বাজেট প্রত্যাশা ২০২৬-২৭

সরকারি ক্রয় ও করপোরেট খাতে স্থানীয় প্রযুক্তি সেবা অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি

TechWorld Desk

মাহবুব শরীফ

রবিবার, ২৪ মে ২০২৬, ১২:০৯

সরকারি ক্রয় ও করপোরেট খাতে স্থানীয় প্রযুক্তি সেবা অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি
হাবিবুল্লাহ এন করিম --ছবি স্বত্ব : টেকওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ

দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের প্রকৃত বিকাশের জন্য কেবল বাজেট বরাদ্দ যথেষ্ট নয়, বরং সরকারি ও বেসরকারি খাতের বড় প্রকল্পগুলোতে স্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও সফটওয়্যারকে অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য একটি শক্তিশালী ‘লোকাল প্রেফারেন্স’ বা দেশীয় অগ্রাধিকার নীতি বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। বর্তমানে বাংলাদেশে বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও সরকারি ক্রয়ের ক্ষেত্রে বিদেশি সফটওয়্যার বা সেবাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যার ফলে মেধা ও অর্থ দুই-ই দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে।

জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ সামনে রেখে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিভিন্ন অংশীজনের অংশগ্রহণে বৃহস্পতিবার (২১ মে) ‘টেকওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ’ আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের জ্যেষ্ঠ নীতিনির্ধারক ও উদ্যোক্তা হাবিবুল্লাহ এন করিম এসব কথা বলেন। তিনি দেশের বর্তমান আইটি সেবা, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম এবং সামগ্রিক কর কাঠামোর অসামঞ্জস্যতা দূর করতে আমূল পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছেন।

লোকাল প্রেফারেন্স: দেশীয় শিল্পের রক্ষাকবচ

হাবিবুল্লাহ এন করিম তার বক্তব্যের শুরুতেই দেশের ভেতরে তৈরি হওয়া প্রযুক্তি পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন,

তিনি গ্রামীণফোন বা বাংলালিংকের মতো বড় টেলিকম ও মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলোর উদাহরণ টেনে বলেন,‘এসব বড় প্রতিষ্ঠানের আইটি চাহিদা মেটাতে যদি স্থানীয় সফটওয়্যার কোম্পানিগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হতো, তবে দেশের ভেতরেই অনেক বেশি মূল্য সংযোজন সম্ভব হতো।’

তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘‘একটি শক্তিশালী ‘লোকাল প্রেফারেন্স’ নীতি প্রণয়ন করা হলে দেশীয় উদ্যোক্তারা কেবল আর্থিকভাবে স্বাবলম্বীই হবেন না, বরং তাদের উদ্ভাবনী সক্ষমতাও বহুগুণ বাড়বে। যখন একটি দেশীয় প্রতিষ্ঠান নিজ দেশের সরকারের বড় কোনো প্রজেক্ট সফলভাবে শেষ করার সুযোগ পায়, তখন তারা আন্তর্জাতিক বাজারেও আত্মবিশ্বাসের সাথে কাজ পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে।’’

তথ্যনির্ভর নীতিনির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা

বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে হাবিবুল্লাহ এন করিম বলেন,‘আমাদের নীতিনির্ধারণ অনেক ক্ষেত্রে তথ্য বা ডাটার ওপর ভিত্তি করে হয় না।’ তিনি গার্টনার, আইডিসি, ফরেস্টার এবং পিডব্লিউসির মতো আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থাগুলোর ইন্ডাস্ট্রি ডাটা ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তার মতে, নীতিনির্ধারকদের উচিত বৈশ্বিক প্রযুক্তির গতিপ্রকৃতি এবং স্থানীয় শিল্পের সক্ষমতা বিচার করে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়া। তথ্যহীন এবং অনুমানের ওপর ভিত্তি করে যে নীতি তৈরি হয়, তা অনেক সময় হিতে বিপরীত ফল বয়ে আনে। প্রযুক্তি খাতের বাজেট বরাদ্দেও এই বৈজ্ঞানিক ও তথ্যনির্ভর পদ্ধতি অনুসরণ করার আহ্বান জানান তিনি।

অসম কর কাঠামো ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মের সংকট

বর্তমান কর ব্যবস্থার অসঙ্গতিগুলো তুলে ধরে তিনি বলেন,‘আইটি সেবা এবং ওটিটি প্ল্যাটফর্মের ওপর একটি উদ্ভাবনী করনীতি প্রণয়ন করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। বর্তমানে টার্নওভার ট্যাক্স, এক্সাইজ ডিউটি এবং আয়করের ওপর বাড়তি করের বোঝা উদ্যোক্তাদের জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা।’

