সমুদ্রের তলদেশে নতুন প্রযুক্তির প্রতিযোগিতা
সমুদ্রের তলদেশে থাকা যোগাযোগ কেবল, জ্বালানি পাইপলাইন ও বিদ্যুৎ সংযোগ ক্রমেই নিরাপত্তাঝুঁকিতে পড়ায় এগুলো রক্ষায় নতুন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ শুরু করেছে বিভিন্ন দেশ ও প্রতিষ্ঠান। এআই, স্বয়ংক্রিয় ড্রোন ও পানির নিচের সেন্সর ব্যবহার করে এসব অবকাঠামো নজরদারির পাশাপাশি সম্ভাব্য নাশকতা শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউক্রেন যুদ্ধের পর পানির নিচের অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের জ্যেষ্ঠ গবেষক কাটজা বেগোর মতে, বদলে যাওয়া নিরাপত্তা পরিস্থিতিই সমুদ্রের তলদেশকে নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
নতুন সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র
২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে বাল্টিক সাগরের তলদেশে থাকা গ্যাস পাইপলাইনে বিস্ফোরণে বড় ধরনের ক্ষতি হয়। তদন্তকারীরা ঘটনাটিকে পরিকল্পিত নাশকতা হিসেবে চিহ্নিত করেন। এর পর আর্কটিক ও তাইওয়ানের কাছাকাছি পানির নিচের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনাও নজর কেড়েছে।
টেলিজিওগ্রাফির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরুতে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৫ লাখ কিলোমিটার সাবমেরিন যোগাযোগ কেবল চালু ছিল। এর পাশাপাশি তেল ও গ্যাসের পাইপলাইন এবং সমুদ্রের মধ্যে বা উপকূলের বাইরে বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ পরিবহনের জন্য সাবমেরিন বিদ্যুৎ কেবলের নেটওয়ার্কও বাড়ছে।

ইতালির জাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ফিনকান্তিয়েরি জুলাইয়ে প্রায় ৬০ কোটি ইউরো ব্যয়ে চারটি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণমূলক অংশীদারত্ব কেনার পরিকল্পনা জানায়। এর মাধ্যমে পানির নিচের ড্রোন, সামুদ্রিক জরিপ ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে সক্ষমতা বাড়াতে চায় প্রতিষ্ঠানটি। ফরাসি প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান থ্যালেসও সোনার, সাবমেরিনবিরোধী যুদ্ধ, মাইন শনাক্তকরণ ও স্বয়ংক্রিয় পানির নিচের যান নিয়ে কাজ করছে।
পানির নিচে ড্রোন
জার্মানির প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ইউরোঅ্যাটলাস ‘গ্রেশার্ক’ নামের স্বয়ংক্রিয় পানির নিচের যান তৈরি করেছে। এটি নির্দিষ্ট এলাকায় গিয়ে মানুষের সার্বক্ষণিক নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই নজরদারি চালাতে পারে। পাইপলাইন পরিদর্শনের সময় সন্দেহজনক বস্তু শনাক্ত করলে সেটি অপারেটরকে জানিয়ে পরবর্তী নির্দেশের অপেক্ষা করতে পারে।
প্রতিষ্ঠানটির মতে, ভবিষ্যতে যুদ্ধজাহাজ দিয়ে প্রতিটি কিলোমিটার কেবল পাহারা দেওয়ার বদলে স্বয়ংক্রিয় যানবহর গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রাঞ্চলে নিয়মিত টহল দিতে পারে। কোনো অস্বাভাবিকতা শনাক্ত হলে একাধিক যান সেখানে পাঠানো সম্ভব হবে।
ইউরোঅ্যাটলাস গ্রেশার্কের হাইড্রোজেন জ্বালানি কোষচালিত সংস্করণও তৈরি করছে। এটি পানির নিচে সর্বোচ্চ ১৬ সপ্তাহ বা ৮ হাজার নটিক্যাল মাইল চলার জন্য নকশা করা হয়েছে। তবে এই সক্ষমতা এখনো পানির নিচে পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়নি।
যন্ত্রের সঙ্গে যন্ত্রের লড়াই
স্বয়ংক্রিয় যান শুধু অবকাঠামো নজরদারিতেই ব্যবহৃত হবে না। বিভিন্ন দেশের স্বয়ংক্রিয় পানির নিচের যান শনাক্ত, অনুসরণ ও শ্রেণিবিন্যাসের জন্য ‘অ্যান্টি-এভি’ মিশনও তৈরি হচ্ছে।

ইউরোঅ্যাটলাসের কর্মকর্তাদের মতে, কোনো যান মিত্র দেশের নাকি প্রতিপক্ষের তা শনাক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ফলে ভবিষ্যতে পানির নিচে স্বয়ংক্রিয় যানের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয় যানের সরাসরি প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে। তবে এসব যান প্রচলিত সাবমেরিন ও যুদ্ধজাহাজের পুরোপুরি বিকল্প হবে না। বরং নৌবাহিনীকে মানবচালিত ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা একসঙ্গে ব্যবহার করতে হবে।
নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন
প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়লেও সমুদ্রের তলদেশে থাকা প্রতিটি অবকাঠামো সুরক্ষিত রাখা এখনো বাস্তবসম্মত নয়। কারণ এসব অবকাঠামোর বড় অংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন বা পরিচালিত হলেও নাশকতা কিংবা যুদ্ধের মতো পরিস্থিতিতে এর নিরাপত্তার দায়িত্ব সরকার ও সামরিক বাহিনীর ওপরও পড়ে।
কেবল নজরদারি বাড়ানো নয়, কেবলে সেন্সর বসানো ও আরও গভীরে কেবল স্থাপনের মতো ব্যবস্থার কথাও ভাবা হচ্ছে। তবে এসব উদ্যোগের খরচ কে বহন করবে এবং দায়িত্ব কার ওপর থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
পানির নিচে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির উন্নয়ন আকাশপথের ড্রোনের তুলনায় অনেক কঠিন। পানির নিচে দৃশ্যমানতা কম, যোগাযোগ ব্যবস্থা সীমিত এবং সংকেতও বাতাসের মতো সহজে চলাচল করতে পারে না। ফলে প্রযুক্তির অগ্রগতি হলেও সমুদ্রের তলদেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একক সমাধান হিসেবে এসব প্রযুক্তিকে এখনো দেখা যাচ্ছে না।