এআইয়ের যুগে টেলিকম নেটওয়ার্কে বাড়ছে সাইবার হামলার ঝুঁকি
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ব্যবহার বাড়ছে। এর সঙ্গে বদলে যাচ্ছে টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্কে সাইবার হামলার ধরন। কৃত্রিম পরিচয়, নকল কণ্ঠস্বর, ভুয়া ভিডিও কল ও এআইনির্ভর ফিশিং ব্যবহার করছে অপরাধীরা। এতে টেলিকম নেটওয়ার্কের পাশাপাশি মোবাইল আর্থিক সেবা ও সরকারি ডিজিটাল অবকাঠামোও ঝুঁকিতে পড়ছে।
টেলিকম রিভিউ আফ্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বিভিন্ন খাতে এআই-সহায়িত সাইবার হামলা ৭২ শতাংশ বেড়েছে। সাইবার নিরাপত্তা ও পেনিট্রেশন টেস্টিং সেবা দেওয়া প্রতিষ্ঠান ডিপস্ট্রাইকের তথ্য অনুযায়ী, এসব হামলায় বিশ্বজুড়ে সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ ৩০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
আগে ফিশিং বার্তা তৈরি বা পরিচয় নকল করতে সময় ও দক্ষতার প্রয়োজন হতো। এখন এআইয়ের সাহায্যে এসব কাজ সহজেই স্বয়ংক্রিয় করা যাচ্ছে। কম দক্ষতার প্রতারকেরাও দিনে হাজারো হামলা চালাতে পারছে।
মোবাইল আর্থিক সেবাও সাইবার অপরাধীদের বড় লক্ষ্য। এসব সেবায় ফিশিং, সিম বদল করে প্রতারণা, পরিচয় চুরি ও ক্ষতিকর সফটওয়্যারের মাধ্যমে হামলার ঝুঁকি বাড়ছে।
আফ্রিকার বিভিন্ন দেশেও সাইবার হামলার ঘটনা ঘটছে। লিবিয়ার রাষ্ট্রীয় টেলিকম প্রতিষ্ঠানের মূল ব্যবস্থায় দীর্ঘস্থায়ী ডিডিওএস হামলা হয়েছে। এতে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সেনেগালের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিচয়পত্র ইস্যু করা একটি বিভাগেও হামলা হয়েছে। গ্রিন ব্লাড গ্রুপ নামের একটি হ্যাকিং দল হামলাটির দায় স্বীকার করেছে। তাদের দাবি, তারা ১৩৯ টেরাবাইট তথ্য চুরি করেছে। এসব তথ্যে সেনেগালের পুরো জনগোষ্ঠীর তথ্য রয়েছে বলে দাবি করেছে দলটি।
নাইজেরিয়ার করপোরেট নিবন্ধন ব্যবস্থায় ২০২৬ সালের ১৫ এপ্রিল সাইবার হামলা শনাক্ত হয়। পরে ন্যাশনাল ইনফরমেশন টেকনোলজি ডেভেলপমেন্ট এজেন্সির সহায়তায় তদন্ত শুরু হয়। এ ঘটনায় টেলিকম ও আর্থিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক তথ্যের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
টেলিকম নেটওয়ার্কের সিগন্যালিং ব্যবস্থাও ঝুঁকিতে রয়েছে। এসএস৭-এর মতো সংকেত ব্যবস্থার দুর্বলতা কাজে লাগাতে পারে হামলাকারীরা। এর মাধ্যমে ফোনকল ও বার্তা আটকানো সম্ভব। ব্যবহারকারীর অবস্থানও শনাক্ত করা যেতে পারে।
তবে আফ্রিকায় ২০২৬ সালের শুরুর দিকে সাইবার হামলার সংখ্যা কমেছে। প্রতি সপ্তাহে গড়ে প্রায় ২ হাজার ৭০০ হামলা হয়েছে। এটি আগের বছরের তুলনায় ২২ শতাংশ কম। লাতিন আমেরিকার দিকে অপরাধীদের ঝুঁকে পড়া এবং আফ্রিকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা সক্ষমতা বাড়াকে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
হামলা ঠেকাতেও ব্যবহার হচ্ছে এআই
