আইফোন ১৮ প্রো ও ১৭ প্রোতে পার্থক্য কতটা
নতুন আইফোন ১৮ প্রোতে আগের প্রজন্মের আইফোন ১৭ প্রোর তুলনায় ব্যাটারি, চার্জিং গতি ও প্রসেসরে উন্নতি এনেছে অ্যাপল। তবে ক্যামেরার ছবির মান ও ভিডিও ধারণের ক্ষেত্রে পার্থক্য খুব বেশি নয়। প্রযুক্তিবিষয়ক ওয়েবসাইট জিএসএমএরিনার তুলনামূলক পরীক্ষায় দেখা গেছে, নতুন মডেলে পরিবর্তন থাকলেও দৈনন্দিন ব্যবহারে সেগুলোর সব সুবিধা স্পষ্টভাবে বোঝা নাও যেতে পারে।
জিএসএম এরিনার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইফোন ১৮ প্রোতে নতুন এ২০ প্রো চিপ ব্যবহার করা হয়েছে, যা আগের মডেলের এ১৯ প্রো চিপের তুলনায় বেশি শক্তিশালী। পাশাপাশি মূল ক্যামেরায় পরিবর্তনশীল অ্যাপারচার, কিছুটা উন্নত ব্যাটারি স্থায়িত্ব এবং দ্রুত চার্জিংয়ের সুবিধা রয়েছে। তবে নকশা, ডিসপ্লে ও অধিকাংশ ক্যামেরার হার্ডওয়্যারে বড় ধরনের পরিবর্তন আসেনি।
প্রসেসরে উল্লেখযোগ্য উন্নতি
আইফোন ১৮ প্রোতে রয়েছে ২ ন্যানোমিটার প্রযুক্তিতে তৈরি অ্যাপল এ২০ প্রো চিপ। অন্যদিকে আইফোন ১৭ প্রোতে ব্যবহার করা হয়েছে ৩ ন্যানোমিটার প্রযুক্তির এ১৯ প্রো চিপ। জিএসএমএরিনার বেঞ্চমার্ক পরীক্ষায় নতুন চিপের সিপিইউনির্ভর কাজে প্রায় ২৭ শতাংশ এবং গ্রাফিকস পরীক্ষায় প্রায় ১৩ শতাংশ উন্নতি দেখা গেছে।
দুটি ফোনেই প্রাথমিক সংস্করণে ১২ গিগাবাইট র্যাম ও ২৫৬ গিগাবাইট স্টোরেজ রয়েছে। তবে আইফোন ১৮ প্রোতে সর্বোচ্চ ২ টেরাবাইট স্টোরেজ পাওয়া যায়, যেখানে আইফোন ১৭ প্রোতে সর্বোচ্চ স্টোরেজ ১ টেরাবাইট।
তবে জিএসএমএরিনা সতর্ক করেছে, আইফোন ১৮ প্রোর ১ ও ২ টেরাবাইট সংস্করণে ব্যবহৃত কিউএলসি স্টোরেজ ৬০ শতাংশের বেশি পূর্ণ হলে লেখার গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।
ব্যাটারি ও চার্জিংয়ে সামান্য পার্থক্য
জিএসএমএরিনার পরীক্ষায় সিম কার্ড ব্যবহারের জন্য আলাদা স্লট থাকা সংস্করণে আইফোন ১৮ প্রোর ব্যাটারির ধারণক্ষমতা ৪ হাজার ৫৬ মিলিঅ্যাম্পিয়ার-ঘণ্টা পাওয়া গেছে। আইফোন ১৭ প্রোতে এই ধারণক্ষমতা ৩ হাজার ৯৯৮ মিলিঅ্যাম্পিয়ার-ঘণ্টা। অর্থাৎ ব্যাটারির ধারণক্ষমতা বেড়েছে সামান্য।
তবে পরীক্ষায় ব্যাটারি ব্যবহারের সময় কিছুটা বেড়েছে। আইফোন ১৮ প্রো ১৬ ঘণ্টা ৪৩ মিনিটের অ্যাকটিভ ইউজ স্কোর পেয়েছে, যেখানে আইফোন ১৭ প্রোর স্কোর ১৫ ঘণ্টা ২২ মিনিট। এ পরীক্ষায় ওয়েব ব্রাউজিং, ভিডিও দেখা ও অন্যান্য ব্যবহারের বিভিন্ন পরিস্থিতি বিবেচনা করা হয়েছে।
চার্জিংয়েও এগিয়ে রয়েছে নতুন মডেল। আইফোন ১৮ প্রোতে ৪৫ ওয়াট চার্জিং সুবিধা রয়েছে, যেখানে আগের মডেলে তা ৩৫ ওয়াট। পরীক্ষায় ১৫ মিনিটে নতুন ফোনের ব্যাটারি ৪২ শতাংশ এবং ৩০ মিনিটে ৭৪ শতাংশ চার্জ হয়েছে। পুরোপুরি চার্জ হতে সময় লেগেছে ৬২ মিনিট। আইফোন ১৭ প্রোতে একই সময়ে যথাক্রমে ৪০ ও ৭০ শতাংশ চার্জ হয়েছে এবং পুরোপুরি চার্জ হতে লেগেছে ৭৮ মিনিট।
মূল ক্যামেরায় পরিবর্তনশীল অ্যাপারচার
আইফোন ১৮ প্রোর মূল ক্যামেরায় পরিবর্তনশীল অ্যাপারচার যুক্ত করেছে অ্যাপল। এতে এফ/১.৪৮ থেকে এফ/৪.০ পর্যন্ত অ্যাপারচার সমন্বয় করা যায়। এ ছাড়া এফ/১.৮ ও এফ/২.৮-এর মতো মধ্যবর্তী সেটিংসও রয়েছে। আইফোন ১৭ প্রোর মূল ক্যামেরায় অ্যাপারচার এফ/১.৭৮-এ স্থির।
দুটি ফোনের মূল ক্যামেরাতেই ৪৮ মেগাপিক্সেলের সেন্সর রয়েছে। নতুন মডেলে সেন্সরের মডেল বদলালেও সেন্সরের আকার ও রেজল্যুশন আগের মতোই রয়েছে। টেলিফটো ক্যামেরায় ৪ গুণ অপটিক্যাল জুম এবং আলট্রাওয়াইড ক্যামেরার ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য হার্ডওয়্যার পরিবর্তন নেই। সেলফি ক্যামেরাও আগের মডেলের মতো ১৮ মেগাপিক্সেলের।
