নগর থেকে গ্রাম, ডিজিটাল লেনদেন বদলাচ্ছে জীবন
ঢাকার ধানমণ্ডিতে ছোট একটি রেস্তোরাঁ চালাচ্ছেন সায়মা আক্তার। গত এক বছর ধরে তার দৈনন্দিন লেনদেনের সব কিছুই বিকাশের মাধ্যমে হচ্ছে। তিনি বলছেন, ‘বিকাশ ব্যবহার করার পর ক্যাশ নিয়ে চিন্তা কমে গেছে। লেনদেন এখন অনেক দ্রুত এবং নিরাপদ। কিউআর কোড পেমেন্ট চালু হওয়ার পর গ্রাহকরা আরও স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন। ব্যবসাও বাড়ছে।’
সায়মার এই গল্প শুধু শহরের উদাহরণ নয়। দেশের বিভিন্ন নগর ও গ্রামীণ অঞ্চলে বিকাশের প্রসার লক্ষ করা যাচ্ছে। নগরাঞ্চলে ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে, আর গ্রামীণ অঞ্চলেও ধীরে ধীরে ডিজিটাল লেনদেনকে গ্রহণ করছে মানুষ।
নগর এলাকায় বিকাশের গ্রহণযোগ্যতা
ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট এবং অন্যান্য শহরে দোকান, রেস্তোরাঁ, অনলাইন শপিং ও পরিবহণে বিকাশ ব্যবহার ব্যাপক। নগর ব্যবসায়ীরা বলছেন, ‘বিকাশের কারণে ক্যাশ ব্যবহারের চাপ কমেছে। লেনদেন দ্রুত হচ্ছে, আর গ্রাহকরা সহজে পেমেন্ট করতে পারছেন।’
তথ্য অনুযায়ী, নগর অঞ্চলের প্রায় ৭০ শতাংশ ব্যবসায়ী নিয়মিতভাবে ডিজিটাল লেনদনে করছে, যার অধিকাংশই বিকাশ ব্যবহারকারী। তরুণ নাগরিকরা অনলাইন কেনাকাটা, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও মোবাইল বিল এবং বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে অর্থ ভাগাভাগির জন্য বিকাশকে প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছেন।
নগর ব্যবহারকারী নিশাত রহমান বলেন, ‘আমি প্রতিদিন বিকাশ ব্যবহার করি। অনলাইন শপিং থেকে শুরু করে বন্ধুদের সঙ্গে খরচ ভাগ করা পর্যন্ত সবই সহজে করা যায়। নগদ নিয়ে বেশি চিন্তা করতে হয় না।’
গ্রামীণ অঞ্চলে ধীরে বৃদ্ধি
গ্রামীণ অঞ্চলে এখনও ক্যাশ লেনদেনের প্রাধান্য রয়েছে। তবে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কৃষক ও স্থানীয় দোকানদার ধীরে ধীরে ডিজিটাল লেনদেনের দিকে ঝুঁকছে। বিকাশের এজেন্টরা গ্রাহকদের শেখাচ্ছেন কীভাবে অ্যাপ ব্যবহার করতে হয়, লেনদেন নিরাপদ রাখতে হয় এবং কিউআর কোডের মাধ্যমে দ্রুত পেমেন্ট করতে হয়।
ময়মনসিংহ জেলার গৃহিণী ফাতেমা খাতুন বললেন, ‘প্রথমে একটু ভয় ছিল। কিন্তু একবার শিখে নেওয়ার পর এখন আমি সহজেই পেমেন্ট করি। বাজারে কেনাকাটা, স্কুল ফি, এমনকি ছোট ঋণও এখন মোবাইলের মাধ্যমে দিচ্ছি। এটি সময় বাঁচাচ্ছে এবং ঝুঁকি কমাচ্ছে।’
ময়মনসিংহের স্থানীয় কৃষক জসিম উদ্দিন বলেন, ‘বিকাশের মাধ্যমে আমি কৃষি ইনপুট কিনতে এবং বিক্রি করতে পারি। আগে মধ্যস্থতাকারীর কারণে অনেক টাকা হারাতাম। এখন টাকা সরাসরি আসে। আমার আয় বেড়েছে এবং ঝুঁকি কমেছে।’
গ্রামীণ অঞ্চলে বিকাশের গ্রহণযোগ্যতা ধীরে হলেও বৃদ্ধির মূল কারণ হলো সহজ ব্যবহার, গ্রাহক শিক্ষার উদ্যোগ এবং ক্যাশ লেনদেনের ঝুঁকি কমানো।
নিরাপত্তা ও ব্যবহারকারীর আস্থা
বিকাশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা; পিন, ওটিপি এবং ফ্রড সনাক্তকরণ পদ্ধতি গ্রাহকদের আস্থা বাড়িয়েছে। নগর ও গ্রাম উভয় অঞ্চলে ব্যবহারকারীরা ডিজিটাল লেনদেনকে নিরাপদ ও সুবিধাজনক মনে করছেন।
ঢাকার ব্যাংক কর্মকর্তা মেহেদী হাসান বলেন, ‘গ্রাহকরা এখন ক্যাশ নিয়ে ঝুঁকি নিচ্ছেন না। বিকাশের মাধ্যমে পেমেন্ট নিরাপদ এবং লেনদেনের রেকর্ডও থাকে। এটি ঝুঁকি কমাচ্ছে এবং আর্থিক আচরণকে আরও স্বচ্ছ করছে।'

উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের অভিজ্ঞতা
শহরের ব্যবসায়ী রাশেদ আলম বলেন, ‘কিউআর কোড পেমেন্ট চালু হওয়ার পর আমাদের দোকানে লেনদেন অনেক দ্রুত হয়েছে। গ্রাহকরা এখন ক্যাশ নিয়ে আসছেন না। এটি আমাদের ব্যবসা বাড়াতে সাহায্য করছে।’
সায়মা আক্তারও জানালেন, ‘আমার রেস্তোরাঁয় বিকাশ ব্যবহার করার ফলে লেনদেন সহজ হয়েছে। গ্রাহকরা আর দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হয় না। আর্থিক লেনদেন এখন অনেক স্বচ্ছ এবং নিরাপদ।’
নতুন উদ্ভাবন ও ভবিষ্যত পরিকল্পনা
বিকাশ নতুন ফিচার চালু করছে, যা নগর ও গ্রামীণ উভয় অঞ্চলে ব্যবহার আরও বাড়াবে। এর মধ্যে রয়েছে কিউআর কোড পেমেন্ট, ব্যবসায়িক অ্যাকাউন্ট, ক্ষুদ্র ঋণ সুবিধা এবং অনলাইন বিল পেমেন্ট।
বিকাশের লক্ষ্য আরও গ্রামীণ অঞ্চলে ডিজিটাল শিক্ষামূলক কর্মসূচি চালানো, যাতে মানুষ সহজে লেনদেন শিখতে পারে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও কৃষকদের জন্য লোন ও সাপোর্ট সেবা চালু হওয়ায় অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি আরও বাড়বে।
ব্যবসায়ী ও অর্থনীতির ওপর প্রভাব
বিকাশের প্রসার নগর ও গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। ছোট ব্যবসায়ীরা ক্যাশ লেনদেন ঝুঁকি কমিয়ে ব্যবসা বাড়াচ্ছেন। কৃষকরা সরাসরি বিক্রেতাদের সাথে লেনদেন করছেন। আর্থিক স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং লেনদেনের সময়ও কমছে।
একটি সমীক্ষা দেখিয়েছে, গ্রামীণ ব্যবসায়ীদের প্রায় ৬০ শতাংশ ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে লেনদেন করছেন (অধিকাংশই বিকাশের মাধ্যমে লেনদেন করছে)। শহরের ব্যবসায়ীদের মধ্যে এই সংখ্যা ৮০ শতাংশেরও বেশি। এটি প্রমাণ করে ডিজিটাল লেনদেনের গ্রহণযোগ্যতা ধীরে হলেও গ্রামীণ এলাকায় বৃদ্ধি পাচ্ছে।
চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
যদিও বিকাশের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, গ্রামীণ অঞ্চলে ইন্টারনেট সংযোগের সমস্যা, ডিজিটাল শিক্ষার অভাব এবং প্রবীণ ব্যবহারকারীর ধীর অভিযোজন এখনও একটি বড় প্রতিবন্ধকতা। তবে বিকাশ এজেন্টদের প্রশিক্ষণ এবং সরকারের শিক্ষামূলক উদ্যোগের মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব।
ভবিষ্যতে কিউআর কোড পেমেন্ট, ক্ষুদ্র ঋণ, ব্যবসায়িক অ্যাকাউন্ট এবং নতুন ফিচারের মাধ্যমে ডিজিটাল লেনদেনের গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়বে। নগর ও গ্রামীণ উভয় অঞ্চলে বিকাশ দেশের অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তিকে শক্তিশালী করবে।
