সাংবাদিকদের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করছে এআই দিয়ে লেখা বার্তা
সাংবাদিকদের ই-মেইল ইনবক্সে প্রতিদিনই অসংখ্য সংবাদ বিজ্ঞপ্তি ও প্রচারণামূলক বার্তা জমা হয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের প্রসারে এ ধরনের বার্তার সংখ্যা আরও বেড়েছে। তবে এআই দিয়ে তৈরি একঘেয়ে ও ব্যক্তিত্বহীন বার্তায় বিরক্ত হচ্ছেন সাংবাদিকেরা। এতে জনসংযোগ পেশাজীবীদের সঙ্গে সাংবাদিকদের সম্পর্কও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জনসংযোগবিষয়ক সংবাদমাধ্যম পিআর ডেইলিতে প্রকাশিত রজার জনসনের এক নিবন্ধে এ পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে। নিবন্ধে বলা হয়েছে, সিশনের এক জরিপে ৫৩ শতাংশের বেশি সাংবাদিক জানিয়েছেন, তারা এআই দিয়ে তৈরি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পেতে চান না। গ্লোবাল রেজাল্টস কমিউনিকেশনের আরেক জরিপে ৪৩ শতাংশ সাংবাদিক এ ধরনের বার্তার বিষয়ে নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন। তাদের অভিযোগ, এসব বার্তার ভাষা যান্ত্রিক, এতে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির অভাব থাকে এবং সম্পাদকীয় আস্থাও কমে যায়।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকেরাও প্রকাশ্যে এআই দিয়ে লেখা বার্তার সমালোচনা করেছেন। ফরচুনের ডায়ান ব্র্যাডি জানিয়েছেন, গত এক বছরে তার কাছে এআই দিয়ে তৈরি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি আসার সংখ্যা পাঁচ গুণ বেড়েছে। নিউইয়র্ক টাইমসের মাইক আইজ্যাক এ ধরনের বার্তা সরাসরি মুছে ফেলার কথা জানিয়েছেন। ইনকরপোরেটেডের স্যাম ব্লুমও এআই দিয়ে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি লেখার প্রবণতার সমালোচনা করেছেন।
নিউইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিক জর্ডিন হলম্যানের মতে, এআই ব্যবহারের আগেও সাংবাদিকদের ইনবক্সে অতিরিক্ত সংবাদ বিজ্ঞপ্তি ও যোগাযোগের অনুরোধ আসত। এখন সেগুলোর বড় অংশ এআই দিয়ে তৈরি হওয়ায় পরিস্থিতি আরও বিরক্তিকর হয়ে উঠেছে। সাংবাদিকেরা প্রকৃত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ ও কথোপকথনকে বেশি গুরুত্ব দেন।

নিবন্ধে জনসংযোগ পেশাজীবীদের পুরো সংবাদ বিজ্ঞপ্তি এআই দিয়ে তৈরি না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে আগে থেকে লেখা বিজ্ঞপ্তির ভাষা সংক্ষিপ্ত করা, আরও আকর্ষণীয় করা কিংবা শিরোনাম ও সূচনা অংশের উন্নয়নে এআইয়ের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। সেক্ষেত্রেও এআইয়ের তৈরি পুরো লেখা ব্যবহার না করে প্রয়োজনীয় অংশ বেছে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এআই দিয়ে তৈরি বার্তা চেনার কিছু লক্ষণও তুলে ধরা হয়েছে নিবন্ধে। যেমন, কোনো ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে তিনি কী কী বিষয়ে কথা বলতে পারবেন, তা কয়েকটি বুলেট পয়েন্টে সাজিয়ে দেওয়া। এ ছাড়া ‘এটি এমন নয়, বরং সেটি’ ধরনের বাক্যগঠনও এআইয়ের লেখা বলে সন্দেহ তৈরি করতে পারে। এসব ধরন এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছেন নিবন্ধের লেখক।
তার মতে, সংবাদ বিজ্ঞপ্তি তৈরিতে পুরোপুরি এআইয়ের ওপর নির্ভর করলে লেখার মানবিক দিকটি হারিয়ে যায়। এতে সাংবাদিকদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের পেশাগত সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কার্যকর জনসংযোগের জন্য সাংবাদিকদের কাজ অনুসরণ করা, তাদের প্রকাশিত প্রতিবেদন পড়া এবং নিয়মিত ব্যক্তিগত যোগাযোগ বজায় রাখা জরুরি।
ফরচুনের সাংবাদিক নিক লিচেনবার্গ ও ইয়াহু ফাইন্যান্সের জুলি হাইম্যানও ব্যক্তিগত সম্পর্কের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তাদের মতে, পরিচিত ও বিশ্বস্ত জনসংযোগকর্মীদের কাছ থেকে পাওয়া বার্তা সাংবাদিকেরা বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখেন। অনেক ক্ষেত্রে বার্তার বিষয়বস্তুর চেয়েও বার্তা পাঠানো ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বেশি প্রভাব ফেলে।
নিবন্ধের লেখকের মতে, সাংবাদিকদের ইনবক্সে প্রতিটি অপ্রাসঙ্গিক ও একঘেয়ে বার্তা জমা হলে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদও সহজে নজর এড়িয়ে যায়। তাই এআই দিয়ে নির্বিচারে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি তৈরি না করে সাংবাদিকদের সঙ্গে মানবিক ও পেশাগত সম্পর্ক গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত।