গাড়ি কেনার আগে অবশ্যই যা জানা উচিত
নিজের একটা গাড়ি থাকবে, যেখানে খুশি যখন খুশি যাওয়া যাবে— ভাবতেই মনটা নেচে ওঠে। কিন্তু এই স্বপ্ন পূরণের আগে কিছু জিনিস জেনে রাখা দরকার। নাহলে পরে পস্তাতে হতে পারে! তাই, গাড়ি কেনার আগে কী কী বিষয়ে আপনার খেয়াল রাখা উচিত, সেই নিয়েই আজকের আলোচনা।
গাড়ি কেনার আগে আপনার বাজেট
গাড়ি কেনার প্রথম ধাপ হলো বাজেট তৈরি করা। আপনার সাধ্যের মধ্যে কোন গাড়িটি সেরা, সেটা খুঁজে বের করতে হবে। শুধু গাড়ির দাম নয়, এর সাথে আরও কিছু খরচ জড়িত থাকে।
গাড়ির দাম
গাড়ির দামের হিসাব তো থাকবেই। বিভিন্ন মডেলের দাম যাচাই করে আপনার বাজেট অনুযায়ী সেরা অপশনটি বেছে নিন।
রেজিস্ট্রেশন ও ট্যাক্স
গাড়ি কেনার সময় রেজিস্ট্রেশন ফি ও ট্যাক্স দিতে হয়। এই খরচগুলোও আপনার বাজেটে যোগ করুন।
বিমা খরচ
গাড়ির বিমা করা বাধ্যতামূলক। বিমার প্রিমিয়াম কত হবে, তা আগে থেকে জেনে নিন।
জ্বালানি খরচ
গাড়ি চালালে তো তেল লাগবেই! তাই কোন গাড়িটি বেশি তেল সাশ্রয়ী, তা দেখে কেনা ভালো।
অন্যান্য খরচ
গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ, সার্ভিসিং—এসব খরচও মাথায় রাখতে হবে।
গাড়ির ধরন নির্বাচন
আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক গাড়িটি বেছে নেওয়া জরুরি। বিভিন্ন ধরনের গাড়ি পাওয়া যায়, যেমন-
হ্যাচব্যাক
ছোট পরিবারের জন্য এই গাড়ি বেশ উপযোগী। শহরের রাস্তায় সহজে চালানো যায়।
সেডান
যারা একটু আরামদায়ক গাড়ি পছন্দ করেন, তাদের জন্য সেডান সেরা।
এসইউভি
লম্বা পথ বা দুর্গম রাস্তায় চালানোর জন্য এসইউভি খুব ভালো।
এমপিভি
বড় পরিবারের জন্য এই গাড়ি উপযুক্ত, যেখানে অনেক যাত্রী একসাথে বসতে পারে।
গাড়ির ফিচার্স ও স্পেসিফিকেশন
গাড়ির ফিচার্সগুলো ভালোভাবে দেখে নেওয়া উচিত। আপনার প্রয়োজনীয় সব সুবিধা আছে কিনা, তা যাচাই করুন।
ইঞ্জিন
গাড়ির ইঞ্জিন কত সিসির, তা জানা দরকার। ইঞ্জিনের ক্ষমতা কেমন, তা দেখে নিন।
সুরক্ষা ব্যবস্থা
গাড়িতে কী কী সুরক্ষা ব্যবস্থা আছে, যেমন—এয়ারব্যাগ, এবিএস, ইবিডি, এগুলো নিশ্চিত করুন।
ট্রান্সমিশন
গাড়িটি অটোমেটিক নাকি ম্যানুয়াল, তা আপনার পছন্দের ওপর নির্ভর করে।
অভ্যন্তরীণ সরঞ্জাম
গাড়ির ভেতরে কী কী সুবিধা আছে, যেমন—এসি, মিউজিক সিস্টেম, পাওয়ার উইন্ডো, এগুলো দেখে নিন।
গাড়ির মাইলেজ
জ্বালানি সাশ্রয়ী গাড়ি কেনা বুদ্ধিমানের কাজ। কোন গাড়ি কত কিলোমিটার যায়, তা জেনে নিন।
শহরের রাস্তায় মাইলেজ
শহরে গাড়ি চালালে প্রতি লিটারে কত কিলোমিটার যায়, তা জানা জরুরি।
হাইওয়েতে মাইলেজ
হাইওয়েতে গাড়ি চালালে মাইলেজ কেমন পাওয়া যায়, সেটাও দেখে নিতে পারেন।
