যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি সেমিকন্ডাক্টর নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে নতুন উদ্যোগ
অস্টিন, টেক্সাসে সফল সূচনার পর বিএসআইএ সিলিকন রিভার যুক্তরাষ্ট্র রোডশো ২০২৬-এর পরবর্তী গন্তব্য ছিল অ্যারিজোনার ফিনিক্স, যা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের দ্রুততম বিকাশমান সেমিকন্ডাক্টর অঞ্চলগুলোর একটি এবং সিলিকন ডেজার্ট নামে পরিচিত।
৭ জুন অনুষ্ঠিত ব্রেইনগেইন রিসেপশন-এ ৩০টিরও বেশি বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্বকারী ৮০ জনেরও বেশি প্রবাসী বাংলাদেশি (এনআরবি) সেমিকন্ডাক্টর পেশাজীবী অংশগ্রহণ করেন। তাদের সম্মিলিত অভিজ্ঞতা ১৬০০ বছরেরও বেশি।
স্ট্যাটস চিপপ্যাক-এর বিজনেস ডেভেলপমেন্ট পরিচালক নকিবুল ইসলাম তপন অনুষ্ঠানের শুরুতে বিএসআইএ প্রতিনিধিদলকে স্বাগত জানান। তিনি অ্যারিজোনার দ্রুত সম্প্রসারিত সেমিকন্ডাক্টর অর্থনীতি, বিশেষ করে অ্যাডভান্সড প্যাকেজিং, টেস্টিং এবং উৎপাদন খাতের বিকাশের ওপর আলোকপাত করেন এবং বাংলাদেশ ও বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার আহ্বান জানান।
বিএসআইএ সভাপতি এম. এ. জব্বার প্রবাসী সম্প্রদায়কে ধন্যবাদ জানিয়ে বাংলাদেশের সেমিকন্ডাক্টর যাত্রায় সক্রিয় অংশগ্রহণের আহ্বান জানান। তিনি উল্লেখ করেন যে, শিল্প, শিক্ষা, উদ্যোক্তা, নীতিনির্ধারক এবং বৈশ্বিক বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব।

অ্যারিজোনা বাংলাদেশি সেমিকন্ডাক্টর সোসাইটির (এবিএসএস)-এর পক্ষ থেকে প্রবীণ প্রকৌশলী জাবির এবং ড. রিয়াদ তাদের স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম তুলে ধরেন। বর্তমানে অ্যারিজোনার ১০ জনেরও বেশি সেমিকন্ডাক্টর পেশাজীবী অনলাইন প্রশিক্ষণ, মেন্টরিং এবং প্রযুক্তিগত দিকনির্দেশনার মাধ্যমে বাংলাদেশের তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করছেন। উভয় পক্ষের অংশগ্রহণ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
পারডু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং সিলিকন রিভার উদ্যোগ-এর প্রধান স্থপতি অধ্যাপক মুহাম্মদ মুস্তাফা হোসেন বাংলাদেশের সেমিকন্ডাক্টর ভিশন, কৌশল, অগ্রগতি এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন। তিনি অংশগ্রহণকারীদের সাহসী চিন্তা, সমন্বিত উদ্যোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় লক্ষ্য বাস্তবায়নের আহ্বান জানান। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সাফল্য নির্ভর করবে মেধা, উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের সক্রিয় সম্পৃক্ততার উপর।
আইবিএম-এর প্রবীণ প্রযুক্তি নেতা ড. রেজাউল ইসলাম পাভেল এজেনটিক এআই-এর ক্রমবর্ধমান ভূমিকা এবং বাংলাদেশকে এই পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপস্থাপনা দেন। তিনি দেখান কিভাবে স্বয়ংক্রিয় ও বুদ্ধিমান এআই এজেন্ট ভবিষ্যতে সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, ব্যবসা পরিচালনা এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের গতিপথ পরিবর্তন করবে।
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে লস অ্যাঞ্জেলেসস্থ বাংলাদেশ কনস্যুলেটের কনসাল জেনারেল কাজী মোহাম্মদ জাবেদ ইকবাল সেমিকন্ডাক্টর উন্নয়ন, প্রযুক্তিভিত্তিক প্রবৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রতি সরকারের দৃঢ় সমর্থনের কথা তুলে ধরেন।
মাগরিবের নামাজ ও নৈশভোজের পর ক্যকাটাস ম্যাটেরিয়ালস, চিপ মেন্টরস, ডাইন্যামিক সলিউশন্স ইনোভেটরস (ডিএসআই), আইটেস্ট বাংলাদেশ, নিউরাল সেমিকন্ডাক্টর এবং উলকাসেমি তাদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, ব্যবসায়িক পরিকল্পনা এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার সম্ভাবনা উপস্থাপন করে।