বিকাশ বাংলাদেশের ডিজিটাল লেনদেনের দৃঢ় ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নগর এবং গ্রামীণ অঞ্চলে ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাওয়া এই সেবা ব্যবসা, কৃষি ও দৈনন্দিন লেনদেনে নতুন দিগন্ত খুলেছে। নিরাপত্তা, সহজ ব্যবহার এবং নতুন উদ্ভাবন গ্রাহকদের আস্থা জোগাচ্ছে।
সায়মা আক্তারের মতো উদ্যোক্তাদের গল্প প্রমাণ করছে, ডিজিটাল লেনদেন শুধুমাত্র নগরাঞ্চলে সীমাবদ্ধ নয়, গ্রামীণ অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সঠিক প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নতুন ফিচারের মাধ্যমে বিকাশ দেশের অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি আরও শক্তিশালী করবে।
বিকাশের হেড অব কর্পোরেট কমিউনিকেশনস শামসুদ্দিন হায়দার ডালিম বলেন, ‘দেশজুড়ে ডিজিটাল লেনদেনের প্রসার বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনছে। বিকাশ তার যাত্রার শুরু থেকেই আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশের ডিজিটাল লেনদেনের ইকোসিস্টেম তৈরিতে কাজ করছে। উদ্ভাবনী প্রযুক্তি, নিরাপদ লেনদেন ব্যবস্থা এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে বিকাশ গ্রামীণ ও নগর উভয় অঞ্চলে ডিজিটাল পেমেন্টকে সহজ, দ্রুত ও গ্রহণযোগ্য করেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কিউআর কোড পেমেন্ট, পেমেন্ট গেটওয়ে, মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট, পে-লেটার, ডিজিটাল লোনসহ নানা সেবার মাধ্যমে গ্রাহক-ব্যবসায়ী উভয়ের জন্যই প্রতিদিনকার কেনাবেচায় স্বাচ্ছন্দ্য তৈরি করেছে। পাশাপাশি, ডিজিটাল লিটারেসি বাড়ানো, আধুনিকতম প্রযুক্তির ব্যবহার এবং অংশীজনদের সঙ্গে নিয়ে নতুন নতুন সেবা প্রদানের মাধ্যমে দেশের ডিজিটাল লেনদেনের ইকোসিস্টেমকে আরও শক্তিশালী করতে কাজ করে যাচ্ছে বিকাশ।’

ইরা ইনফোটেক- এর সাবেক চিফ অপারেশন অফিসার ও ব্যাংক এশিয়ার বর্তমান এজেন্ট ব্যাংকিং-এর প্রধান মো. সিরাজুল ইসলাম জানান, ব্যাংক এশিয়ার প্রায় ৩০ হাজার মাইক্রো মার্চেন্ট দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সারাদিন সীমিত ব্যাংকিং সেবা দিচ্ছে। নগদ উত্তোলন, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির টাকা বিতরণ, বিদ্যুৎ বিল সংগ্রহ ও কিউআর ব্যবহার করে অর্থ গ্রহণসহ নানা সেবা চলছে। শিগগিরই ই-কেওয়াইসি খোলা, রেমিট্যান্স বিতরণ ও ঋণ-সংক্রান্ত সেবাও যুক্ত হবে।
তিনি বলেন, ‘নারী উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করা ১২শ’ মাইক্রো মার্চেন্টকে আমরা বিনামূল্যে স্মার্টফোন ও বায়োমেট্রিক যন্ত্র দিয়েছি। সব মাইক্রো মার্চেন্টকে কিউআর স্ট্যান্ড সরবরাহ করা হলেও কিউআর লেনদেন গ্রহণে তারা আগ্রহ দেখাচ্ছে না।’
কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, প্রতিটি কিউআর লেনদেনে তাদের ২ শতাংশ ফি দিতে হয়। ৫শ’ টাকার বিক্রয়ে দোকানদার হাতে পান চারশ’ নব্বই টাকা। এই ক্ষতির কারণে তারা কিউআর ব্যবহার করতে চান না।
ক্যাশলেস সমাজ গড়ে তুলতে হলে এই ২ শতাংশ ফি সরকারের পক্ষ থেকে ভর্তুকি দিতে হবে। নীতি নির্ধারক ও ব্যাংকগুলোর এখনই বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা জরুরি বলেও মনে করেন মো. সিরাজুল ইসলাম।