বাজেট ২০২৬-২৭

আন্তর্জাতিক ঋণদাতার নকশায় নয়, নিজস্ব মডেলে উন্নয়ন চান ড. রোকনুজ্জামান

TechWorld Desk

মাহবুব শরীফ

শনিবার, ২৩ মে ২০২৬, ১৬:৪১

আন্তর্জাতিক ঋণদাতার নকশায় নয়, নিজস্ব মডেলে উন্নয়ন চান ড. রোকনুজ্জামান
অর্থনীতিবিদ ও প্রযুক্তি বিশ্লেষক ড. এম রোকনুজ্জামান -ছবি স্বত্ত্ব : টেকওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ

উন্নয়নের নামে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর দেওয়া প্রেসক্রিপশন অন্ধভাবে অনুসরণ করার ফলে বাংলাদেশ এক ভয়াবহ ‘ঋণনির্ভর দরিদ্র অর্থনীতি’র দিকে ধাবিত হচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও প্রযুক্তি বিশ্লেষক ড. এম রোকনুজ্জামান। তার মতে, নিজস্ব বাস্তবতা বিবেচনা না করে বিদেশি ঋণ কাঠামোর ভিত্তিতে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করায় দেশে শিক্ষিত বেকারত্ব বাড়ছে এবং বৈদেশিক ঋণের বোঝা ক্রমাগত ভারী হচ্ছে।

জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ সামনে রেখে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিভিন্ন অংশীজনের অংশগ্রহণে বৃহস্পতিবার (২১ মে) ‘টেকওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ’ আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ও শিল্পায়ন মডেলের মৌলিক ত্রুটিগুলো তুলে ধরেন।

ঋণের জালে বন্দি অর্থনীতি

গোলটেবিল বৈঠকে ড. রোকনুজ্জামান বলেন, 

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, যখন কোনো দেশ অন্যের দেওয়া ম্যাপ বা নকশায় পথ চলে, তখন সেই দেশের প্রকৃত সমৃদ্ধি আসা কঠিন। বিদেশি ঋণে অবকাঠামো উন্নয়ন হলেও সেই ঋণ পরিশোধের ক্ষমতা বা আয়ের উৎস তৈরি না হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

শিক্ষিত বেকারত্ব ও কর্মসংস্থানের সংকট

দেশের বর্তমান উন্নয়ন মডেল যে মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরিতে ব্যর্থ হচ্ছে, তার একটি বড় প্রমাণ হলো শিক্ষিত বেকারের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা। ড. রোকনুজ্জামান মনে করেন, আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর দেওয়া কর্মসংস্থান বা শিল্পায়নের মডেল বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কার্যকর হচ্ছে না। আমরা প্রতি বছর হাজার হাজার ডিগ্রিধারী গ্র্যাজুয়েট তৈরি করছি কিন্তু তাদের জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারছি না। এর মূল কারণ হলো আমাদের বর্তমান শিল্পায়ন মডেল কেবল সস্তা শ্রমের ওপর ভিত্তি করে টিকে আছে, যা উচ্চ শিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থানের চাহিদা ও প্রত্যাশা পূরণে পুরোপুরি অক্ষম।

অন্ধভাবে প্রযুক্তি আমদানির ঝুঁকি

প্রযুক্তি ও শিল্পায়নের বিষয়ে ড. রোকনুজ্জামান এক কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তিনি বলেন, বর্তমানে আমরা উন্নয়নের দোহাই দিয়ে অন্ধভাবে বিদেশ থেকে প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি আমদানিতে মত্ত হয়ে আছি। কিন্তু এসব প্রযুক্তি ব্যবহারে আমাদের ‘ভ্যালু এডিশন’ বা মূল্য সংযোজন অত্যন্ত সামান্য। বিদেশে তৈরি বিভিন্ন কম্পোনেন্ট বা যন্ত্রাংশ দেশে এনে কেবল সেগুলো জোড়া লাগানো বা অ্যাসেম্বলিং করা হচ্ছে। এতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার একটি বিশাল অংশ দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে, অথচ দেশের অভ্যন্তরে প্রকৃত প্রযুক্তিগত জ্ঞান বা উদ্ভাবনী ক্ষমতার উন্নয়ন ঘটছে না। যদি এই ধারা চলতে থাকে, তবে আমরা চিরকাল প্রযুক্তির ভোক্তা হিসেবেই থেকে যাব, কোনোদিন উদ্ভাবক হয়ে উঠতে পারব না।

জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার শিক্ষা

আলোচনায় ড. রোকনুজ্জামান বিশ্বের অন্যতম উন্নত দেশ জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার উন্নয়নের উদাহরণ দেন। তিনি বলেন, এই দেশগুলো কোনো দাতা সংস্থার ফর্মুলা বা বিদেশি ঋণের ওপর ভিত্তি করে আজকের এই অবস্থানে পৌঁছায়নি। তারা নিজেদের সামর্থ্য, মেধা এবং দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার মাধ্যমে নিজস্ব উন্নয়ন মডেল তৈরি করেছে। বাংলাদেশকেও যদি আসলেই একটি স্মার্ট রাষ্ট্রে পরিণত হতে হয়, তবে এমন একটি অর্থনৈতিক নকশা তৈরি করতে হবে যা এই দেশের নিজস্ব সম্পদ ও মেধার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অন্যের মডেল হুবহু কপি করে টেকসই সফল হওয়ার কোনো নজির বিশ্বে নেই।

অটোমেশন ও সস্তা শ্রমের সমাপ্তি

বাংলাদেশে দীর্ঘ দিন ধরে বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ‘সস্তা শ্রম’কে ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে ড. রোকনুজ্জামান মনে করেন, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগে সস্তা শ্রমের গুরুত্ব দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। অটোমেশন বা স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি এখন মানুষের জায়গা দখল করে নিচ্ছে। এই অবস্থায় যদি আমরা কেবল সস্তা শ্রমের ওপর ভিত্তি করে শিল্পায়ন চালিয়ে নিতে চাই, তবে অচিরেই আমরা বিশ্ববাজারের প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়ব। তিনি পরামর্শ দেন, সস্তা শ্রমের মোহে না থেকে দ্রুত দক্ষ জনবল তৈরির দিকে মনোযোগ দিতে হবে, যারা আধুনিক প্রযুক্তির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারবে।

কম্পোনেন্ট ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে সতর্ক বিনিয়োগ

সরকার বর্তমানে দেশে বিভিন্ন যন্ত্রাংশ বা কম্পোনেন্ট তৈরির কারখানা স্থাপনে বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করছে। তবে এ বিষয়ে কিছুটা ভিন্নমত ও সতর্কতা পোষণ করেন ড. রোকনুজ্জামান। তিনি বলেন, অন্ধভাবে সব ধরনের কম্পোনেন্ট ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে বড় বিনিয়োগ করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। বিশ্ববাজারে কোন জিনিসের ভবিষ্যৎ চাহিদা কেমন থাকবে এবং আমাদের কোন নির্দিষ্ট খাতে তুলনামূলক সুবিধা আছে, তা নিবিড়ভাবে বিচার করে বিনিয়োগ করতে হবে। অন্যথায় বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করার পর দেখা যাবে সেই সব যন্ত্রাংশের বাজার চলে গেছে বা তার চেয়ে উন্নত নতুন কোনো প্রযুক্তি বাজারে চলে এসেছে।

বাজেটে নিজস্ব নকশার প্রতিফলন

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের গতানুগতিক হিসাব হওয়া উচিত নয় বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, বাজেটে দেশের নিজস্ব শিল্প ও প্রযুক্তি বিকাশের একটি সুদূরপ্রসারী ও দীর্ঘমেয়াদি দিকনির্দেশনা থাকা প্রয়োজন। বিদেশি ঋণনির্ভরতা কমিয়ে কীভাবে অভ্যন্তরীণ সম্পদ ও মেধার সর্বোচ্চ বিকাশ ঘটানো যায়, তার সুস্পষ্ট প্রতিফলন থাকা উচিত বাজেটে। নীতিনির্ধারকদের সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সময় এসেছে বিদেশি দাতা সংস্থার ফর্মুলা থেকে বেরিয়ে এসে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ দর্শনের প্রকৃত বাস্তবায়ন করা।

পরিশেষে ড. রোকনুজ্জামান সতর্ক করে দিয়ে বলেন, যদি আমরা এখনই আমাদের উন্নয়ন দর্শনে আমূল পরিবর্তন না আনি, তবে নতুন  বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন কেবল একটি ব্যয়বহুল বিলাসিতা হয়ে থাকবে। দেশকে প্রকৃত অর্থে টেকসই ও স্বাবলম্বী করতে হলে নিজস্ব চিন্তা, গবেষণা এবং দেশীয় বাস্তবতার ভিত্তিতে এক নতুন উন্নয়ন যাত্রার সূচনা করতে হবে।

টেকওয়ার্ল্ডের আপডেটেড খবর পেতে WhatsApp চ্যানেল ফলো করুন