বাজেট প্রত্যাশা ২০২৬-২৭
মোবাইল উৎপাদন খাতে অস্থিরতা : ‘গ্রে মার্কেট’ ও নীতিহীনতার দ্বিমুখী চাপ
দেশে মোবাইল হ্যান্ডসেট উৎপাদন শিল্পে বড় ধরনের বিনিয়োগ এলেও দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত নীতিমালার অভাবে এই খাতটি এখন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। একদিকে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কর কাঠামো ও বারবার নীতি পরিবর্তন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করছে, অন্যদিকে প্রায় ৫০ শতাংশ ‘গ্রে মার্কেট’ বা অবৈধ হ্যান্ডসেটের বাজার বৈধ উৎপাদকদের পথে বসাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বাজেট ঘোষণার আগে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ ও একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় ফোরাম গঠনের দাবি জানানো হয়েছে।
জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ সামনে রেখে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিভিন্ন অংশীজনের অংশগ্রহণে বৃহস্পতিবার (২১ মে) ‘টেকওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ’ আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে দেশের মোবাইল উৎপাদন খাতের সংকটের কথা তুলে ধরেন বাংলাদেশ মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি ওনার অ্যাসোসিয়েশন (এমআইওবি)-এর সভাপতি জাকারিয়া শহীদ। তিনি জানান, ২০১৭ সাল থেকে দেশীয় এই শিল্পে ১৮টি প্রতিষ্ঠান বড় বিনিয়োগ করলেও প্রতি বছর বাজেটে নীতির পরিবর্তন এই অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দিচ্ছে।
সংগঠনগুলোর অনৈক্য ও নীতিনির্ধারণী বিভ্রান্তি
জাকারিয়া শহীদ তার বক্তব্যের শুরুতেই তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সংগঠনগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাবকে বড় দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি বলেন,
অপারেটরদের চড়া চার্জ ও জটিল গাইডলাইন
মোবাইল খাতের কনটেন্ট বা সেবার ক্ষেত্রে অপারেটরদের আধিপত্যের সমালোচনা করেন জাকারিয়া শহীদ। তিনি জানান, যখন কোনো কনটেন্ট বা ডিজিটাল সেবা বাইরে থেকে আনা হয়, তখন মোবাইল অপারেটররা শুরুতেই লভ্যাংশের প্রায় ৬০ শতাংশ চার্জ হিসেবে কেটে নেয়। এরপর বিটিআরসি’কে আলাদা ফি দিতে হয় এবং বিভিন্ন জটিল গাইডলাইন মানতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় এসব গাইডলাইন এক জায়গায় মানা হচ্ছে তো অন্য জায়গায় মানা হচ্ছে না। এই পুরো প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক জটিলতা এ খাতের উদ্ভাবকদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নীতি পরিবর্তনের খড়গ ও আস্থার সংকট
মোবাইল ম্যানুফ্যাকচারিং বা উৎপাদন খাতের বিনিয়োগ পরিস্থিতি তুলে ধরে জাকারিয়া শহীদ বলেন,‘এ দেশে একটি শিল্প স্থাপনের পর তা পূর্ণাঙ্গ রূপে দাঁড়াতে অন্তত ৫ থেকে ১০ বছর সময় লাগে। কিন্তু বাংলাদেশে প্রতি বছরই বাজেটে ইনসেনটিভ বা করসুবিধা নিয়ে নতুন নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গত বছর যা দেওয়া হয়েছিল, এ বছর তা প্রত্যাহার করা হচ্ছে। এই যে অস্থিতিশীল পরিবেশ, তা দেশি-বিদেশি কোনো বিনিয়োগকারীর জন্যই স্বস্তিদায়ক নয়। বর্তমানে ১৮টি কোম্পানি এই খাতে বিনিয়োগ করলেও অনিশ্চয়তার কারণে তারা দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা নিতে পারছেন না।’
অযৌক্তিক কর কাঠামো ও ভুল মূল্যায়ন পদ্ধতি
