বাজেট প্রত্যাশা ২০২৬-২৭

ল্যাপটপে উচ্চ করের সুফল নেই, বাড়ছে অবৈধ আমদানি ও পুরোনো পণ্যের বাজার

Mahbub Sharif

মাহবুব শরীফ

সোমবার, ২৫ মে ২০২৬, ১৪:০৪

ল্যাপটপে উচ্চ করের সুফল নেই, বাড়ছে অবৈধ আমদানি ও পুরোনো পণ্যের বাজার
বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি (বিসিএস)-এর সাবেক সভাপতি শহীদ উল মুনীর -ছবি স্বত্ত্ব : টেকওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ

বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে ল্যাপটপ ও কম্পিউটার উৎপাদনের উদ্দেশে একসময় শুল্ক ও কর বাড়ানো হয়েছিল। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে, এই সিদ্ধান্তের সুফল মেলেনি। উল্টো উচ্চ করের চাপে বৈধ পথে ল্যাপটপ আমদানি কমে গেছে এবং শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আসা অবৈধ পণ্য ও পুরোনো বা ‘সেকেন্ড হ্যান্ড’ ল্যাপটপে বাজার সয়লাব হয়ে গেছে। এর ফলে সরকার যেমন বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে, তেমনি সাধারণ গ্রাহক ও শিক্ষার্থীরা গুণগত মানের পণ্য ও বিক্রয়োত্তর সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ সামনে রেখে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিভিন্ন অংশীজনের অংশগ্রহণে বৃহস্পতিবার (২১মে) ‘টেকওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ’ আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে দেশের হার্ডওয়্যার খাতের সংকট তুলে ধরে এসব আশঙ্কার কথা জানান বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি (বিসিএস)-এর সাবেক সভাপতি শহীদ উল মুনীর। তিনি স্পষ্ট করেই বলেন,‘পর্যাপ্ত সক্ষমতা তৈরি না করে কেবল কর বসিয়ে স্থানীয় শিল্প রক্ষা করা সম্ভব নয়।’

কর নীতির নেতিবাচক প্রভাব ও রাজস্ব ক্ষতি

সংলাপে শহীদ উল মুনীর বলেন,

পূর্ণাঙ্গ উৎপাদন কি আদৌ সম্ভব?

দেশে ল্যাপটপ উৎপাদন নিয়ে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বিষয়ে শহীদ উল মুনীর অত্যন্ত সাহসী ও বাস্তবসম্মত বিশ্লেষণ প্রদান করেন। তিনি বলেন,‘বাংলাদেশে ল্যাপটপের সব যন্ত্রাংশ তৈরি করে একটি পূর্ণাঙ্গ ল্যাপটপ উৎপাদন করা বর্তমানে প্রায় অসম্ভব। ল্যাপটপ বা ডেস্কটপের মতো উচ্চ প্রযুক্তির পণ্যের বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা অত্যন্ত জটিল এবং এর জন্য বিশাল পরিসরের উৎপাদনের প্রয়োজন হয়। বৈশ্বিক বাজারে অ্যাপল, এইচপি বা ডেল-এর মতো জায়ান্টদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কেবল স্থানীয় চাহিদার ওপর ভিত্তি করে উৎপাদন টেকসই করা কঠিন। তাই আবেগ দিয়ে নয়, বরং যে খাতের সক্ষমতা আমাদের আছে, সেই খাতের উন্নয়নে কর ছাড় দেওয়া এবং গবেষণায় বিনিয়োগ করা জরুরি।’

অবৈধ আমদানির ঝুঁকি ও গ্রাহক বিড়ম্বনা

উচ্চ করের ফলে বাজারে ‘গ্রে মার্কেট’ বা অবৈধ আমদানির যে বিস্তার ঘটেছে, তার প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন শহীদ উল মুনীর। তিনি জানান, অবৈধ পথে আসা ল্যাপটপগুলো সাধারণত কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক ওয়ারেন্টি বা বিক্রয়োত্তর সেবা ছাড়াই বিক্রি হয়। অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো বা রিফারবিশড ল্যাপটপ নতুন হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা যখন তাদের পড়াশোনা বা ফ্রিল্যান্সিংয়ের জন্য ল্যাপটপ কিনতে যান, তখন দামের পার্থক্যের কারণে তারা এই অবৈধ বা পুরোনো পণ্যের দিকে ঝুঁকে পড়ছেন। কিন্তু কিছুদিন ব্যবহারের পর যখন কারিগরি সমস্যা দেখা দেয়, তখন তারা আর কোনো সমাধান পান না। এটি সামগ্রিকভাবে দেশের প্রযুক্তি গ্রহণ ও ডিজিটাল রূপান্তরের প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে।

