বাজেট প্রত্যাশা ২০২৬-২৭
ই-কমার্সে জামানতবিহীন ঋণ ও বিশেষ গবেষণা তহবিলের দাবি
দেশের উদীয়মান ই-কমার্স বা ডিজিটাল কমার্স খাতের প্রাণশক্তি হিসেবে কাজ করছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা, যাদের একটি বড় অংশই নারী। কিন্তু এই খাতের যথাযথ বিকাশে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থায়নের সংকট, লজিস্টিক অব্যবস্থাপনা এবং করনীতির অস্থিরতা। আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে ই-কমার্স খাতে বিশেষ সুরক্ষা ও নীতি সহায়তা প্রয়োজন। বিশেষ করে জামানতবিহীন ঋণ প্রদান এবং গবেষণার জন্য একটি বিশেষ আরঅ্যান্ডডি তহবিল গঠন খুব জরুরি।
জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ সামনে রেখে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিভিন্ন অংশীজনের অংশগ্রহণে বৃহস্পতিবার (২১ মে) ‘টেকওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ’ আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব)-এর সহযোগী কমিটির সদস্য জান্নাতুল হক শাপলা এসব দাবি ও প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন।
তার মতে, যথাযথ নীতিনির্ধারণী সহায়তা পেলে এই খাতটি দেশের কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে।
নারী উদ্যোক্তাদের প্রধান বাধা অর্থায়ন
সংলাপে ই-ক্যাব প্রতিনিধি এবং নারী উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে জান্নাতুল হক শাপলা বলেন,
তিনি দাবি করেন, নতুন সরকারের বাজেট পরিকল্পনায় নারী উদ্যোক্তাদের অর্থনৈতিক মূলধারায় যুক্ত করতে সহজ শর্তে এবং কোনো ধরনের জামানত ছাড়াই ঋণ প্রদানের সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা থাকতে হবে। জামানতবিহীন ঋণের নিশ্চয়তা না থাকলে নারী উদ্যোক্তাদের সম্ভাবনা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হবে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
বিশেষ গবেষণা ও উন্নয়ন (আরঅ্যান্ডডি) তহবিলের প্রস্তাব
ই-কমার্স এবং স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমকে শক্তিশালী করতে জান্নাতুল হক শাপলা বাজেটে একটি বিশেষ গবেষণা ও উন্নয়ন বা আরঅ্যান্ডডি তহবিল গঠনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন,‘বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে তরুণদের উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগাতে রাষ্ট্র বড় অংকের বিনিয়োগ করে। বাংলাদেশের মেধাবী তরুণরা নিত্যনতুন আইডিয়া নিয়ে কাজ করলেও আর্থিক ও কারিগরি সহায়তার অভাবে সেগুলো বাস্তব রূপ পায় না। যদি সরকারিভাবে একটি বিশেষ তহবিল থাকে, তবে উদ্যোক্তারা নতুন নতুন পণ্য ও সেবা নিয়ে গবেষণা করতে পারবেন, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের ডিজিটাল অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করবে।’
করনীতির স্থিতিশীলতা ও বিদেশি বিনিয়োগ
বাংলাদেশের ই-কমার্স খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য করনীতিতে স্থিতিশীলতা প্রয়োজন বলে মনে করেন জান্নাতুল হক শাপলা। তিনি উল্লেখ করেন, যদি প্রতি বছর বাজেটে করের হার বা নীতিমালায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়, তবে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আস্থাহীনতায় ভোগেন। দীর্ঘমেয়াদী এবং বাস্তবসম্মত করনীতি থাকলে স্টার্টআপ খাতের ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে। তিনি দক্ষ জনশক্তিকে দেশে ধরে রাখতে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ই-কমার্স ও আইসিটি খাতের জন্য অন্তত ১০ বছরের একটি স্থিতিশীল কর কাঠামোর দাবি জানান।
ই-ক্যাবের কার্যক্রম সচল করার আহ্বান
আলোচনায় ই-ক্যাবের বর্তমান পরিস্থিতিও উঠে আসে। জান্নাতুল হক শাপলা জানান,রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এবং ৫ আগস্টের পর থেকে সংগঠনটির কার্যক্রম অনেকটা স্থগিত রয়েছে। তিনি মনে করেন, দেশের আইসিটি খাতের উন্নয়নে ই-ক্যাব একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্টেকহোল্ডার বা অংশীজন। বেসিস বা অন্যান্য সংগঠনের মতো ই-ক্যাবকেও দ্রুত সচল করে এই খাতের উদ্যোক্তাদের সমস্যা সমাধানে কাজ করার সুযোগ দেওয়ার দাবি জানান তিনি।

বাজেটে প্রত্যাশা ও স্মার্ট ইকোনমি
সংলাপের শেষে আলোচকরা একমত হন যে, ই-কমার্স কেবল একটি কেনাবেচার মাধ্যম নয়, এটি আগামীর ‘স্মার্ট ইকোনমি’র ভিত্তি। আসন্ন বাজেটে যদি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য কর হার কমানো হয়, রপ্তানিমুখী সহায়তা বাড়ানো হয় এবং প্রণোদনা নিশ্চিত করা হয়, তবে এই খাত থেকেই সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান তৈরি সম্ভব। তারা সরকারকে অনুরোধ করেন, কেবল রাজস্ব সংগ্রহের দিকে নজর না দিয়ে খাতটিকে বড় হওয়ার সুযোগ দিতে। উদ্যোক্তারা বিকশিত হলে সরকার পরোক্ষভাবে ভ্যাট ও করের মাধ্যমে অনেক বেশি রাজস্ব পাবে।
পরিশেষে জান্নাতুল হক শাপলা বলেন, নারী উদ্যোক্তারা আজ আর পিছিয়ে নেই। কিন্তু তাদের মেধা ও শ্রমকে জাতীয় উন্নয়নে কাজে লাগাতে হলে প্রয়োজন জামানতবিহীন ঋণ এবং ব্যবসা করার একটি স্থিতিশীল পরিবেশ। আসন্ন বাজেট যেন নারী উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়, এটাই প্রত্যাশা।