বাজেট প্রত্যাশা ২০২৬-২৭
সুপরিকল্পিত পরিকল্পনার অভাবই আইটি খাতের বড় বাধা: ফোরকান বিন কাশেম
বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিকাশে প্রধান অন্তরায় হিসেবে ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’ বা সুপরিকল্পিত পরিকল্পনার অভাবকে চিহ্নিত করেছেন এ খাতের অভিজ্ঞ উদ্যোক্তা ফোরকান বিন কাশেম। তার মতে, তাৎক্ষণিক সাফল্যের আকাঙ্ক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদী রূপরেখার অভাব আমাদের প্রযুক্তি খাতকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে দিচ্ছে না। বিশেষ করে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর গবেষণা এবং শিল্পখাতের বাস্তব চাহিদার মধ্যে যে বিস্তর ফারাক রয়েছে, তা প্রযুক্তি খাতের অগ্রযাত্রাকে স্থবির করে দিচ্ছে।
জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ সামনে রেখে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিভিন্ন অংশীজনের অংশগ্রহণে বৃহস্পতিবার (২১ মে) ‘টেকওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ’ আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এসব মন্তব্য করেন।
সুপরিকল্পিত ডিজাইনের সংকট
গোলটেবিল বৈঠকে ফোরকান বিন কাশেম তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকে বলেন,
তিনি মনে করেন, জোড়াতালি দেওয়া উন্নয়ন প্রকল্প দিয়ে সাময়িকভাবে কিছু অর্জন সম্ভব হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়। একটি শক্তিশালী ডিজিটাল ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে হলে প্রতিটি স্তরে নিখুঁত নকশা ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা থাকা অপরিহার্য।
গবেষণা ও শিল্পের সংযোগহীনতা
একাডেমিয়া বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা এবং শিল্পখাতের বাস্তব চাহিদার মধ্যে যে সমন্বয়হীনতা রয়েছে, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন ফোরকান বিন কাশেম। তিনি আক্ষেপ করে বলেন,‘দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রতিবছর অনেক চমৎকার গবেষণা হচ্ছে, কিন্তু সেই গবেষণার ফলাফলগুলো ল্যাবরেটরি বা লাইব্রেরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে। অন্যদিকে, দেশের শিল্পখাত তাদের প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার বা প্রযুক্তিগত সমাধানের জন্য বিদেশের দিকে তাকিয়ে থাকছে। এই যে গবেষণা ও শিল্পের সংযোগহীনতা, এটি দেশের প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনী সক্ষমতাকে কমিয়ে দিচ্ছে। যদি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণাকে সরাসরি শিল্পখাতের সঙ্গে যুক্ত করা যেত, তবে আমাদের দেশীয় সমাধানগুলো অনেক বেশি সমৃদ্ধ ও আন্তর্জাতিক মানের হতো।’

আমদানিনির্ভরতার মনস্তাত্ত্বিক বাধা
দেশের আইটি খাতের উদ্যোক্তারা স্থানীয়ভাবে অনেক জটিল সমস্যার সমাধান তৈরি করলেও সরকারি ও বেসরকারি বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশি সফটওয়্যারের ওপর বেশি আস্থা রাখে। ফোরকান বিন কাশেম এই আমদানিনির্ভর মানসিকতাকে উন্নয়নের বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় দেশীয় কোনো প্রতিষ্ঠান বিদেশি প্রতিষ্ঠানের চেয়েও উন্নত সমাধান সাশ্রয়ী মূল্যে দিতে সক্ষম, কিন্তু ‘বিদেশি মানেই ভালো’-এই ভুল ধারণা থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে পারছি না। এই প্রবণতা কেবল বৈদেশিক মুদ্রার অপচয়ই করছে না, বরং দেশীয় মেধাবী উদ্ভাবকদের নিরুৎসাহিত করছে।’
স্থানীয় উদ্ভাবনের স্বীকৃতি ও সার্টিফিকেশন