কর ব্যবস্থার অসামঞ্জস্যতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে এমআইওবি সভাপতি বলেন,‘এই শিল্পে ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর (এআইটি) অত্যন্ত বড় একটি বোঝা। যেখানে অনেক ক্ষেত্রে শিল্পের নিট মার্জিন থাকে ২০ শতাংশ, সেখানে শুরুতেই বড় অংকের কর কেটে নেওয়া হলে ব্যবসায়িক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়।’ এছাড়া শুল্কায়নের ক্ষেত্রে ভ্যালু অ্যাসেসমেন্ট বা পণ্য মূল্যায়ণের পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তিনি বলেন,‘আইটি খাতের পণ্যের মূল্যায়ণ করা হচ্ছে গার্মেন্টস বা ফুটওয়্যার খাতের ফর্মুলায়, যা কোনোভাবেই বাস্তবসম্মত নয়। মোবাইল বা প্রযুক্তি পণ্যের মূল্য মূলত নির্ধারিত হয় তার ভেতরের কম্পোনেন্ট ও মেধার ওপর ভিত্তি করে। এই ভুল মূল্যায়ণ পদ্ধতির কারণে সিম্ফনির মতো প্রতিষ্ঠান এক সময় বিদেশে মোবাইল রপ্তানি শুরু করেও তা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।’

অ্যাসেম্বলি থেকে কম্পোনেন্ট ইকোসিস্টেমের দিকে যাওয়ার চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশ মূলত মোবাইল ফোন সংযোজন বা অ্যাসেম্বলিং শিল্পে সফল হয়েছে, কিন্তু এখনো কম্পোনেন্ট ইকোসিস্টেম বা যন্ত্রাংশ তৈরির সক্ষমতা গড়ে ওঠেনি। জাকারিয়া শহীদ বলেন,‘জাপান, চীন বা ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো ধাপে ধাপে নিজেদের কম্পোনেন্ট শিল্প গড়ে তুলেছে। কিন্তু আমাদের দেশে এসএসটি (SMT) লাইনের মতো আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থা থাকলেও তা অনেক সময় অর্ধেক সক্ষমতায় চলতে বাধ্য হয়।’ ব্যাটারি ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন,‘যদি একটি ব্যাটারি বানাতে প্রয়োজনীয় ৯০ শতাংশ কাঁচামাল বিদেশ থেকে আনতে হয় এবং তার ওপর কোনো নীতিগত সুরক্ষা না থাকে, তবে সেই শিল্প কোনোদিন টেকসই হবে না। এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর এই সুরক্ষা না থাকলে শিল্পগুলো পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।’
গ্রে মার্কেটের আগ্রাসনে রাজস্ব ক্ষতি
বৈধ মোবাইল উৎপাদনকারীদের জন্য সবচেয়ে বড় দুঃসংবাদ হলো ‘গ্রে মার্কেট’। জাকারিয়া শহীদের মতে, বর্তমানে দেশের মোট হ্যান্ডসেট বাজারের প্রায় অর্ধেক বা ৫০ শতাংশই অবৈধভাবে আনা বা গ্রে মার্কেটের দখলে। এই অবৈধ পথে আসা ফোনের কারণে সরকার বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। এছাড়া বাজারে নকল ও রিফারবিশড (পুরোনো ফোন মেরামত করে নতুন হিসেবে বিক্রি) ফোনের প্রবাহ বেড়ে গেছে। বৈধ ব্যবসায়ীরা ভ্যাট-ট্যাক্স দিয়ে পণ্য বিক্রি করেন বলে তারা গ্রে মার্কেটের সস্তা দামের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারছেন না। সরকার যদি কেবল এই অবৈধ বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তবে রাজস্ব কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে এবং দেশীয় শিল্প রক্ষা পাবে।
সমন্বিত শিল্পনীতির জন্য কেন্দ্রীয় ফোরামের প্রস্তাব
সংলাপের শেষে জাকারিয়া শহীদ একটি সুনির্দিষ্ট সমাধান প্রস্তাব করেন। তিনি বলেন,‘এনবিআর, বিডা, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং আইসিটি মন্ত্রণালয়কে একসাথে বসে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্রতিটি সংস্থা যদি আলাদা আলাদাভাবে ফাইল নাড়াচাড়া করে, তবে এই খাতের সংকট কাটবে না। তিনি একটি কেন্দ্রীয় ফোরাম গঠনের প্রস্তাব দেন যেখানে সব অংশীজন একসাথে বসে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত শিল্পনীতি তৈরি করবেন।
সবশেষে তিনি বলেন,‘মোবাইল ফোন এখন কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি আধুনিক বাংলাদেশের অন্যতম ডিজিটাল টুল। এই শিল্পকে যদি আমরা বাঁচাতে না পারি, তবে ভবিষ্যতে আমরা আবার পুরোপুরি আমদানিনির্ভর দেশে পরিণত হব। তাই আসন্ন বাজেটে তদারকি বাড়ানো, গ্রে মার্কেট বন্ধ করা এবং কর কাঠামো যৌক্তিক করার জন্য নীতিনির্ধারকদের সাহসী ভূমিকা পালন করতে হবে।’