ইন্টারনেট এখন ইউটিলিটি, কর কাঠামো বৈরী: উচ্চ শুল্ক-ভ্যাট কমানোর দাবি

Mahbub Sharif

মাহবুব শরীফ

সোমবার, ২৫ মে ২০২৬, ১৫:১৫

ইন্টারনেট এখন ইউটিলিটি, কর কাঠামো বৈরী: উচ্চ শুল্ক-ভ্যাট কমানোর দাবি
ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আইএসপিএবি) -এর অর্থ সম্পাদক মঈন উদ্দিন আহম্মেদ -ছবি স্বত্ত্ব : টেকওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ

দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে ইন্টারনেট এখন বিদুৎ, পানি বা রাস্তার মতোই এক অপরিহার্য মৌলিক সেবা বা ইউটিলিটি। সরকার কাগজ-কলমে ইন্টারনেটকে ইউটিলিটি হিসেবে ঘোষণাও করেছে। তবে বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। সরকারের এই ঘোষণার প্রতিফলন নেই কর ও শুল্ক নীতিতে। বর্তমানে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের বিস্তারে বিভিন্ন পর্যায়ে প্রায় ৩৭ শতাংশ পর্যন্ত কর দিতে হচ্ছে। যা এই সেবাকে সাধারণ মানুষের জন্য ব্যয়বহুল করে তুলছে।

জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ সামনে রেখে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিভিন্ন অংশীজনের অংশগ্রহণে বৃহস্পতিবার (২১ মে) ‘টেকওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ’ আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে দেশের ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আইএসপিএবি)-এর অর্থ সম্পাদক মঈন উদ্দিন আহম্মেদ এসব অভিযোগ তুলে ধরেন।

ইউটিলিটি ঘোষণার পরও শুল্কের বোঝা

মঈন উদ্দিন আহম্মেদ তার বক্তব্যের শুরুতেই নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের বৈপরীত্যের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন,

ফাইবার ও যন্ত্রপাতিতে উচ্চ করের খড়গ

ইন্টারনেট সেবা তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দিতে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অবকাঠামো নির্মাণের উচ্চ ব্যয়। মঈন উদ্দিন জানান, ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের মূল উপাদান হলো অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল এবং বিভিন্ন নেটওয়ার্কিং ইকুইপমেন্ট। বর্তমানে এসব পণ্য আমদানিতে যে পরিমাণ শুল্ক ও কর দিতে হয়, তা সাধারণ উদ্যোক্তাদের জন্য অসহনীয়। তিনি আসন্ন বাজেটে অপটিক্যাল ফাইবার এবং ইন্টারনেটের যন্ত্রপাতির ওপর শূন্য বা ন্যূনতম কর নির্ধারণের জোরালো দাবি জানান। তার মতে, অবকাঠামো নির্মাণের খরচ কমলে কেবল তখনই প্রান্তিক গ্রামগুলোতে সাশ্রয়ী মূল্যে ইন্টারনেট সেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।

একাধিক স্তরে ভ্যাটের বিড়ম্বনা

ইন্টারনেট সেবায় বিদ্যমান ভ্যাট ব্যবস্থার অসামঞ্জস্যতা নিয়ে মঈন উদ্দিন আহম্মেদ বিস্তারিত আলোচনা করেন। তিনি জানান, বর্তমানে একই সেবার ওপর একাধিক স্তরে ভ্যাট আদায় করা হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন,‘একজন ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান যখন ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে (আইআইজি) থেকে ব্যান্ডউইথ কেনে, তখন সেখানে ভ্যাট দিতে হয়। আবার সেই ব্যান্ডউইথ যখন গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়, তখন গ্রাহক পর্যায়েও ভ্যাট আরোপ করা হয়। এই কয়েক স্তরের ভ্যাট ব্যবস্থার কারণে ইন্টারনেটের চূড়ান্ত বিল অনেক বেড়ে যাচ্ছে।’ তিনি এই ব্যবস্থাকে অযৌক্তিক বলে অভিহিত করেন এবং ভোক্তা পর্যায়ে ইন্টারনেটের ওপর ভ্যাট পুরোপুরি তুলে দেওয়ার প্রস্তাব দেন।