হামলাকারীরা এআই ব্যবহার করলেও একই প্রযুক্তি প্রতিরোধেও কাজে লাগছে। বিশ্লেষণ করা ফিশিং ই-মেইলের ৮২ দশমিক ৬ শতাংশে এআইয়ের কোনো না কোনো ব্যবহার দেখা গেছে। আবার ৫০ শতাংশ নিরাপত্তা পেশাজীবী ব্যক্তিভেদে তৈরি এআইভিত্তিক ফিশিংকে সবচেয়ে বড় হুমকি মনে করেন।
মাইক্রোসফট মে মাসে এমড্যাশ নামে একটি এআইভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তা বিশ্লেষণ ব্যবস্থা উন্মোচন করেছে। প্রচলিত ব্যবস্থা শুধু সন্দেহজনক কার্যক্রম শনাক্ত করে। এরপর তা মানব বিশ্লেষকের কাছে পাঠানো হয়। এমড্যাশ হুমকি অনুসন্ধান করতে পারে। বিভিন্ন তথ্যের মধ্যে সম্পর্কও খুঁজে বের করতে পারে। প্রয়োজন হলে ব্যবস্থা নেওয়ার কাজও করতে পারে।
নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোও একাধিক সুরক্ষা ব্যবস্থা একত্র করছে। ক্লাউড, কনটেইনার ও এপিআই ব্যবস্থার কার্যক্রম একসঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। অস্বাভাবিক কার্যক্রম দ্রুত শনাক্ত করাই এর লক্ষ্য।
এআইভিত্তিক সফটওয়্যার ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার দুর্বলতাও পরীক্ষা করা হচ্ছে। এ জন্য নিয়মিত পরীক্ষামূলক সাইবার হামলা চালানো হচ্ছে।
টেলিকম প্রতিষ্ঠানগুলো অস্বাভাবিক কার্যক্রম শনাক্তে তাৎক্ষণিক তথ্য বিশ্লেষণ ও যন্ত্রশিক্ষা ব্যবহার করছে। গ্রাহক হিসাব ও লেনদেন সুরক্ষায় বায়োমেট্রিক যাচাইও বাড়ছে। একাধিক ধাপে পরিচয় নিশ্চিত করার ব্যবস্থাও ব্যবহার করা হচ্ছে।

আফ্রিকায় বড় চ্যালেঞ্জ
আধুনিক সাইবার নিরাপত্তা প্রযুক্তি ব্যবহারে আফ্রিকার বড় বাধা অর্থ ও সক্ষমতার ঘাটতি। উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ ও এশিয়ার বড় প্রতিষ্ঠানগুলো আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরি করছে। আফ্রিকার অনেক টেলিকম প্রতিষ্ঠান ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসব ব্যবস্থা গ্রহণে পিছিয়ে রয়েছে।
এআইভিত্তিক হামলা যদি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার চেয়ে দ্রুত বাড়ে, তাহলে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। এতে হামলাকারী ও প্রতিরোধকারীদের সক্ষমতার ব্যবধানও বাড়বে।
প্রতিবেদনে কয়েকটি উদ্যোগের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা মানদণ্ডের সঙ্গে টেলিকম লাইসেন্স যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। মোবাইল আর্থিক সেবা ও জাতীয় পরিচয়ভিত্তিক ব্যবস্থাকে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে যৌথভাবে সুরক্ষার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আঞ্চলিক পর্যায়ে হুমকি-সংক্রান্ত তথ্য বিনিময়ের ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে বলা হয়েছে।
টেলিকম নেটওয়ার্কে এআইয়ের ব্যবহার আরও বাড়বে। এর সঙ্গে বাড়বে নিরাপত্তার গুরুত্ব। শুধু নতুন প্রযুক্তি দিয়ে এই ঝুঁকি মোকাবিলা সম্ভব নয়। দক্ষ জনবল, শক্তিশালী নীতিমালা ও আন্তদেশীয় সহযোগিতাও প্রয়োজন।