নতুন মডেলের মূল ক্যামেরায় শাটার স্পিড, হোয়াইট ব্যালান্স ও অ্যাপারচার আলাদাভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। তবে ম্যানুয়ালি আইএসও সেট করার সুবিধা নেই। ভিডিও ধারণের সময়ও এসব নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করা যায়, যা আইফোন ১৭ প্রোতে নেই।
ছবির মানে পার্থক্য খুব বেশি নয়
দিনের আলোয় তোলা ছবির তুলনায় আইফোন ১৮ প্রোতে রঙ কিছুটা উষ্ণ দেখানোর প্রবণতা রয়েছে। নতুন মডেলে ছবির সূক্ষ্ম বিবরণও কিছু ক্ষেত্রে ভালোভাবে ফুটে উঠেছে। তবে দুই ফোনের ছবির সামগ্রিক পার্থক্য খুব বেশি নয়।
কম আলোয় তোলা ছবিতে নতুন মডেলের উন্নতি আরও সীমিত। মূল ক্যামেরায় বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যায়নি। আবার দুই গুণ জুমে কিছু পরীক্ষায় আইফোন ১৭ প্রোর ছবি সামান্য বেশি স্পষ্ট ছিল। চার ও আট গুণ জুমের ছবিতেও দুই ফোনের মধ্যে বড় কোনো ব্যবধান পাওয়া যায়নি।
সেলফির ক্ষেত্রেও দুই ফোনের ছবির মান প্রায় একই। ভিডিও ধারণের ক্ষেত্রে উভয় ফোনের পেছনের তিনটি ক্যামেরা ও সামনের ক্যামেরা দিয়ে প্রতি সেকেন্ডে ২৪, ৩০ ও ৬০ ফ্রেমে ৪কে ভিডিও ধারণ করা যায়। মূল ক্যামেরায় এক ও দুই গুণ জুমে প্রতি সেকেন্ডে ১২০ ফ্রেমেও ৪কে ভিডিও ধারণের সুবিধা রয়েছে।
তবে আইফোন ১৮ প্রোর সিনেমাটিক মোডে সর্বোচ্চ ৬০ ফ্রেমে ৪কে ভিডিও ধারণ করা যায়, যেখানে আইফোন ১৭ প্রোতে সীমা ৩০ ফ্রেম। বাস্তব পরীক্ষায় ভিডিওর মানে দুই ফোনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া যায়নি।
ডিজাইন ও ডিসপ্লে প্রায় একই
দুটি ফোনের পর্দার আকার ৬.৩ ইঞ্চি। উভয় মডেলেই ১২০ হার্টজ রিফ্রেশ রেটের এলটিপিও ওএলইডি ডিসপ্লে রয়েছে। ফোন দুটির দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও পুরুত্বও প্রায় একই। তবে আইফোন ১৮ প্রোর ওজন ২১১ গ্রাম, যেখানে আইফোন ১৭ প্রোর ওজন ২০৬ গ্রাম।
নতুন মডেলে ডায়নামিক আইল্যান্ডের আকার ছোট করা হয়েছে। ফলে পর্দার বেশি জায়গা ব্যবহার করা যায় এবং সেখানে একসঙ্গে তিনটি চলমান কার্যক্রম দেখানোর সুবিধা রয়েছে। রঙের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন এসেছে। আইফোন ১৮ প্রো কালো, সিলভার, গ্লেসিয়ার ও বারগান্ডি রঙে পাওয়া যায়। অন্যদিকে আইফোন ১৭ প্রোর রং সিলভার, কসমিক অরেঞ্জ ও ডিপ ব্লু।
দামের পার্থক্যও বিবেচনায় নিতে হবে
জিএসএম এরিনার তুলনা অনুযায়ী, ইউরোপের কিছু বাজারে আইফোন ১৮ প্রোর প্রারম্ভিক দাম আগের মডেলের তুলনায় ১৫০ ইউরো বেশি। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দুই মডেলের দামের ব্যবধান কিছু বাজারে প্রায় ৩০০ ইউরো হতে পারে। ফলে সামান্য উন্নতির জন্য বেশি অর্থ খরচ করা কতটা যুক্তিযুক্ত, তা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
নতুন ফোনে কিছুটা উন্নত ব্যাটারি স্থায়িত্ব, দ্রুত চার্জিং, বেশি শব্দের স্পিকার এবং শক্তিশালী প্রসেসর রয়েছে। তবে ক্যামেরা ও দৈনন্দিন ব্যবহারের অভিজ্ঞতায় দুই ফোনের পার্থক্য সীমিত। পুরোনো মডেলটি কম দামে পাওয়া গেলে সেটিও বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। তবে অ্যাপল আইফোন ১৭ প্রোর উৎপাদন বন্ধ করায় নতুন ও অব্যবহৃত ফোন খুঁজে পাওয়া কিছু বাজারে কঠিন হয়ে উঠছে।