দেশীয় আইটি সমাধানগুলোকে জনপ্রিয় করতে হলে একটি জাতীয় মানের সার্টিফিকেশন বা স্বীকৃতি ব্যবস্থা চালু করার প্রস্তাব দেন ফোরকান বিন কাশেম। তার মতে, সরকারি পর্যায়ে একটি স্বাধীন সংস্থা থাকা উচিত যারা দেশীয় সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যারগুলোর গুণগত মান পরীক্ষা করবে এবং সেগুলোকে সনদ দেবে। এই সার্টিফিকেশন থাকলে সরকারি বা বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো দেশীয় পণ্য ব্যবহার করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে। তিনি বলেন,‘স্থানীয় উদ্ভাবনের স্বীকৃতি না থাকলে কোনো দেশ প্রযুক্তিতে স্বাবলম্বী হতে পারে না।’ উদ্ভাবকদের মেধার মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়াকে সহজ ও আন্তর্জাতিক মানের করার দাবি জানান তিনি।
তাৎক্ষণিক সাফল্যের মোহ বনাম দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য
আমাদের নীতিনির্ধারক ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে ‘তাৎক্ষণিক সাফল্য’ পাওয়ার একটি প্রবণতা রয়েছে, যা প্রযুক্তি খাতের জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করেন ফোরকান বিন কাশেম। তিনি বলেন,‘আইটি খাতে প্রকৃত সাফল্য পেতে হলে ধৈর্য এবং দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ প্রয়োজন। রাতারাতি কোনো বড় পরিবর্তন আশা করা বোকামি। আমরা যদি কেবল শর্টকাট উপায়ে এগোতে চাই, তবে অবকাঠামো তৈরি হবে ঠিকই, কিন্তু প্রকৃত উদ্ভাবন হবে না।’ তিনি বাজেটে গবেষণা ও উন্নয়নের জন্য বিশেষ তহবিল রাখা এবং সেই তহবিল ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানোর ওপর জোর দেন।
সমন্বিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনার দাবি
আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে সামনে রেখে ফোরকান বিন কাশেম একটি সমন্বিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা তৈরির আহ্বান জানান। তিনি বলেন,‘বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বা বিভাগ কাজ না করে আইসিটি খাতের জন্য একটি একক মাস্টারপ্ল্যান থাকা দরকার। সেই প্ল্যানে শিক্ষা, শিল্প, ব্যাংকিং এবং আইনি কাঠামো- সবকিছুর সমন্বয় থাকতে হবে। নীতিনির্ধারণে যারা কাজ করেন, তাদের মাঠ পর্যায়ের উদ্যোক্তাদের বাস্তব সমস্যাগুলো আরও নিবিড়ভাবে শুনতে হবে।’
আগামীর চ্যালেঞ্জ ও আমাদের প্রস্তুতি
বর্তমান বিশ্বে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যে চ্যালেঞ্জগুলো আসছে, তা মোকাবিলায় আমাদের প্রস্তুতি পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করেন তিনি। ফোরকান বিন কাশেম বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে এখন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই নিয়ে বিপ্লব চলছে। এই সময়ে আমরা যদি সুপরিকল্পিত পরিকল্পনা ছাড়া এগোই, তবে আমরা আবার পিছিয়ে পড়ব। এআই বা ব্লকচেইনের মতো আধুনিক প্রযুক্তিতে আমাদের দেশের উপযোগী সমাধান তৈরি করতে হলে এখনই গবেষক ও উদ্যোক্তাদের এক টেবিলে বসতে হবে।’
পরিশেষে ফোরকান বিন কাশেম বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে উদ্ভাবনী ক্ষমতা অভাব নেই। আমাদের তরুণরা বিশ্বের বড় বড় প্রতিষ্ঠানে সুনামের সঙ্গে কাজ করছেন। সমস্যাটি হলো আমাদের জাতীয় পর্যায়ের পরিকল্পনায়। যদি আমরা ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’ বা নিখুঁত নকশার মাধ্যমে আমাদের প্রযুক্তি খাতকে সাজাতে পারি এবং গবেষণা ও শিল্পের মধ্যকার দেয়ালটি ভেঙে দিতে পারি, তবে বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে একটি প্রকৃত প্রযুক্তি শক্তিতে পরিণত হবে।’