জ্বালানির ধরন
গাড়িটি পেট্রোল, ডিজেল, নাকি সিএনজি-চালিত, তা আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী বেছে নিন।
টেস্ট ড্রাইভ
গাড়ি কেনার আগে অবশ্যই টেস্ট ড্রাইভ করে দেখুন। এতে আপনি বুঝতে পারবেন গাড়িটি আপনার জন্য উপযুক্ত কিনা।
রাস্তায় ড্রাইভিং
বিভিন্ন রাস্তায় গাড়ি চালিয়ে দেখুন, যেমন—শহরের রাস্তা, হাইওয়ে, খারাপ রাস্তা।
পার্কিং
গাড়িটি সহজে পার্ক করা যায় কিনা, তা পরীক্ষা করুন।
নিয়ন্ত্রণ
গাড়ির নিয়ন্ত্রণ কেমন, স্টিয়ারিং ও ব্রেক কেমন কাজ করে, তা ভালোভাবে দেখুন।
গাড়ির সার্ভিস ও রক্ষণাবেক্ষণ
গাড়ি কেনার পর সার্ভিসিং ও রক্ষণাবেক্ষণ খুব জরুরি।
সার্ভিস সেন্টার
আপনার বাড়ির কাছে সার্ভিস সেন্টার আছে কিনা, তা জেনে নিন।
স্পেয়ার পার্টস
গাড়ির স্পেয়ার পার্টস সহজে পাওয়া যায় কিনা, তা নিশ্চিত করুন।
ওয়ারেন্টি
গাড়ির ওয়ারেন্টি কত দিনের, এবং কী কী কভার করে, তা জেনে নিন।
গাড়ির রং
গাড়ির রং পছন্দ একটি ব্যক্তিগত বিষয়। তবে কিছু রংয়ের বিশেষ সুবিধা আছে।
জনপ্রিয় রং
সাদা, রুপালি, এবং কালো রং সাধারণত বেশি জনপ্রিয়।
রংয়ের স্থায়িত্ব
কিছু রং দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়, তাই রংয়ের স্থায়িত্ব দেখে নেওয়া ভালো।
পরিষ্কার রাখা
কিছু রং সহজে পরিষ্কার রাখা যায়, যা আপনার জন্য সুবিধা হতে পারে।
গাড়ি কেনার সময় কিছু অতিরিক্ত টিপস
গাড়ি কেনার সময় আরও কিছু বিষয়ে মনোযোগ দেওয়া উচিত।
পুরোনো মডেল নাকি নতুন
নতুন মডেলের গাড়ি কেনা ভালো, নাকি পুরোনো মডেলের আপগ্রেড সংস্করণ কেনা লাভজনক, তা বিবেচনা করুন।
শোরুমের খ্যাতি
যে শোরুম থেকে কিনছেন, তাদের সুনাম কেমন, তা জেনে নিন।
কাগজপত্র
গাড়ির সব কাগজপত্র ভালোভাবে যাচাই করুন।
গাড়ি কেনার পর করণীয়
গাড়ি কেনার পরেই কিছু কাজ সেরে ফেলতে হয়।
নাম পরিবর্তন
গাড়িটি আপনার নামে রেজিস্টার করুন।
বিমা নবায়ন
নিয়মিত বিমা নবায়ন করুন।
নিয়মিত সার্ভিসিং
সময়মতো সার্ভিসিং করিয়ে আপনার গাড়িটিকে সচল রাখুন।
গাড়ি কেনার আগে কিছু সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর
গাড়ি কেনার আগে আপনার মনে অনেক প্রশ্ন আসতে পারে। এখানে কিছু সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো:
নতুন গাড়ি নাকি পুরাতন গাড়ি কিনবো?
নতুন গাড়ির সুবিধা হলো এটি একেবারে নতুন থাকে এবং ওয়ারেন্টি পাওয়া যায়। অন্যদিকে, পুরাতন গাড়ির দাম কম থাকে। আপনার বাজেট ও চাহিদার ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নিন।
গাড়ির ইঞ্জিন অয়েল কখন পরিবর্তন করতে হয়?
