ঢাকায় আট অঞ্চলে চলবে আট রঙের ই-রিকশা, কাল থেকে নিবন্ধন শুরু

TechWorld Desk

টেকওয়ার্ল্ড ডেস্ক

রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬, ১৭:১২

ঢাকায় আট অঞ্চলে চলবে আট রঙের ই-রিকশা, কাল থেকে নিবন্ধন শুরু
ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত ই-রিকশা চলাচল নিয়ন্ত্রণে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকাকে আটটি অঞ্চলে ভাগ করা হচ্ছে। প্রতিটি অঞ্চলের রিকশার জন্য নির্ধারণ করা হবে আলাদা রং। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে না। পরিবর্তে তাদের পরিচয়পত্র দেওয়া হবে। পরে পর্যায়ক্রমে লাইসেন্সের আওতায় আনা হবে চালকদের।

আজ রোববার (১ নভেম্বর) সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে নতুন ই-রিকশা বিধিমালার বিভিন্ন দিক তুলে ধরে এসব তথ্য জানান স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।

আগামীকাল সোমবার থেকে দেশের ১৩টি সিটি করপোরেশনে ই-রিকশার নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু করা যাবে। বর্তমানে যারা ই-রিকশা চালাচ্ছেন, তাদের আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। বিধিমালা কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সব ই-রিকশা সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে না। নিবন্ধন কার্যক্রমের পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে অবৈধ রিকশা অপসারণ করা হবে।

আট অঞ্চলে আলাদা রং ও চলাচলের সীমা

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় চারটি করে মোট আটটি অঞ্চল নির্ধারণ করা হবে। প্রতিটি অঞ্চলের ই-রিকশার রং হবে ভিন্ন। একটি অঞ্চলে নিবন্ধিত রিকশা অন্য অঞ্চলে চলাচল করতে পারবে না। কোন এলাকায় কতটি রিকশা চলবে, তা সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক বিভাগ আলোচনা করে ঠিক করবে।

এক সিটি করপোরেশনে নিবন্ধিত ই-রিকশা অন্য সিটি করপোরেশন এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে চালানোর সুযোগ থাকবে না। তবে আপাতত নিবন্ধনের সংখ্যার ওপর কোনো সীমা নির্ধারণ করা হয়নি।

নিবন্ধন ফি সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা

নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি নিজের জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে সর্বোচ্চ পাঁচটি ই-রিকশা নিবন্ধন করতে পারবেন। এক বা একাধিক সিটি করপোরেশন মিলিয়েও এই সংখ্যা পাঁচটির বেশি হতে পারবে না।

দুই যাত্রী বহনের উপযোগী ই-রিকশার নিবন্ধন ফি আট হাজার টাকা এবং বার্ষিক নবায়ন ফি চার হাজার টাকা। চার যাত্রী বহন করতে পারে এমন ই-রিকশার নিবন্ধন ফি ১০ হাজার টাকা এবং বার্ষিক নবায়ন ফি পাঁচ হাজার টাকা। এ ছাড়া প্রতিটি নম্বরপ্লেটের জন্য দিতে হবে এক হাজার টাকা। নিবন্ধন ফি একবার দিতে হলেও প্রতিবছর ফিটনেস সনদ নিয়ে নিবন্ধন নবায়ন করতে হবে।

এসব ফি চালকের পরিবর্তে রিকশার মালিককে পরিশোধ করতে হবে। নিবন্ধিত প্রতিটি ই-রিকশার জন্য দেওয়া হবে কিউআর কোডযুক্ত স্বতন্ত্র নম্বরপ্লেট। রিকশার দৃশ্যমান স্থানে এটি লাগাতে হবে। কিউআর কোড স্ক্যান করলে নিবন্ধন নম্বর, মালিক ও চালকের পরিচয়, নিবন্ধনকারী সিটি করপোরেশন এবং চলাচলের অঞ্চলের তথ্য পাওয়া যাবে।

নিবন্ধনের তারিখ থেকে একটি ই-রিকশার ব্যবহারযোগ্য মেয়াদ হবে ১২ বছর। মেয়াদ শেষ হলে নম্বরপ্লেটসহ নিবন্ধন বাতিল হয়ে যাবে।

চালকদের লাইসেন্স পরে

বিধিমালায় ই-রিকশাচালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্সের বিধান থাকলেও শুরুতেই তা কার্যকর করা হচ্ছে না। মীর শাহে আলমের ভাষ্য, একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক চালককে লাইসেন্স দেওয়ার মতো সক্ষমতা সিটি করপোরেশনগুলোর নেই।

তিনি জানান, প্রথমে নিবন্ধন কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে। পরে এ বিষয়ে পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করে চালকদের লাইসেন্সের আওতায় আনা হবে। আপাতত রিকশার মালিকেরা চালকদের পরিচয়পত্র দেবেন।

বুয়েটের নকশা অনুসরণ বাধ্যতামূলক

বর্তমানে চলাচলকারী ই-রিকশাগুলো নিবন্ধন পেতে হলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী কাঠামোগত পরিবর্তন করতে হবে। পাশাপাশি নির্ধারিত প্রযুক্তিগত মানদণ্ড ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করে অনুমোদন নিতে হবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের প্রতিস্বাক্ষরসহ ফিটনেস সনদ প্রয়োজন হবে।

বিপুলসংখ্যক রিকশার কাঠামো পরিবর্তনের সক্ষমতা বুয়েটের আছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বুয়েট নিজে রিকশার কাঠামো পরিবর্তন করবে না। প্রতিষ্ঠানটি প্রয়োজনীয় নকশা দিয়েছে। উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সিটি করপোরেশনের অনুমতি নিয়ে সেই নকশা অনুসারে রিকশাগুলো পরিবর্তন করবে।

