এআই উন্নয়নে দক্ষতা, সুশাসন ও শিল্পখাতের যৌথ উদ্যোগের আহ্বান

TechWorld Desk

টেকওয়ার্ল্ড ডেস্ক

রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬, ১১:৪৭

এআই উন্নয়নে দক্ষতা, সুশাসন ও শিল্পখাতের যৌথ উদ্যোগের আহ্বান
ছবি : দ্য এআই কালেকটিভ বাংলাদেশ চ্যাপ্টার

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব দ্রুত বাড়ছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় দেশের তরুণ পেশাজীবী ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করতে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

সম্প্রতি (৩ জুন ২০২৬) ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে মানুষ সপ্তাহ’ উপলক্ষে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে এ আহ্বান জানানো হয়। ‘নৈতিক ও এআই-দক্ষ কর্মশক্তি গড়ে তোলা: শিক্ষা-শিল্প সংলাপ’ শীর্ষক এ আয়োজন করে দ্য এআই কালেকটিভ বাংলাদেশ চ্যাপ্টার। বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশ (এআইইউবি) ক্যাম্পাসে।

মৌলিক জ্ঞান ও বাস্তব অভিজ্ঞতার সমন্বয় জরুরি

আলোচনাটি সঞ্চালনা করেন এআইইউবির সিএসই বিভাগের অধ্যাপক ও আন্ডারগ্র্যাজুয়েট বিভাগের প্রধান ড. মুহাম্মদ ফিরোজ মৃধা। তিনি বলেন, শক্তিশালী মৌলিক জ্ঞান ও বাস্তব এআই অভিজ্ঞতার সমন্বয় জরুরি। শিক্ষার্থীদের এআইকে শেখার সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করতে হবে, যেন এটি বোঝাপড়ার বিকল্প না হয়ে শেখার সক্ষমতা বাড়ায়। একই সঙ্গে তিনি গবেষণামুখী সংস্কৃতি, সমালোচনামূলক চিন্তা ও দায়িত্বশীল এআই ব্যবহারের ওপর জোর দেন।

এআই সুবিধায় বৈষম্য এখনো রয়ে গেছে

দ্য এআই কালেকটিভ বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের চ্যাপ্টার লিড মোহাম্মদ আসিফ বলেন, এআই প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির পরও এর সুফল এখনো বিশ্বজুড়ে সমভাবে পৌঁছেনি। অল্পসংখ্যক মানুষ উন্নত সুবিধা পেলেও অধিকাংশ মানুষ এখনো এআইয়ের সঙ্গে অর্থবহভাবে সম্পৃক্ত হতে পারেনি।

ডেটা সুরক্ষা ও নীতিমালার প্রয়োজনীয়তা

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাবেক ইঞ্জিনিয়ার-ইন-চিফ মেজর জেনারেল (অব.) ইবনে ফজল শায়েখুজ্জামান বলেন, কোনো প্রযুক্তিই প্রকৃত অর্থে বিনামূল্যে নয়। বিনা খরচে এআই টুল ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীর তথ্য ও আচরণ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হয়। ফলে ব্যবহারকারীরাই পণ্যে পরিণত হন। তিনি বলেন, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন সাধারণত উত্থান, অস্থিরতা ও পুনরুদ্ধারের ধারা অনুসরণ করে, এআইও সম্ভবত একই পথে এগোবে। এ ক্ষেত্রে সুশাসন ও তথ্য সুরক্ষার জন্য শক্তিশালী নীতিমালার প্রয়োজন রয়েছে।

পাঠ্যক্রমে এআই, তবে নির্ভরশীলতা নয়

এআইইউবির ফ্যাকাল্টি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির ডিন অধ্যাপক ড. দীপ নন্দী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ইতোমধ্যে পাঠ্যক্রমে এআই অন্তর্ভুক্ত করার কাজ করছে। তবে শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে নিজস্ব চিন্তা, সমস্যা সমাধান ও ডেটা বিশ্লেষণ দক্ষতা গড়ে তুলতে হবে। তিনি শিল্পখাতের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বাড়ানোর আহ্বান জানান, যাতে শিল্প-উপযোগী দক্ষ গ্র্যাজুয়েট তৈরি করা যায়।

নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জনের পরামর্শ

হুয়াওয়ে টেকনোলজিসের অপারেশনাল ডিরেক্টর মাহফুজ কায়সার অপু বলেন, একসঙ্গে সবকিছু শেখার চেয়ে এআইয়ের নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে গভীর দক্ষতা অর্জন জরুরি। তার মতে, উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় থেকেই এআই শেখা শুরু হওয়া উচিত। পাশাপাশি সরকার-সমর্থিত এআই-সমন্বিত শিক্ষা ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।

মানবকেন্দ্রিক এআই উন্নয়নের ওপর জোর

এআইইউবির গ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রামের প্রধান ড. তাবিন হাসান বলেন, এআইকে আরও মানবকেন্দ্রিক করতে হবে। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, একটি ঘোড়া স্বাভাবিক প্রবৃত্তিতে নিজেকে রক্ষা করে, কিন্তু স্বয়ংচালিত গাড়ি মানুষের জীবন রক্ষার জন্য প্রোগ্রাম করা হয়। এই পার্থক্যই দেখায়, এআই সিস্টেমকে মানুষের প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে তৈরি করতে হবে। মানুষের আস্থা তৈরি করতে সহজ ব্যবহার ও বাস্তব উপকারিতা গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি উল্লেখ করেন।

মানুষের সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য প্রয়োজন

এসিআই পিএলসির এআই বিজনেস বিভাগের পরিচালক ও সিওও মোহাম্মদ ওলি আহাদ বলেন, এআই অনেক ক্ষেত্রে উন্নত হলেও এখনো মানুষের স্বাভাবিক সক্ষমতার সমকক্ষ হয়নি। মানুষের হাতের মতো সংবেদনশীলতা ও অভিযোজনক্ষমতার উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, এআই উন্নয়নকে মানুষের সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। শিশুদের এআই থেকে দূরে না রেখে দায়িত্বশীল ও নৈতিক ব্যবহার শেখানোর ওপরও তিনি জোর দেন। পাশাপাশি শিক্ষকদের শিল্পখাতের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাড়ানোর পরামর্শ দেন।

সমালোচনামূলক দক্ষতা ও নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতির আহ্বান

এআইইউবির ড. মো. সাইফ উল্লাহ মিয়া বলেন, অনেক শিক্ষার্থী এখনো এআই কার্যকর ও দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করতে শেখেনি। এআই যুগে সঠিক প্রশ্ন করার দক্ষতা এবং প্রাপ্ত উত্তর সমালোচনামূলকভাবে মূল্যায়নের ক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি এআই-সমন্বিত মূল্যায়ন পদ্ধতি চালুর পক্ষে মত দেন, যেখানে মুখস্থ বিদ্যার পরিবর্তে সমস্যা সমাধান ও বিশ্লেষণী দক্ষতা মূল্যায়ন করা হবে। একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, সুশাসন ও তথ্য সুরক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

মানব ও এআইয়ের সহযোগিতার ভবিষ্যৎ

সমাপনী বক্তব্যে প্রাইম নাও-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট (ডেটা সায়েন্স ও এআই) খ. এহসানুর রহমান বলেন, এআইকে শুধু প্রযুক্তি নয়, মানব অগ্রগতির একটি সক্ষমতাবর্ধক মাধ্যম হিসেবে দেখতে হবে। এআইয়ের উন্নয়ন এমনভাবে হওয়া উচিত, যা মানুষের সক্ষমতা বাড়ায়, জনআস্থা বজায় রাখে এবং সমাজের কল্যাণে কাজ করে। ভবিষ্যৎকে ‘এআই বনাম মানুষ’ নয়, বরং মানুষ ও এআইয়ের দায়িত্বশীল সহযোগিতা হিসেবে দেখার আহ্বান জানান তিনি।

সমন্বিত উদ্যোগেই সম্ভাবনার বাস্তবায়ন

গোলটেবিল বৈঠকের আলোচনায় একটি বিষয়ে অভিন্ন মত উঠে আসে-বাংলাদেশে এআই-প্রস্তুত কর্মশক্তি গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় মেধা ও সম্ভাবনা রয়েছে। তবে তা বাস্তবে রূপ দিতে সময়োপযোগী পদক্ষেপ, নৈতিক নেতৃত্ব, কার্যকর সুশাসন এবং সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্পখাত ও নাগরিক সমাজের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।

টেকওয়ার্ল্ডের আপডেটেড খবর পেতে WhatsApp চ্যানেল ফলো করুন