সাধারণত, প্রতি ৫,০০০ থেকে ১০,০০০ কিলোমিটারে ইঞ্জিন অয়েল পরিবর্তন করা উচিত। তবে, প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা অনুসরণ করা ভালো।
গাড়ির টায়ারের যত্ন কিভাবে নিতে হয়?
টায়ারের নিয়মিত প্রেশার পরীক্ষা করুন এবং সঠিক পরিমাণে হাওয়া দিন। প্রতি ৬ মাস অন্তর টায়ারের অ্যালাইনমেন্ট ও ব্যালেন্সিং করানো উচিত।
গাড়ির ব্যাটারি কতদিন পর্যন্ত ভালো থাকে?
গাড়ির ব্যাটারি সাধারণত ৩ থেকে ৫ বছর পর্যন্ত ভালো থাকে। নিয়মিত পরীক্ষা করলে ব্যাটারির আয়ু বাড়ানো যায়।
গাড়ির ইন্স্যুরেন্স কেন জরুরি?
গাড়ির ইন্স্যুরেন্স অপ্রত্যাশিত দুর্ঘটনা থেকে আপনাকে আর্থিক সুরক্ষা দেয়। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে, ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি আপনার ক্ষতির পরিমাণ বহন করে।
গাড়ির রেজিস্ট্রেশন কিভাবে করতে হয়?
গাড়ির রেজিস্ট্রেশন করার জন্য আপনার এলাকার আরটিও (রিজিওনাল ট্রান্সপোর্ট অফিস) অফিসে যোগাযোগ করতে হবে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও ফি জমা দিয়ে আপনি রেজিস্ট্রেশন করতে পারেন।
গাড়ি কেনার জন্য ব্যাংক থেকে লোন কিভাবে পাবো?
গাড়ি কেনার জন্য ব্যাংক থেকে লোন নিতে হলে, প্রথমে বিভিন্ন ব্যাংকের লোনের অফারগুলো তুলনা করুন। আপনার ক্রেডিট স্কোর ভালো থাকলে লোন পাওয়া সহজ হবে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, যেমন—আইডি, ঠিকানা, আয়ের প্রমাণ ইত্যাদি জমা দিতে হবে।
গাড়ি কেনার সময় কি কি কাগজপত্র দেখতে হয়?
গাড়ি কেনার সময় রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট, ইন্স্যুরেন্স পেপার, ট্যাক্স রিসিট এবং সার্ভিস হিস্টরি ভালোভাবে দেখে নিতে হয়।
গাড়ির রং কি সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ?
গাড়ির রং ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়। তবে কিছু রংয়ের resale value বেশি থাকে। সাদা, কালো, এবং রুপালি রং সাধারণত বেশি জনপ্রিয়।
গাড়ির মাইলেজ কিভাবে বাড়াবো?
গাড়ির মাইলেজ বাড়ানোর জন্য নিয়মিত সার্ভিসিং করান, টায়ারের প্রেশার ঠিক রাখুন, এবং সঠিক গতিতে গাড়ি চালান।
গাড়ির কিস্তি পরিশোধ করতে দেরি হলে কি হবে?
গাড়ির কিস্তি পরিশোধ করতে দেরি হলে ব্যাংক জরিমানা নিতে পারে এবং আপনার ক্রেডিট স্কোরে খারাপ প্রভাব পড়তে পারে। নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করা জরুরি।
গাড়ি চুরি হলে কি করবো?
গাড়ি চুরি হলে দ্রুত থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করুন এবং আপনার ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির সাথে যোগাযোগ করুন।
গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কমাতে কি করা যায়?
গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কমাতে নিয়মিত সার্ভিসিং করান, ভালো মানের ইঞ্জিন অয়েল ব্যবহার করুন, এবং অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানো পরিহার করুন।
গাড়ি কেনার পর প্রথম সার্ভিসিং কখন করানো উচিত?
গাড়ি কেনার পর প্রথম সার্ভিসিং সাধারণত ১,০০০ থেকে ২,০০০ কিলোমিটার চালানোর পর করানো উচিত।
গাড়ির স্পেয়ার পার্টস কোথায় পাওয়া যায়?
গাড়ির স্পেয়ার পার্টস অথরাইজড সার্ভিস সেন্টার এবং বিভিন্ন অটো পার্টসের দোকানে পাওয়া যায়।