বাজেট ২০২৬-২৭

রাজস্ব বাড়াতে নীতি প্রণয়ন ও সংগ্রহ কার্যক্রম আলাদা করার তাগিদ

TechWorld Desk

মাহবুব শরীফ

শনিবার, ২৩ মে ২০২৬, ১৪:৩৫

রাজস্ব বাড়াতে নীতি প্রণয়ন ও সংগ্রহ কার্যক্রম আলাদা করার তাগিদ
রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ডায়ালগের অতিরিক্ত পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান -ছবি স্বত্ব : টেকওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ

দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও ক্রমাগত বাড়তে থাকা রাজস্ব ঘাটতি মোকাবিলায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাঠামোতে আমূল পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছেন প্রযুক্তিবিদ ও ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে করের হার বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টি না করে করের আওতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। 

জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ সামনে রেখে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিভিন্ন অংশীজনের অংশগ্রহণে বৃহস্পতিবার (২১ মে) ‘টেকওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ’ আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ডায়ালগের অতিরিক্ত পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির চিত্র তুলে ধরে এই প্রস্তাবনা দেন। তিনি সাফ জানিয়েছেন, এনবিআরের নীতিনির্ধারণী কাজ এবং রাজস্ব সংগ্রহের প্রশাসনিক কাজ আলাদা করা না গেলে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।

কর-জিডিপি অনুপাতের করুণ দশা

তৌফিকুল ইসলাম খান তার বিশ্লেষণে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, 

একই পিঠের ওপর বারবার করের বোঝা

রাজস্ব ঘাটতি মেটাতে সরকার প্রায়ই বিদ্যমান করদাতাদের ওপর নতুন করের বোঝা চাপিয়ে দেয়। তৌফিকুল ইসলাম খান এই প্রবণতার তীব্র সমালোচনা করে বলেন, করের আওতা বাড়ানোর পরিবর্তে একই ব্যক্তির ওপর বারবার করের হার বাড়ানো হচ্ছে। বর্তমানে ব্যক্তিগত আয়করের সর্বোচ্চ হার ৩০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩৫ শতাংশ করার যে চিন্তাভাবনা চলছে, তাকে তিনি ‘কর ন্যায়বিচারের পরিপন্থী’ বলে অভিহিত করেন। তার মতে, যারা নিয়মিত কর দিচ্ছেন, তাদের ওপর চাপ বাড়ালে কর ফাঁকির প্রবণতা আরও বাড়ে। মূল সমস্যা করের হারে নয়, বরং কর ফাঁকি রোধে কাঠামোগত দুর্বলতা ও একটি জটিল করব্যবস্থার মধ্যে নিহিত। কর প্রদানের প্রক্রিয়া সহজ না করলে মানুষ কর দিতে নিরুৎসাহিত হবে।

জটিল করব্যবস্থা ও রিফান্ড বিড়ম্বনা

দেশের ব্যবসায়ীরা কেন কর দিতে ভয় পান বা ফাঁকি দেওয়ার পথ খোঁজেন, তার একটি ব্যাখ্যা দেন তৌফিকুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, আমদানি পর্যায়ে অগ্রিম কর (এআইটি) ও অগ্রিম ভ্যাট (এটিভি) আদায়ের যে ব্যবস্থা রয়েছে, তা অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসার মূলধনের ওপর আঘাত করে। পণ্যের প্রকৃত মূল্য সংযোজন হোক বা না হোক, কর আগেই কেটে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে সেই অর্থ সমন্বয় করা বা রিফান্ড পাওয়া এক দীর্ঘমেয়াদি বিড়ম্বনার নাম। এই জটিলতা ও হয়রানি থেকে বাঁচতে অনেক ব্যবসায়ী অসদুপায় অবলম্বন করতে বাধ্য হন। তিনি মনে করেন, একটি স্বচ্ছ ও সহজ রিফান্ড ব্যবস্থা চালু করা গেলে ব্যবসায়ীদের মধ্যে কর প্রদানের আগ্রহ বাড়বে।

