক মাস পরই অনেক সময় ধীর হয়ে যায়, ড্রাইভ ভরে যায় অথবা সফটওয়্যার চালাতে গিয়ে বারবার হ্যাং করে। এর পেছনে কারণ হলো উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমের অপ্রয়োজনীয় ফাইল, জায়গা দখল করা অ্যাপ বা সঠিকভাবে মেমোরি ব্যবস্থাপনা না থাকা।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যদি ব্যবহারকারীরা কিছু বুদ্ধিদীপ্ত পদক্ষেপ নেন, তবে নতুন পিসি কিনেও পুরোনো কম্পিউটারকে দ্রুত, হালকা ও শক্তিশালী করে তোলা সম্ভব। নিচে সেই ১২টি কার্যকর কৌশল তুলে ধরা হলো-

১. অস্থায়ী ফাইল ও আপডেট অবশিষ্টাংশ মুছে ফেলা
উইন্ডোজে প্রতিদিন হাজারো টেম্পোরারি ফাইল তৈরি হয়, যা ধীরে ধীরে গিগাবাইটের জায়গা দখল করে ফেলে। এগুলো মুছে ফেলার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো ‘Disk Cleanup’ টুল। স্টার্ট মেনুতে ‘cleanmgr’ লিখে চালু করলে এটি পাওয়া যায়। সব টিক চিহ্ন নির্বাচন করে ‘Clean up system files’ চাপলেই কয়েক গিগাবাইট জায়গা খালি হয়ে যায়।

২. স্বয়ংক্রিয় মেমোরি অপটিমাইজেশন চালু করুন
উইন্ডোজ ১০ ও ১১-তে আছে ‘Storage Sense’ বা ‘Memory optimization’ নামের ফিচার। সেটিংস → সিস্টেম → মেমোরি থেকে এটি সক্রিয় করলে উইন্ডোজ নিজে নিজেই নির্দিষ্ট সময় পরপর রিসাইকেল বিন খালি করে, টেম্প ফাইল মুছে ফেলে এবং জায়গা খালি রাখে। এতে আপনাকে বাড়তি কিছু করতে হয় না।

৩. উইন্ডোজ সার্চ ইনডেক্স বন্ধ করুন
বেশিরভাগ ব্যবহারকারী জানেন না যে, ‘Windows.edb’ নামে একটি ফাইল ক্রমশ বড় হতে হতে কয়েক গিগাবাইট জায়গা নিয়ে নেয়। যারা ‘Everything’ বা ‘Listary’ এর মতো দ্রুত সার্চ টুল ব্যবহার করেন, তারা চাইলে উইন্ডোজ সার্চ সার্ভিস বন্ধ করে এই ফাইল মুছে ফেলতে পারেন। এতে ড্রাইভ অনেকটাই হালকা হয়।

৪. আপডেট বাফার থেকে জায়গা উদ্ধার  করুন
উইন্ডোজ ডিফল্টভাবে ভবিষ্যতের বড় আপডেটের জন্য প্রায় ৭ গিগাবাইট জায়গা আলাদা করে রাখে। অনেক ল্যাপটপে, বিশেষ করে ১২৮ জিবি এসএসডিতে এটি বিরক্তিকর। জায়গা ফেরত পেতে অ্যাডমিনে গিয়ে অনুমতি দিয়ে পাওয়ারশেলে কমান্ড লিখতে হবে-
Set-WindowsReservedStorageState -State Disabled -Online
তবে এটি চালাতে গেলে আপডেট প্রসেস শেষ হয়ে থাকতে হবে।

৫. কমপ্যাক্টওএস দিয়ে সিস্টেম ফাইল কমপ্রেস করুন
উইন্ডোজে CompactOS নামে লুকানো একটি ফিচার আছে। কমান্ড প্রম্পটে compact /compactOS:always চালালে সিস্টেম ফাইল কমপ্রেস হয় এবং ২-৬ গিগাবাইট জায়গা খালি হয়ে যায়। চাইলে পরে এটি compact /compactOS:never দিয়ে বন্ধও করা যায়। এর ভালো দিক হলো- ফাইলগুলো সব সময় অ্যাক্সেসযোগ্য থাকে, আলাদাভাবে আনকমপ্রেস করার দরকার নেই।

৬. গেমস ও বড় সফটওয়্যারের জন্য বিশেষ টুল 
গেমস বা অ্যাডোবি সফটওয়্যারের মতো বড় ফাইলগুলো আলাদাভাবে কমপ্রেস করতে CompactGUI অথবা Compactor ব্যবহার করা যায়।

  • CompactGUI সহজ ইন্টারফেস দেয়, আর Compactor একটু বেশি উন্নত অ্যালগরিদম ব্যবহার করে। 
    XPRESS4K দ্রুত কাজ করে।
  • LZX সর্বাধিক জায়গা বাঁচায় (৪০-৬০% পর্যন্ত)।
  • যেমন, ৯.৬ জিবি ভিজ্যুয়াল স্টুডিও ফাইল কমে ৪.৭ জিবি হয়ে যায়।