তিনি বিশেষ করে ওটিটি প্ল্যাটফর্মের ওপর কর কাঠামোর সংস্কারের কথা বলেন। তার মতে, আন্তর্জাতিক স্ট্রিমিং জায়ান্টগুলো এ দেশ থেকে ব্যবসা করে গেলেও স্থানীয় প্ল্যাটফর্মগুলো অসম কর ও রেগুলেটরি চাপের কারণে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। করনীতির এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ রূপরেখা থাকা উচিত যা স্থানীয় উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করবে এবং সরকারের রাজস্ব আয়কেও টেকসই করবে।

কানেক্টিভিটি: উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি

হাবিবুল্লাহ এন করিমের মতে, ডিজিটাল অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে ‘ডেটা কমিউনিকেশন’ ও ‘কানেক্টিভিটি’ বা সংযোগ ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই। উচ্চগতির ইন্টারনেট ও নিরবচ্ছিন্ন ডেটা সংযোগ কেবল আইটি খাতের জন্য নয়, বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করে। তিনি নীতিনির্ধারক ও শিল্প খাতের সংশ্লিষ্টদের এক টেবিলে বসে কানেক্টিভিটির বাধাগুলো দূর করার পরামর্শ দেন। ইন্টারনেটের দাম কমানো এবং নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিত করা গেলেই কেবল দেশের সব খাতে ডিজিটালাইজেশনের সুফল পৌঁছানো সম্ভব।

নতুন উন্নয়ন মডেল ও টেক্স-জিডিপি অনুপাত

দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় একটি নতুন উন্নয়ন মডেলের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন তিনি। হাবিবুল্লাহ এন করিম বলেন,‘বর্তমানে সরকারের ওপর রাজস্ব আদায়ের বিশাল চাপ রয়েছে। বাংলাদেশের ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত অত্যন্ত কম। কিন্তু কেবল আইটি খাতের ওপর করারোপ করে এই অনুপাত বাড়ানো সম্ভব নয়। বরং একটি হালনাগাদ ও আধুনিক করনীতির মাধ্যমে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে যাতে ব্যবসার আকার বৃদ্ধি পায়। ব্যবসার আকার বাড়লে সরকারের সামগ্রিক রাজস্ব আদায়ও বাড়বে।’ তিনি মনে করেন, বাজেট প্রক্রিয়ার মধ্যে যে দীর্ঘদিনের অসঙ্গতিগুলো রয়েছে, তা দূর না করলে কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে।

ঐক্যবদ্ধ নীতি ও বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ

বাজেট বাস্তবায়ন ও নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে সরকার ও বেসরকারি খাতের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের দাবি জানান তিনি।

হাবিবুল্লাহ এন করিম বলেন,‘বারবার একই অভিযোগ বা দাবি পেশ করার চেয়ে এখন সময় এসেছে নীতিগুলোকে বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিয়মিত হালনাগাদ করার। সরকারি সংস্থা এবং শিল্প সংগঠনগুলোর মধ্যে যদি কার্যকর অংশীদারিত্ব না থাকে, তবে জাতীয় পর্যায়ে কোনো বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। বিশেষ করে আইটি খাতের জন্য একটি একক ও ঐক্যবদ্ধ নীতিমালা থাকা জরুরি যা সব খাতের প্রযুক্তিগত রূপান্তরকে পথ দেখাবে।’

আগামীর চ্যালেঞ্জ ও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি

বক্তব্যের শেষ দিকে তিনি প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়ানোর মানসিকতা তৈরি করার আহ্বান জানান। হাবিবুল্লাহ এন করিম বলেন,‘প্রযুক্তি খাত বা স্টক মার্কেটের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে একটি সমন্বিত জাতীয় নীতির আওতায় আনতে হবে।’ তিনি বিশ্বাস করেন যে, ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি এবং বাস্তবভিত্তিক নীতিনির্ধারণের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার কাঙ্ক্ষিত ডিজিটাল লক্ষে পৌঁছাতে পারবে। এ জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ধৈর্য এবং সম্মিলিত উদ্যোগ।

পরিশেষে হাবিবুল্লাহ এন করিম বলেন, ‘আমরা যদি প্রযুক্তিতে আসলেই স্বাবলম্বী হতে চাই, তবে সবার আগে নিজের দেশের মেধা ও পণ্যের ওপর আস্থা রাখতে হবে। ‘লোকাল প্রেফারেন্স’ কেবল একটি শব্দ নয়, এটি একটি জাতীয় চেতনা হওয়া উচিত। সরকারি ও করপোরেট পর্যায়ে দেশীয় সেবা ব্যবহারের যে দ্বার উন্মোচিত হবে, তা-ই হবে নতুন বাংলাদেশের প্রকৃত সোপান।

টেকওয়ার্ল্ডের আপডেটেড খবর পেতে WhatsApp চ্যানেল ফলো করুন