এপিকটা ২০২৫: বৈশ্বিক মঞ্চে বাংলাদেশের প্রযুক্তি পদচারণা
এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি খাতের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আসর এশিয়া প্যাসিফিক আইসিটি অ্যালায়েন্স অ্যাওয়ার্ডস (এপিক্টা) ২০২৫-এ এবারও দৃশ্যমান উপস্থিতি ছিল বাংলাদেশের। বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে বাংলাদেশের প্রকল্পগুলোর অর্জন, স্বীকৃতি ও অংশগ্রহণ দেশের আইসিটি খাতের ধারাবাহিক অগ্রযাত্রাকেই তুলে ধরেছে। বিশেষ করে
ইক্সোরা সলিউশনস লিমিটেডের ‘ন্যায্যমূল্য (Nyajjomullo)’ এবং রাজউক উত্তরা মডেল কলেজের শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী প্রকল্প ‘সেফস্টেপ (SAFESTEP)’ নিজ নিজ বিভাগে দ্বিতীয় রানার-আপ হওয়ায় আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের উদ্ভাবনী সক্ষমতার প্রমাণ আরও সুদৃঢ় হয়েছে, সাথে মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি-এর শিক্ষার্থীদের প্রকল্প ‘রাডসেফ (Radsafe)’ মেরিট এওয়ার্ড অর্জন করেছে।
এপিক্টা ২০২৫-এ বাংলাদেশি অংশগ্রহণকারীদের সাফল্যের তালিকায় যুক্ত হয়েছে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন।
মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি-এর শিক্ষার্থী ও অটোমেটেড এমটিবিএম -এর প্রতিষ্ঠাতা ফাতিমা আশরাফ তাইওয়ানের ন্যাশনাল ইয়াং মিং চিয়াও তুং ইউনিভার্সিটি আয়োজিত মেগা ডে স্টার্টআপ পিচে অংশ নিয়ে অর্জন করেছেন সিলভার প্রাইজ এবং ৫ হাজার মার্কিন ডলার।
বৈশ্বিক এআই ও স্টার্টআপ প্রতিযোগিতায় একজন বাংলাদেশি তরুণ উদ্যোক্তার এমন সাফল্য নিঃসন্দেহে দেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের জন্য অনুপ্রেরণার বার্তা বহন করে।
শিক্ষার্থী পর্যায়ের প্রতিযোগিতায়ও ছিল বাংলাদেশের শক্ত উপস্থিতি। এপিক্টা ২০২৫-এর কোড জাজ'র ওয়ার্কশপ প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন মোহাম্মদ মেহরান ইসলাম মাহিম, যিনি পড়াশোনা করছেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে। একই প্রতিযোগিতায় প্রথম রানার-আপ মুনেম শাহরিয়ার ইসলাম সামন্ত, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়-এর স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষার্থী। এই সাফল্যগুলো আবারও প্রমাণ করে, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে উঠে আসা তরুণদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও সৃজনশীলতা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে প্রতিযোগিতামূলক।
এপিক্টা ২০২৫ আয়োজন করে এশিয়া প্যাসিফিক আইসিটি অ্যালায়েন্সের সঙ্গে যৌথভাবে তাইওয়ানের অর্থনীতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় (MOEA) এবং তাইপে কম্পিউটার এসোসিয়েশন (TCA)। এবছর প্রতিযোগিতায় ১২টি সদস্য অর্থনীতি থেকে ২৫৬টি প্রকল্প প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এবং যোগাযোগ, শিল্পখাতের প্রয়োগ, স্টার্টআপ, টেকসই ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিসহ মোট ১৭টি ক্যাটাগরিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। বাংলাদেশ থেকে মোট ২০টি প্রকল্প এই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে, যেগুলো নির্বাচিত হয়েছে বাংলাদেশ আইসিটি এন্ড ইনোভেশন নেটওয়ার্ক (বিন) আয়োজিত বাংলাদেশ আইসিটি এন্ড ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ডস ২০২৫-এর মাধ্যমে। অর্থাৎ দেশীয় পর্যায়ে কঠোর বাছাই ও প্রতিযোগিতার পরই এসব প্রকল্প আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রতিনিধিত্বের সুযোগ পায়।