নতুন ই-রিকশার ক্ষেত্রেও একই প্রযুক্তিগত মানদণ্ড, নিরাপত্তাব্যবস্থা ও ফিটনেস সনদের শর্ত মানতে হবে। নিবন্ধন বা নবায়ন ছাড়া কোনো ই-রিকশা সড়কে চলতে পারবে না।

সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ২৫ কিলোমিটার

নতুন বিধিমালায় ই-রিকশার সর্বোচ্চ গতিসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ঘণ্টায় ২৫ কিলোমিটার। তবে স্কুল, হাসপাতাল, ধর্মীয় উপাসনালয় ও জনবহুল এলাকায় এই সীমা হবে ঘণ্টায় ১৫ কিলোমিটার। প্রতিটি রিকশায় গতিমাপক বা দূরত্বমাপক যন্ত্র রাখতে হবে। রিকশার আকার অনুযায়ী চালক ছাড়া সর্বোচ্চ দুই অথবা চারজন যাত্রী বহন করা যাবে।

জাতীয় মহাসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, বাস চলাচলের প্রধান সড়ক ও ফুটপাতে ই-রিকশা চলাচল নিষিদ্ধ থাকবে। প্রশাসন অন্য কোনো সড়ক নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেও সেখানে এসব যান চলতে পারবে না। পার্কিংয়ের স্থান নির্ধারণ করবে সিটি করপোরেশন, ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করে।

নিবন্ধন ছাড়া রিকশা চালানো, নির্ধারিত সীমার বেশি গতি বা যাত্রী বহন, অননুমোদিত ব্যাটারি ব্যবহার এবং অনুমতি ছাড়া মোটর বা কাঠামো পরিবর্তন করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নিষিদ্ধ এলাকায় চলাচল, ট্রাফিক সংকেত অমান্য, যাত্রীর পরিবর্তে মালামাল পরিবহন এবং দুর্ঘটনার পর পালিয়ে যাওয়াও অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।

কিলোমিটার অনুযায়ী নির্ধারিত হবে ভাড়া

ই-রিকশার ভাড়া নির্ধারণের কাজ নিবন্ধন কার্যক্রমের পর শুরু হবে। মালিকপক্ষ, ট্রাফিক বিভাগ ও সিটি করপোরেশনের প্রতিনিধিরা আলোচনার মাধ্যমে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ঠিক করবেন। পরিচালন ব্যয় বিবেচনায় রেখে সাধারণ মানুষের সামর্থ্যের মধ্যে ভাড়া নির্ধারণের কথা জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।

তবে ভাড়া নির্ধারণের আলোচনায় চালকদের সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ থাকবে না। এ প্রক্রিয়ায় মালিকপক্ষ প্রতিনিধিত্ব করবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

চার্জিং স্টেশনেও লাগবে অনুমোদন

ই-রিকশার ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার কেন্দ্রগুলোও নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা হচ্ছে। সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের সুবিধা থাকা চার্জিং স্টেশনকে সিটি করপোরেশনের অনুমোদন বা ট্রেড লাইসেন্স নিতে হবে।

চার্জিং স্টেশনে সৌরবিদ্যুৎ ও জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ ব্যবহারের সমন্বিত ব্যবস্থা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে দিনের বেলায় উৎপাদিত সৌরবিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ করা যাবে এবং রাতে গ্রিডের বিদ্যুৎ দিয়ে ব্যাটারি চার্জ করা যাবে। অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করে চার্জ দেওয়া হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সিটি করপোরেশনের ম্যাজিস্ট্রেটরা বিষয়টি তদারক করবেন।

ব্যাটারি ব্যবস্থাপনাতেও নতুন বিধিনিষেধ থাকছে। পুরোনো বা অকার্যকর ব্যাটারি খোলা জায়গা, মাটি, জলাশয় কিংবা সাধারণ বর্জ্যের সঙ্গে ফেলা বা পোড়ানো যাবে না। নতুন ব্যাটারি বিক্রির সময় বিক্রেতাকে পুরোনো ব্যাটারি সংগ্রহ করে পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় পাঠাতে হবে। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়া ব্যাটারি ভাঙা বা গলানো নিষিদ্ধ থাকবে।

এক মাস পর অগ্রগতি জানাবে সরকার

রাজধানীতে বর্তমানে কতটি ই-রিকশা চলাচল করছে কিংবা পুরোনো রিকশাগুলোর কাঠামো পরিবর্তনের কাজ কত দিনে শেষ হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা বা সময়সীমা জানাননি প্রতিমন্ত্রী।

তিনি জানিয়েছেন, এক মাস পর আবার সংবাদ সম্মেলন করে নিবন্ধনের অগ্রগতি, সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ এবং অবৈধ ই-রিকশা অপসারণের পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হবে।

প্রাথমিকভাবে দেশের ১৩টি সিটি করপোরেশনে নতুন বিধিমালা কার্যকর হবে। পৌরসভা এলাকায় একই ব্যবস্থা চালু করতে সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধন করতে হবে। এরপর অন্যান্য শহরের জন্যও প্রয়োজনীয় বিধিমালা প্রণয়ন করা হবে।

বর্তমানে ই-রিকশা চালকদের উদ্দেশে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আপাতত তারা যেভাবে রিকশা চালাচ্ছেন, সেভাবেই চালাতে পারবেন। নিয়ম মেনে পর্যায়ক্রমে নিবন্ধন দেওয়া হবে এবং অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশা সরিয়ে নেওয়া হবে।

টেকওয়ার্ল্ডের আপডেটেড খবর পেতে WhatsApp চ্যানেল ফলো করুন