স্টারলিংকের প্রতিদ্বন্দ্বী ‘রাসভেত’ স্যাটেলাইট আনছে রাশিয়া

Tech World Desk

টেক ওয়ার্ল্ড ডেস্ক

রবিবার, ১০ মে ২০২৬, ১১:৫৩

স্টারলিংকের প্রতিদ্বন্দ্বী ‘রাসভেত’ স্যাটেলাইট আনছে রাশিয়া
ছবি : ওয়্যার্ড ডটকম

রাশিয়া নিজস্ব স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ব্যবস্থার দিকে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে। ‘রাসভেত’ নামের নতুন কনস্টেলেশনের প্রথম ১৬টি ব্রডব্যান্ড স্যাটেলাইট নিম্ন কক্ষপথে পাঠানো হয়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি ইলন মাস্কের স্টারলিংকের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে গড়ে তোলার একটি উদ্যোগ।

গত ২৩ মার্চ মস্কো সময় রাত ৮টা ২৪ মিনিটে সামরিক কসমোড্রোম থেকে রকেটের মাধ্যমে এই উৎক্ষেপণ সম্পন্ন হয়। এই ধারাবাহিকতায় ২০৩০ সালের মধ্যে অন্তত ৩০০ স্যাটেলাইট নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ নেটওয়ার্ক গড়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।

পরীক্ষা ধাপ পেরিয়ে বাণিজ্যিক সেবার পথে

প্রকল্পটি পরিচালনা করছে ব্যুরো ১৪৪০। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, তারা পরীক্ষামূলক ধাপ শেষ করে এখন যোগাযোগ সেবা তৈরির পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। পরীক্ষামূলক স্যাটেলাইট থেকে উৎপাদন পর্যায়ে যেতে তাদের সময় লেগেছে প্রায় এক হাজার দিন।

এই নেটওয়ার্কের লক্ষ্য প্রতিটি ব্যবহারকারী টার্মিনালে সর্বোচ্চ ১ গিগাবিট প্রতি সেকেন্ড গতির ইন্টারনেট সরবরাহ করা এবং ল্যাটেন্সি ৭০ মিলিসেকেন্ডের মধ্যে রাখা।

স্টারলিংকের সঙ্গে কৌশলগত প্রতিযোগিতা

রাসভেতকে শুরু থেকেই স্টারলিংকের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধে স্টারলিংক সেনা যোগাযোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখায় স্যাটেলাইট ইন্টারনেট এখন কৌশলগত প্রযুক্তিতে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউক্রেন কিছু রুশ ইউনিটের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বাধা দিতে অননুমোদিত স্টারলিংক টার্মিনাল সীমিত করেছিল।

এই প্রেক্ষাপটে রাসভেতকে শুধু বাণিজ্যিক ইন্টারনেট সেবা নয়, বরং সামরিক ও বেসামরিক দুই ধরনের ব্যবহারের জন্য তৈরি একটি অবকাঠামো হিসেবে দেখা হচ্ছে। উৎক্ষেপণটি রাশিয়ার মহাকাশ সংস্থার বদলে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়াও সেই ইঙ্গিতকে আরও জোরালো করেছে।

রাষ্ট্রীয় সম্পৃক্ততা ও বিনিয়োগ

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এই উৎক্ষেপণকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উৎক্ষেপণের দিন কসমোড্রোমে সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কার কথাও জানিয়েছেন।

প্রকল্পে বড় ধরনের রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ রয়েছে। যোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে প্রায় ১০০ বিলিয়ন রুবল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কোম্পানিটি নিজেও আরও ৩০০ বিলিয়ন রুবল বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে।

প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা ও উৎপাদন চ্যালেঞ্জ

বিশেষজ্ঞদের মতে, 

রাসভেত মূলত স্টারলিংকের মতো ভোক্তা-কেন্দ্রিক সিস্টেম নয়। এটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রীয় সংস্থা এবং সরকারি ব্যবহারকারীদের জন্য বেশি উপযোগী একটি কাঠামো।

তবে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। ব্যবহারকারী টার্মিনাল স্টারলিংকের তুলনায় বড় ও ভারী, যা ব্যাপক ব্যবহারকে কিছুটা জটিল করতে পারে।

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো উৎপাদন সক্ষমতা। কয়েক বছরের মধ্যে ৩০০ স্যাটেলাইট কক্ষপথে পাঠাতে হলে প্রতি সপ্তাহে এক থেকে দুইটি স্যাটেলাইট তৈরি করতে হবে, যা রাশিয়ার মহাকাশ শিল্পের জন্য নতুন চাপ। এখন পর্যন্ত এমন ধারাবাহিক উৎপাদন সক্ষমতা কেবল স্টারলিংক ও ওয়ানওয়েব দেখাতে পেরেছে।

কক্ষপথ ও কভারেজে কৌশল

রাসভেত স্যাটেলাইটগুলো প্রায় ৮০০ কিলোমিটার উচ্চতার নিম্ন কক্ষপথে কাজ করবে, যেখানে স্টারলিংকের স্যাটেলাইটগুলো সাধারণত ৫৫০ কিলোমিটার বা তার কম উচ্চতায় থাকে।

আরেকটি বড় পার্থক্য হলো কক্ষপথের ধরন। স্টারলিংক মূলত জনবহুল এলাকায় কভারেজ দেয়, আর রাসভেত প্রায় মেরু কক্ষপথ ব্যবহার করছে। ফলে রাশিয়ার পুরো ভূখণ্ড, এমনকি দূরবর্তী ও মেরু অঞ্চলও এর আওতায় আসবে।

প্রকল্পের নেপথ্য কাঠামো ও নিয়ন্ত্রণ

ব্যুরো ১৪৪০ প্রতিষ্ঠিত হয় ২০২০ সালে, শুরুতে মেগাফনের একটি বিভাগ হিসেবে। পরে ২০২২ সালে এটি আইকেএস হোল্ডিংয়ের অধীনে আসে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই হোল্ডিং নজরদারি প্রযুক্তি ও ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। রাশিয়ায় ইন্টারনেট সীমিত করা, বার্তাবিনিময় প্ল্যাটফর্ম নিয়ন্ত্রণ এবং রাষ্ট্রীয় মেসেজিং ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার উদ্যোগের সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে।

এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ের এক কর্মকর্তার পারিবারিক সম্পর্ক রুশ গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকার তথ্যও সামনে এসেছে, যা প্রকল্পটির কৌশলগত গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করে।

দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য ও চ্যালেঞ্জ

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাসভেতের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ নয়, বরং বড় পরিসরে উৎপাদন, সাশ্রয়ী টার্মিনাল তৈরি এবং কার্যকর অবকাঠামো গড়ে তোলা। পূর্ণাঙ্গ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে সময় লাগবে কয়েক বছর এবং একাধিক উৎক্ষেপণ মিশন।

‘রাসভেত’ শুধু একটি ইন্টারনেট প্রকল্প নয়, বরং রাশিয়ার ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব এবং ভবিষ্যতের প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার একটি কৌশলগত উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

টেকওয়ার্ল্ডের আপডেটেড খবর পেতে WhatsApp চ্যানেল ফলো করুন