ব্রডব্যান্ড বিস্তারে ৩৭ শতাংশ করের বোঝা

মঈন উদ্দিন আহম্মেদ একটি চমকপ্রদ তথ্য দিয়ে বলেন,‘সব মিলিয়ে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের ওপর কার্যকর করের হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৭ শতাংশে। এর মধ্যে রয়েছে আমদানি শুল্ক, আগাম আয়কর (এআইটি) এবং বিভিন্ন স্তরের ভ্যাট। যখন একটি সেবাকে সরকার ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার মূল হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করছে, তখন তার ওপর ৩৭ শতাংশ কর চাপিয়ে রাখা উন্নয়নের দর্শনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।’ তিনি প্রশ্ন তোলেন, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রবৃদ্ধি চাইলে ইন্টারনেটের মতো মৌলিক সেবাকে কেন করের জাল থেকে মুক্ত রাখা হচ্ছে না?

প্রান্তিক জনপদে সেবার পথে বাধা

শহর ও গ্রামের ডিজিটাল ব্যবধান কমাতে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু বর্তমান কর কাঠামোর কারণে গ্রামাঞ্চলে ব্যবসা পরিচালনা করা ক্ষুদ্র আইএসপি উদ্যোক্তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। মঈন উদ্দিনের মতে, ঢাকার বাইরে ব্যান্ডউইথ পরিবহনের খরচ এমনিতেই বেশি, তার ওপর যন্ত্রপাতির উচ্চ দামের কারণে নতুন সংযোগ দিতে গিয়ে উদ্যোক্তারা লোকসানের মুখে পড়ছেন। যদি কর কাঠামো সহনীয় করা না হয়, তবে গ্রাম পর্যায়ে উচ্চগতির ইন্টারনেট পৌঁছে দেওয়ার সরকারি লক্ষ্যমাত্রা বড় ধরনের বাধার মুখে পড়বে।

বিদেশি বিনিয়োগ ও স্থানীয় উদ্যোক্তা রক্ষা

ইন্টারনেট খাতে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সুরক্ষার বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে। মঈন উদ্দিন বলেন,‘অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো অসম প্রতিযোগিতার সৃষ্টি করছে। স্থানীয় পর্যায়ে যারা বছরের পর বছর পরিশ্রম করে সেবা দিচ্ছেন, তাদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।’ তিনি দাবি করেন, বাজেটে কেবল কর কমালেই হবে না, বরং স্থানীয় আইএসপি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা এবং ব্যবসায়িক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। বৈদেশিক পেমেন্টের জটিলতার কারণে যন্ত্রপাতি আমদানিতে যে সমস্যা হচ্ছে, তা দ্রুত সমাধানের আহ্বান জানান তিনি।

বাজেটে প্রত্যাশা ও আগামীর স্মার্ট বাংলাদেশ

আসন্ন বাজেটে ইন্টারনেট সেবা খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার দাবি জানিয়ে মঈন উদ্দিন আহম্মেদ বলেন,‘ইন্টারনেট কেবল একটি ব্যবসায়িক পণ্য নয়, এটি শিক্ষার মাধ্যম, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং তথ্য পাওয়ার অধিকার। আমরা যদি শিক্ষা ও ফ্রিল্যান্সিং খাতকে উৎসাহিত করতে চাই, তবে ইন্টারনেটের দাম কমানোর কোনো বিকল্প নেই।’ তিনি সরকারকে অনুরোধ করেন, অন্তত আসন্ন অর্থবছরে ইন্টারনেটের যন্ত্রপাতির ওপর থেকে সব ধরনের বাড়তি শুল্ক তুলে নিয়ে সাধারণ মানুষের ডিজিটাল অধিকার নিশ্চিত করা হোক।

পরিশেষে তিনি বলেন,‘নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন সার্থক করতে হলে আমাদের একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল সমাজ গড়তে হবে। আর সেই সমাজের মূল ভিত্তি হলো সুলভ ও নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট। করের বোঝা কমিয়ে ইন্টারনেটকে আসলেই একটি জনকল্যাণমূলক ইউটিলিটি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার এখনই সময়।

টেকওয়ার্ল্ডের আপডেটেড খবর পেতে WhatsApp চ্যানেল ফলো করুন