ফেসবুক-মেসেঞ্জারে বিশ্বব্যাপী বড় বিপর্যয়, ভোগান্তিতে কোটি ব্যবহারকারী
শুক্রবার সন্ধ্যায় হঠাৎ করেই যেন থমকে গিয়েছে ডিজিটাল দুনিয়া। কোনো আগাম সতর্কবার্তা ছাড়াই মেটার জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও তাৎক্ষণিক বার্তা আদান-প্রদানের অ্যাপ মেসেঞ্জার বিশ্বব্যাপী অচল হয়ে পড়ে। হঠাৎ করে অ্যাকাউন্ট ‘লগআউট’ হয়ে যাওয়া এবং পুনরায় প্রবেশ করতে না পারায় চরম বিভ্রান্তি ও ভোগান্তিতে পড়েন কোটি কোটি ব্যবহারকারী। বাংলাদেশ সময় শুক্রবার সন্ধ্যা পৌনে আটটার (৭:৪৫ মিনিট) দিকে এই বিপর্যয় শুরু হয়, যা স্থায়ী ছিল বেশ কিছু সময়।
কীভাবে শুরু হলো বিপর্যয়?
শুক্রবার মেটার প্রধান দুটি প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করতে গিয়ে ব্যবহারকারীরা প্রথম ধাক্কাটি খান। অ্যাপ ও ওয়েব সংস্করণে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আইডি লগআউট হয়ে যায়। নতুন করে লগইন করার চেষ্টা করলে স্ক্রিনে ভেসে ওঠে ‘অ্যান আনএক্সপেক্টেড এরর অকার্ড’ (একটি অপ্রত্যাশিত ত্রুটি ঘটেছে) কিংবা ‘আননোন এরর’ (অজানা ত্রুটি)-এর মতো বার্তা।
ডাউনডিটেক্টরসহ বৈশ্বিক ওয়েবসাইট পর্যবেক্ষণকারী সেবাগুলো জানায়, মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষ এই বিভ্রাটের কথা রিপোর্ট করতে শুরু করেন। প্রাথমিক অবস্থায় ইনস্টাগ্রাম এবং হোয়াটসঅ্যাপের মোবাইল অ্যাপ কিছুটা সচল থাকলেও, বৈশ্বিকভাবে এগুলোর ওয়েব সংস্করণ পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছিল।
রিপোর্টটি লেখার সময় হোয়াটসঅ্যাপের ওয়েব ভার্সন কাজ করলেও, ফেসবুক বাংলাদেশে ব্যবহারকারীদের জন্য পুরোপুরি স্বাভাবিক হয় নি। অনেক ব্যবহারকারীই এখনো ধীরগতি বা লগইন জটিলতার মুখোমুখি হচ্ছেন।
বিকল্প প্ল্যাটফর্মে ব্যবহারকারীদের ঢল
ফেসবুক ও মেসেঞ্জার অন্ধকার হয়ে যাওয়ার পরপরই ব্যবহারকারীরা বিকল্প যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারকারীরা ভিড় করতে শুরু করেন এক্সে (সাবেক টুইটার)। এক্সে ‘#FacebookDown’ এবং ‘#MessengerDown’ হ্যাশট্যাগ মুহূর্তের মধ্যে ট্রেন্ডিংয়ে চলে আসে। লাখ লাখ ব্যবহারকারী সেখানে স্ক্রিনশট শেয়ার করে জানতে চান, সমস্যাটি শুধু তাদের নাকি সবার। এক্স-এর একটি পোস্টেই মাত্র কয়েক মিনিটে প্রায় এক লাখের কাছাকাছি ভিউ হয়, যেখানে ব্যবহারকারীরা তাদের বিভ্রান্তির কথা তুলে ধরেন।
কেন এই ব্ল্যাকআউট? বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
একটি বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মের এভাবে হঠাৎ ধসে পড়া কেবল যোগাযোগের সংকট তৈরি করে না, বরং ডিজিটাল অর্থনীতির ওপরও বড় আঘাত হানে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে ফেসবুক-ভিত্তিক ব্যবসা বা এফ-কমার্স (F-commerce) বিপুল জনপ্রিয়, সেখানে কয়েক ঘণ্টার স্থবিরতা কোটি কোটি টাকার ক্ষতি ডেকে আনে।
এই বিপর্যয় এবং এর কারিগরি দিক নিয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে যোগাযোগ করা হয় বেসিস (BASIS)-এর সাবেক সভাপতি এবং আইএসপিএবি (ISPAB)-এর সাবেক সহ-সভাপতি আলমাস কবীর-এর সাথে।
এই গভীর উদ্বেগের কথা জানিয়ে তিনি বলেন:
তিনি আরও যোগ করেন, "আমাদের দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা যেভাবে ফেসবুকের ওপর নির্ভরশীল, এই ধরনের সাময়িক বিপর্যয়ও তাদের বড় আর্থিক ক্ষতির মুখে ফেলে। ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব এবং বিকল্প দেশীয় প্ল্যাটফর্ম বা শক্তিশালী ওয়েবসাইট অবকাঠামো গড়ে তোলার সময় এখন এসেছে, যাতে একটি আন্তর্জাতিক অ্যাপ বন্ধ হলে পুরো ব্যবসা খাত স্থবির হয়ে না পড়ে।"
মেটার প্রতিক্রিয়া ও পূর্বের ইতিহাস
বিপর্যয় চলাকালীন মেটার যোগাযোগ প্রধান অ্যান্ডি স্টোন এক্সে একটি সংক্ষিপ্ত পোস্টে জানান, তারা সমস্যাটি সম্পর্কে অবগত আছেন এবং এটি সমাধানে দ্রুত কাজ করছেন। মেটার বাণিজ্যিক টুলগুলোর জন্য স্ট্যাটাস পেজ থাকলেও সাধারণ ব্যবহারকারীদের অ্যাপের জন্য কোনো লাইভ স্ট্যাটাস পেজ না থাকায় বিভ্রাটের প্রথম দিকে চরম বিভ্রান্তি তৈরি হয়।
চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকেও ফেসবুকের কিছু পরিষেবায় আংশিক বিঘ্ন ঘটেছিল। সে সময় মেটা একে তাদের কম্পিউটিং প্ল্যাটফর্মের একটি ‘ত্রুটিপূর্ণ কনফিগারেশন পরিবর্তন’ (Faulty Configuration Change) হিসেবে উল্লেখ করেছিল। তবে শুক্রবারের এই বড় ধাক্কা প্রমাণ করে, কোটি কোটি মানুষের ডেটা ও যোগাযোগের নিরাপত্তা বজায় রাখতে মেটার মতো প্রযুক্তি জায়ান্টদের অবকাঠামো আরও সুদূরপ্রসারী ও স্থিতিস্থাপক (Resilient) করা কতটা জরুরি।