অনুষ্ঠানের সমাপনী বক্তব্য প্রদান করেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব অ্যারিজোনা (বিএএজেড) -এর সভাপতি এবং নিউ রেলিক-এর লিড সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার সৈয়দ জাকী হুদা। তিনি বিএসআইএ, সিলিকন রিভার, ব্রেইনগেইন এবং অ্যারিজোনার বাংলাদেশি প্রযুক্তি সম্প্রদায়কে এমন একটি তাৎপর্যপূর্ণ আয়োজনের জন্য অভিনন্দন জানান। তিনি উল্লেখ করেন যে, প্রবাসী বাংলাদেশিদের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা এবং নেটওয়ার্ককে জাতীয় উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করতে হলে ধারাবাহিক সম্পৃক্ততা, মেন্টরশিপ এবং সহযোগিতার বিকল্প নেই। তিনি অ্যারিজোনা ও বাংলাদেশের মধ্যে ভবিষ্যতে আরও ঘনিষ্ঠ অংশীদারিত্বের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। অনুষ্ঠানটি সফলভাবে আয়োজনের নেতৃত্ব দেন প্রবীণ সেমিকন্ডাক্টর পেশাজীবী নূর জামিল সারওয়ার।
৮ জুন প্রতিনিধিদল অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটি (এএসইউ) পরিদর্শন করে এবং বিশ্ববিদ্যালয় নেতৃত্বের সঙ্গে তিন ঘণ্টাব্যাপী ফলপ্রসূ বৈঠকে অংশগ্রহণ করে।
আলোচনার ফলস্বরূপ বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য অধিক ভর্তি সুযোগ, ইন্টার্নশিপ, গবেষণা সহযোগিতা এবং ক্রেস্ট কর্মসূচির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পৃক্ততা বৃদ্ধির বিষয়ে উভয় পক্ষ নীতিগতভাবে একমত হয়।
অধ্যাপক মুস্তাফা হোসেন বাংলাদেশ ও এএসইউ -এর মধ্যে আগামী দশ বছরের সহযোগিতার একটি বিস্তারিত রোডম্যাপ উপস্থাপন করেন। এতে শিক্ষার্থী বিনিময়, গবেষণা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, শিক্ষক সম্পৃক্ততা, ইন্টার্নশিপ, দক্ষ মানবসম্পদ গঠন এবং যৌথ উদ্ভাবন কার্যক্রমের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল। প্রস্তাবনাটি এএসইউ-এর অ্যাসোসিয়েট ভাইস প্রভোস্ট জেফ গসসহ বিশ্ববিদ্যালয় নেতৃত্বের উচ্চ প্রশংসা অর্জন করে। এএসইউ নেতৃত্ব আগামী মাসে ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য বিইএআর সামিট ২০২৬-এ অংশগ্রহণের আমন্ত্রণও গ্রহণ করে।
অ্যারিজোনা সফরের শেষ পর্যায়ে প্রতিনিধিদল বুয়েট-এর প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং সফল সেমিকন্ডাক্টর উদ্যোক্তা ড. রফিকুল ইসলামের প্রতিষ্ঠিত ক্যাকটাস ম্যাটেরিয়ালস পরিদর্শন করে।
উভয় পক্ষ বাংলাদেশের দ্রুত বিকাশমান মেধাভিত্তিক জনশক্তির প্রশংসা করেন এবং ড. ইসলাম বিশ্বের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ সেমিকন্ডাক্টর কেন্দ্র হওয়ার প্রতিযোগিতা সম্পর্কে তার মূল্যবান অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, বিশ্বব্যাপী বহু দেশ বর্তমানে সেমিকন্ডাক্টর খাতে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার জন্য প্রতিযোগিতায় নেমেছে এবং বাংলাদেশকে দ্রুত, সমন্বিত ও কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
ফিনিক্স অধ্যায় সমাপ্ত করে প্রতিনিধিদল সিলিকন ভ্যালির উদ্দেশে রওয়ানা হয়, যেখানে সিলিকন রিভার যুক্তরাষ্ট্র রোডশো ২০২৬-এর পরবর্তী কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা কেন্দ্র এবং প্রবাসী বাংলাদেশি পেশাজীবীদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক ও ব্রেইনগেইন কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হবে।
বাংলাদেশের সেমিকন্ডাক্টর যাত্রা এখন আর কেবল একটি স্বপ্ন নয়; এটি ধীরে ধীরে একটি সমন্বিত জাতীয় আন্দোলনে পরিণত হচ্ছে, যেখানে দেশের ভেতরের মেধা, শিল্প এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশি পেশাজীবীরা একসাথে ভবিষ্যৎ নির্মাণে কাজ করছেন।