সহজ খাতের ওপর করের খড়গ

সরকারের রাজস্ব সংগ্রহের কৌশল নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এই গবেষক। তিনি বলেন, সরকার সাধারণত সেই সব খাত থেকে রাজস্ব আদায় করতে পছন্দ করে যেখান থেকে সহজে টাকা পাওয়া যায়। যেমন-মোবাইল ইন্টারনেট বা টেলিকম খাত। এটি একটি অত্যন্ত সুসংগঠিত খাত হওয়ায় এখান থেকে সম্পূরক শুল্ক আদায় করা সহজ। কিন্তু অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথা চিন্তা করলে দেখা যায়, ইন্টারনেটের ওপর এই বাড়তি কর সাধারণ মানুষের ডিজিটাল সেবায় প্রবেশের পথ সংকুচিত করছে। রাজস্ব আদায়ের এই ‘শর্টকাট’ পদ্ধতি দীর্ঘমেয়াদে দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

এনবিআর সংস্কারের সাহসী প্রস্তাব

তৌফিকুল ইসলাম খানের বক্তব্যের প্রধান দাবি ছিল এনবিআর-এর সংস্কার। তিনি প্রস্তাব করেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নীতিনির্ধারণী কাজ এবং রাজস্ব সংগ্রহের প্রশাসনিক কার্যক্রমকে পুরোপুরি আলাদা করে ফেলা উচিত। বর্তমানে একই সংস্থা নীতি তৈরি করে এবং তারাই আবার তা বাস্তবায়ন বা আদায় করে। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হয় এবং নিরপেক্ষতা বজায় থাকে না। যদি নীতিনির্ধারণের জন্য আলাদা একটি স্বাধীন বিভাগ থাকে এবং আদায়ের জন্য আলাদা প্রশাসনিক কাঠামো থাকে, তবে নীতিনির্ধারণ অনেক বেশি তথ্যনির্ভর ও নিরপেক্ষ হবে। এতে রাজস্ব সংগ্রহে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হবে বলে তিনি মনে করেন।

ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ ও ডাটাভিত্তিক নীতি

প্রযুক্তি খাতের দ্রুত পরিবর্তনের সাথে তাল মেলাতে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তথ্য বা ডাটা বিশ্লেষণের অভাব রয়েছে বলে মনে করেন তৌফিকুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, বিভিন্ন উপখাত থেকে অনেক দাবি উত্থাপন করা হয়, কিন্তু সেগুলো তথ্য-প্রমাণভিত্তিকভাবে নীতিনির্ধারকদের সামনে তুলে ধরার ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে ফ্রিল্যান্সিং ও ভবিষ্যতের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত কর্মসংস্থান বাজারের জন্য এখনই নীতিগত প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন। নীতিনির্ধারণ ও ডাটা বিশ্লেষণের মধ্যে এই সংযোগ স্থাপন করা না গেলে সামনে বড় ধরনের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে।

বিনিয়োগ ও মানসিকতার পরিবর্তন

বিনিয়োগের ক্ষেত্রে স্থানীয় ও বিদেশি উভয় পক্ষকেই সমান গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তার মতে, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে আরও উন্মুক্ত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। বাংলাদেশে অনেক সময় ‘এটি এখানে সম্ভব নয়’-এমন একটি নেতিবাচক ধারণা কাজ করে। এই মানসিকতা পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও বাস্তবভিত্তিক নীতিনির্ধারণের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষে পৌঁছাতে পারবে।

সবশেষে তিনি বলেন, ক্রমাগত বাড়তে থাকা রাজস্ব ঘাটতি আজ ১ লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছেছে। এই বিশাল ঘাটতি পূরণ করতে হলে শুধু নতুন কর বসালেই হবে না, বরং পুরো করব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার করতে হবে। করের বোঝা না বাড়িয়ে করের আওতা বাড়ানোর মাধ্যমেই টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব।

টেকওয়ার্ল্ডের আপডেটেড খবর পেতে WhatsApp চ্যানেল ফলো করুন