৭. টিনি১১: হালকা উইন্ডোজ ১১
অনেকেই নতুন কম্পিউটার না কিনেই উইন্ডোজ ১১ ব্যবহার করতে চান। কিন্তু TPM বা অনলাইন অ্যাকাউন্টের ঝামেলা থাকে। সমাধান হলো Tiny11।

  • মাত্র ৩.৫ জিবি জায়গায় চলে।
  • TPM বা Microsoft অ্যাকাউন্ট দরকার নেই।
  • বেলুন অ্যাপ (Candy Crush, Xbox ইত্যাদি) নেই।
  • চাইলে গিটহাব থেকে নিজে Tiny11 বানানো যায়, আবার প্রস্তুত ISO ডাউনলোড করেও ব্যবহার করা সম্ভব।

৮. উইনইউটিল (WinUtil) ব্যবহার করতে পারেন
যারা শুধু হালকা সিস্টেমই চান না, বরং সেটআপ ছাড়াই প্রি-কনফিগারড উইন্ডোজ চান, তাদের জন্য WinUtil কার্যকর। এটি দিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সবকিছু ঠিকঠাক সেটআপ হয়, TPM চেক নেই, অনলাইন অ্যাকাউন্ট লাগে না।

৯. টিনি১১ কোর: আরও হালকা সংস্করণ
এ সংস্করণে উইন্ডোজ ডিফেন্ডার, আপডেট সিস্টেম এমনকি রিকভারি মোডও থাকে না। ফলে মেমোরি খরচ অনেক কমে যায়। তবে ঝুঁকি হলো- এটি আপডেট হয় না, তাই নিরাপত্তা সমস্যা থাকতে পারে।

১০. ভিএইচডি (VHD) ইনস্টলেশন
যারা নতুনভাবে উইন্ডোজ ইনস্টল না করে আলাদা পরিবেশে পরীক্ষা করতে চান, তারা ভার্চুয়াল হার্ডডিস্ক (VHD) ব্যবহার করতে পারেন। এতে একটি উইন্ডোজ আলাদা ড্রাইভের মতো কাজ করবে, যা পরীক্ষামূলক ব্যবহার বা ডেভেলপমেন্টের জন্য উপযুক্ত।

১১. কাস্টমাইজড উইন্ডোজ ইনস্টলেশন
NTLite: নিজের মতো করে উইন্ডোজ তৈরি করতে পারবেন। অপ্রয়োজনীয় অ্যাপ বাদ, ড্রাইভার যোগ বা নতুন ভাষা সরিয়ে ফেলা যায়।
WinScript: গ্রাফিকাল ইন্টারফেস দিয়ে ডিব্লোট, প্রাইভেসি সেটিংস, গেমিং অপটিমাইজেশন ইত্যাদি করা যায়।

১২. অতিরিক্ত কিছু টিপস
হাইবারনেশন ফাইল বন্ধ করুন: powercfg -h off দিলে প্রায় ৪ জিবি জায়গা বাঁচে।
পেজফাইল অন্য ড্রাইভে সরান: এতে সি ড্রাইভের চাপ কমে।
সিস্টেম প্রটেকশন মেমোরি কমান: প্রয়োজন অনুযায়ী সীমিত করে রাখুন।
আপডেট ট্রান্সফার অপটিমাইজেশন বন্ধ করুন: এতে ডেটা খরচও বাঁচবে।

সতর্কতা ও সীমাবদ্ধতা
সব কৌশল সমান নিরাপদ নয়। উদাহরণস্বরূপ, সিস্টেম ফোল্ডার (System32 বা WinSxS) থেকে ফাইল মুছে ফেললে উইন্ডোজ স্থিতিশীলতা হারাতে পারে। আবার অতিরিক্ত কমপ্রেশন দিলে নির্দিষ্ট সফটওয়্যারের গতি কমে যেতে পারে। তাই অবশ্যই ব্যাকআপ রাখা এবং রিস্টোর পয়েন্ট তৈরি করা উচিত।

বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য দ্রুতগতির কম্পিউটার এখন অপরিহার্য। ফ্রিল্যান্সিং, গেমিং, গ্রাফিক্স ডিজাইন কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাসাইনমেন্টে ধীরগতি একটি বড় বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। তাই কম্পিউটারকে দ্রুত, হালকা ও শক্তিশালী করতে উপরোক্ত ১২টি কৌশল প্রয়োগ করলে নতুন পিসি কেনার দরকার নাও হতে পারে। শুধু কিছু সচেতনতা ও সঠিক ব্যবহারই আপনার পিসিকে আবারও আগের মতো তরতাজা করে তুলতে পারে।

সূত্র : পিসি ওয়ার্ল্ড