চিকিৎসা গবেষণায় নতুন যুগের ইঙ্গিত দিচ্ছে কোয়ান্টাম প্রযুক্তি

Staff Reporter

নিজস্ব প্রতিবেদক

শনিবার, ৭ মার্চ ২০২৬, ১১:৪৬

চিকিৎসা গবেষণায় নতুন যুগের ইঙ্গিত দিচ্ছে কোয়ান্টাম প্রযুক্তি
ছবি : সংগৃহীত

ওষুধ আবিষ্কার, রোগ নির্ণয় এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করছে কোয়ান্টাম প্রযুক্তি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদীয়মান প্রযুক্তি প্রচলিত কম্পিউটারের তুলনায় বহু গুণ দ্রুত জটিল হিসাব করতে পারে। ফলে জীবনবিজ্ঞান গবেষণায় দীর্ঘদিন ধরে চলা বিশ্লেষণ ও পরীক্ষার কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হতে পারে। এতে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন যুগের সূচনা হতে পারে বলেও মনে করছেন গবেষকেরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোয়ান্টাম কম্পিউটিংকে শুধু দ্রুত গণনার প্রযুক্তি হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি তথ্য বিশ্লেষণ ও বৈজ্ঞানিক মডেল তৈরির সম্পূর্ণ নতুন পদ্ধতি তৈরি করতে পারে। প্রযুক্তি বিশ্লেষক মার্টিন ডি সলেসের মতে, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এমনভাবে তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে যা দিয়ে বাস্তব বিশ্বের জটিল প্রক্রিয়াগুলো আরও ভালোভাবে বোঝা সম্ভব।

যুক্তরাজ্যে কোয়ান্টাম প্রযুক্তি উন্নয়নে সরকার উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করছে। এর ফলে দেশটিতে বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং শিল্পখাতের মধ্যে বিভিন্ন সহযোগিতা গড়ে উঠেছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত গবেষণা প্রতিষ্ঠান অক্সফোর্ড আয়োনিকস ইতিমধ্যে ওষুধ আবিষ্কারে কোয়ান্টাম প্রযুক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছে। এসব উদ্যোগ জীবনবিজ্ঞান গবেষণায় নতুন অগ্রগতির সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কোয়ান্টাম প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা রয়েছে ওষুধ আবিষ্কারের ক্ষেত্রে। বর্তমানে কোনো নতুন ওষুধ তৈরি করতে সাধারণত ১০ থেকে ১৫ বছর সময় লাগে এবং এতে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। কোয়ান্টাম কম্পিউটারের সাহায্যে গবেষকেরা অণু ও প্রোটিনের পারস্পরিক ক্রিয়া অনেক বেশি নির্ভুলভাবে বিশ্লেষণ করতে পারবেন। এতে নতুন ওষুধের সম্ভাবনা আগেই যাচাই করা সম্ভব হবে এবং দীর্ঘ ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার সময়ও কমে যেতে পারে।

প্রযুক্তি গবেষক হাভিয়ের কাম্পোস বলেন, প্রচলিত কম্পিউটার অণুর আচরণ বিশ্লেষণে বড় সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ে। কারণ প্রতিটি নতুন কণার সঙ্গে হিসাবের জটিলতা দ্রুত বেড়ে যায়। কোয়ান্টাম কম্পিউটার সুপারপজিশন ও এন্ট্যাঙ্গলমেন্টের মতো বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করে এই সমস্যার সমাধান করতে পারে। এর ফলে প্রোটিন, এনজাইম এবং অণুর ভেতরের জটিল প্রক্রিয়া অনেক বেশি নির্ভুলভাবে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে।

গবেষকদের মতে, কোয়ান্টাম অণু সিমুলেশন রোগ কীভাবে কাজ করে এবং কীভাবে তা চিকিৎসা করা যায় তা বোঝাতেও সহায়তা করবে। এতে নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কার দ্রুততর হতে পারে এবং পরীক্ষানির্ভর পদ্ধতির ওপর নির্ভরতা কমে আসবে।

রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রেও কোয়ান্টাম প্রযুক্তি বড় পরিবর্তন আনতে পারে। প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ড্যানিয়েল জ্যাকবসের মতে, কোয়ান্টাম সেন্সর হৃদ্‌রোগ শনাক্তে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বর্তমানে ব্যবহৃত ইলেকট্রোকার্ডিওগ্রাম পরীক্ষায় অনেক সময় হৃদ্‌যন্ত্রের প্রাথমিক সমস্যার লক্ষণ ধরা পড়ে না। কোয়ান্টাম ম্যাগনেটোকার্ডিওগ্রাফি প্রযুক্তি হৃদ্‌যন্ত্রের ক্ষুদ্র চৌম্বক সংকেত পরিমাপ করে প্রায় ৮০ শতাংশ নির্ভুলতায় সমস্যা শনাক্ত করতে পারে।

প্রযুক্তি বিশ্লেষক টম অ্যালেন বলেন, কোয়ান্টাম সেন্সর শরীরের অত্যন্ত ক্ষীণ সংকেতও শনাক্ত করতে পারে। এতে চিকিৎসা যন্ত্র আরও নির্ভুল হবে এবং দ্রুত ও কম ঝামেলায় পরীক্ষা করা সম্ভব হবে। ভবিষ্যতে এ প্রযুক্তি ছোট আকারের চিকিৎসা যন্ত্র বা পরিধানযোগ্য ডিভাইসেও ব্যবহার হতে পারে। এমনকি হাতঘড়ি বা আঙুলে পরার ডিভাইসের মাধ্যমে হৃদ্‌যন্ত্র, মস্তিষ্ক বা বিপাকক্রিয়ার সূক্ষ্ম পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হতে পারে।

ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থাতেও কোয়ান্টাম প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, কোয়ান্টাম কম্পিউটার বিপুল জিনগত তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণ করতে পারবে। এর ফলে রোগ আগে থেকেই শনাক্ত করা এবং রোগীর জন্য নির্দিষ্ট চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করা সহজ হবে।

যুক্তরাজ্যে জাতীয় কোয়ান্টাম কম্পিউটিং কেন্দ্র ইতিমধ্যে শিল্পখাত, সরকার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে এসব প্রযুক্তির ব্যবহারিক প্রয়োগ নিয়ে কাজ করছে। গবেষকেরা আশা করছেন, কোয়ান্টাম প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে ভবিষ্যতে দ্রুত ওষুধ আবিষ্কার, উন্নত রোগ নির্ণয় এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিকিৎসা পদ্ধতি বাস্তবায়ন সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষের জীবন রক্ষা করা যেতে পারে।

সূত্র : টেকক্রাঞ্চ

টেকওয়ার্ল্ডের আপডেটেড খবর পেতে WhatsApp চ্যানেল ফলো করুন