এপিক্টা ২০২৫-এর পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে তাইওয়ানের ভাইস প্রেসিডেন্ট শাও বি-খিম বলেন, এই অ্যাওয়ার্ডগুলো তাইওয়ানের জন্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ দেশটি বর্তমানে আসিয়ান সদস্য রাষ্ট্র ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে কাজ করছে—যারা এপিক্টা সদস্যদের বড় অংশ। তিনি অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাইওয়ানকে তাদের উদ্ভাবন, গবেষণা ও স্টার্টআপের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, এপিক্টা একটি এমন প্ল্যাটফর্ম, যা নতুন ধারণার জন্ম দেয়, অংশীদারিত্ব গড়ে তোলে এবং ভবিষ্যৎকে এগিয়ে নেওয়ার সাহসী উদ্যোগে অনুপ্রেরণা জোগায়।
প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের সঙ্গে সুর মিলিয়ে তাইওয়ানের অর্থনীতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী শেন জং-চিন বলেন, এবারের ক্যাটাগরিগুলো আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রবণতাকে প্রতিফলিত করে, যেখানে স্মার্ট অ্যাপ্লিকেশন ও সফটওয়্যার-হার্ডওয়্যার সমন্বয় বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, এপিক্টা-এর ১৪টি সদস্য অর্থনীতি দ্রুত বর্ধনশীল স্মার্ট প্রযুক্তির বাজার, আর এই প্রতিযোগিতা স্থানীয় ও আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে এসব বাজারে প্রবেশের সুযোগ করে দেয়। তাইওয়ান দলগুলোর শক্তিশালী পারফরম্যান্স দেশটির আধুনিক আইসিটি পণ্য ও সমাধান সরবরাহকারীর অবস্থানকেও তুলে ধরে।
বাংলাদেশের অংশগ্রহণের প্রসঙ্গে প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বদানকারী সৈয়দ আলমাস কবীর আশাবাদী কণ্ঠে বলেন,
উল্লেখ্য, সৈয়দ আলমাস কবীর ২০১৭ সাল থেকে এপিক্টার বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং বর্তমানে তিনি সংগঠনটির এক্সিকিউটিভ কমিটির (EXCO) সদস্য।
২০০১ সালে প্রথম শুরু হওয়া এপিক্টা প্রতিযোগিতাকে আইসিটি খাতের ‘অস্কার’ বলেও বিবেচনা করা হয়। উদ্যোক্তা, ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, উদ্ভাবন ও উৎকর্ষতার স্বীকৃতি দিতেই এই আয়োজন। সেই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ মানে শুধু পদক অর্জন নয়, বরং দেশের প্রযুক্তি ইকোসিস্টেমের সক্ষমতা, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা তুলে ধরা।
বাংলাদেশ আইসিটি এন্ড ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ডস ২০২৫-এর মাধ্যমে দেশীয় পর্যায়ে যেসব প্রকল্প নির্বাচিত হয়েছে, সেগুলোর অনেকই সামাজিক সমস্যা সমাধান, ন্যায়সঙ্গত বাজারব্যবস্থা, নিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর কাজ করছে। উদ্যোগগুলো প্রমাণ করে, প্রযুক্তি শুধু বাণিজ্যিক লাভের হাতিয়ার নয়, বরং সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের শক্তিশালী মাধ্যমও হতে পারে।
এপিক্টা ২০২৫-এ ইকোনমিক কো-অর্ডিনেটর হিসেবে আমার অভিজ্ঞতা থেকে যে বিষয়টি সবচেয়ে স্পষ্ট হয়েছে, তা হলো বাংলাদেশ এখন আর শুধু উপস্থিতি জানান দেওয়া একটি দেশ নয়; বরং আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি অঙ্গনে একটি দৃঢ় ও সম্ভাবনাময় প্রতিযোগী শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। আমাদের উদ্ভাবন, স্টার্টআপ উদ্যোগ এবং তরুণ শিক্ষার্থীদের সক্ষমতা এখন বৈশ্বিক বিচারকদের নজরে পড়ছে। সামনে আরও শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড়াতে হলে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি নীতি সহায়তা, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়মিত এক্সপোজার এবং শিল্প ও একাডেমিয়ার মধ্যে কার্যকর সহযোগিতা। এবারের অর্জন ও স্বীকৃতিগুলো আগামী দিনের বড় সাফল্যের জন্য একটি মজবুত ভিত্তি তৈরি করেছে—এবং সেই সম্ভাবনাই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।