তথ্যপ্রযুক্তি খাতে জরিপের অপরিহার্যতা

বাজেট বরাদ্দ ও নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে তথ্যের অভাবকে দেশের আইটি খাতের অন্যতম বড় সংকট হিসেবে চিহ্নিত করেন শহীদ উল মুনীর। তিনি বলেন,‘আমরা প্রায়ই বলি দেশে কয়েক লাখ ফ্রিল্যান্সার আছে বা আইটি খাতে এত জনবল প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে আমাদের কাছে কোনো নির্ভরযোগ্য ডাটা বা পরিসংখ্যান নেই।’ তিনি প্রস্তাব করেন, সরকারের উচিত দ্রুততম সময়ের মধ্যে দেশে হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারের প্রকৃত চাহিদা কত এবং আইটি খাতে ঠিক কতজন দক্ষ জনবল আছে বা প্রয়োজন, তা নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘আইসিটি সার্ভে’ বা জরিপ পরিচালনা করা। তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা ছাড়া কেবল অনুমানের ওপর ভিত্তি করে বাজেট বরাদ্দ দিলে তার সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে না।

বাজেট ও কর কাঠামোর অসামঞ্জস্যতা

সংলাপে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির চিত্র এবং কর কাঠামোর সীমাবদ্ধতা নিয়েও কথা বলেন শহীদ উল মুনীর। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে সরকারের পরিচালন ব্যয় রাজস্ব আয়ের চেয়ে অনেক বেশি হয়ে গেছে। রাজস্ব ঘাটতি পূরণের জন্য সরকার যখন একই করদাতার ওপর বারবার করের হার বাড়ায়, তখন তা ব্যবসার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ব্যক্তিগত আয়করের সর্বোচ্চ হার ৩০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩৫ শতাংশ করার যে আলোচনা চলছে, তা প্রযুক্তি খাতের পেশাজীবী ও ব্যবসায়ীদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করবে। তিনি মনে করেন, করের হার বাড়ানোর চেয়ে করের আওতা বাড়ানো এবং কর ফাঁকি রোধে কাঠামোগত সংস্কার করাই হবে সঠিক সমাধান।

রিফান্ড ও পেমেন্ট জটিলতা

আমদানি পর্যায়ে অগ্রিম কর (এআইটি) এবং অগ্রিম ভ্যাট (এটিভি)-এর যে জটিলতা রয়েছে, তা হার্ডওয়্যার ব্যবসায়ীদের জন্য বড় বোঝা বলে উল্লেখ করেন তিনি। পণ্য বিক্রির আগেই এই কর দিতে হয়, যা ব্যবসায়ীদের চলতি মূলধনের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে এই অর্থ সমন্বয় করা বা রিফান্ড পাওয়ার প্রক্রিয়া এতটাই জটিল যে, অনেক ব্যবসায়ী এই সুবিধা নিতে পারেন না। তিনি এই প্রক্রিয়াকে সহজতর করার দাবি জানান যাতে ব্যবসায়ীরা হয়রানিমুক্ত পরিবেশে ব্যবসা করতে পারেন।

প্রত্যাশা ও আগামীর পথ

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ল্যাপটপ ও কম্পিউটারের ওপর থেকে ভ্যাট প্রত্যাহার করে পুনরায় শুল্কমুক্ত আমদানির সুযোগ দেওয়ার দাবি জানান শহীদ উল মুনীর। তিনি বলেন,‘প্রযুক্তি কোনো বিলাসিতা নয়, এটি এখন মৌলিক চাহিদা। যদি আমরা মেধাবী তরুণদের হাতে সাশ্রয়ী মূল্যে ল্যাপটপ তুলে দিতে না পারি, তবে নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়ন কঠিন হবে। একই সঙ্গে তিনি স্থানীয় শিল্পের প্রকৃত সক্ষমতা যাচাই করে বাস্তবসম্মত নীতি প্রণয়নের আহ্বান জানান।

পরিশেষে শহীদ উল মুনীর বলেন,‘প্রযুক্তি খাতের উন্নয়ন মানে কেবল বড় বড় প্রকল্প নয়, বরং সাধারণ মানুষের জন্য প্রযুক্তির ব্যবহার সহজ করা। সঠিক তথ্য বা ডাটাবেজ তৈরি এবং সহনীয় কর কাঠামোর মাধ্যমেই কেবল একটি সমৃদ্ধ ডিজিটাল অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব।’

টেকওয়ার্ল্ডের আপডেটেড খবর পেতে WhatsApp চ্যানেল ফলো করুন