চীনে সুপারকম্পিউটারের ১০ পেটাবাইট তথ্য হ্যাকারদের নিয়ন্ত্রণে
নীরবভাবে, কয়েক মাস ধরে চলে গেছে তথ্য চুরি। হঠাৎ করেই প্রকাশ্যে আসে চমকপ্রদ এক সাইবার ঘটনার খবর। চীনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারকম্পিউটার কেন্দ্র থেকে ১০ পেটাবাইটের বেশি সংবেদনশীল তথ্য উধাও হওয়ার দাবি উঠেছে। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শুধু তথ্য ফাঁস নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় সতর্কবার্তা।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক অজ্ঞাত হ্যাকার চীনের রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে পরিচালিত সুপারকম্পিউটার কেন্দ্র থেকে বিপুল পরিমাণ তথ্য সংগ্রহ করেছে। এতে রয়েছে প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত গোপন নথি, ক্ষেপণাস্ত্রের নকশা এবং জটিল প্রযুক্তিগত সিমুলেশন।
তথ্যের পরিমাণ বোঝাতে বলা হয়েছে, ১ পেটাবাইট সমান ১ হাজার টেরাবাইট। যেখানে একটি আধুনিক ল্যাপটপে গড়ে ১ টেরাবাইট তথ্য রাখা যায়, সেখানে এই চুরি হাজার হাজার ল্যাপটপের সমান তথ্য।
বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, এই তথ্য তিয়ানজিনে অবস্থিত জাতীয় সুপারকম্পিউটার কেন্দ্র থেকে নেওয়া হয়েছে। ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কেন্দ্রটি চীনের প্রথম সুপারকম্পিউটার হাব। বর্তমানে এটি ৬ হাজারের বেশি গ্রাহককে সেবা দেয়। এর মধ্যে রয়েছে উন্নত গবেষণা প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি সংস্থা এবং প্রতিরক্ষা খাতের সংস্থা। গুয়াংঝৌ, শেনজেন ও চেংদুসহ আরও কয়েকটি বড় শহরেও এমন কেন্দ্র রয়েছে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, তথ্য চুরি একদিনে হয়নি। ‘ফ্লেমিংচায়না’ নামে পরিচিত হ্যাকার ফেব্রুয়ারির শুরুতে একটি গোপন টেলিগ্রাম চ্যানেলে তথ্যের নমুনা প্রকাশ করে। নমুনা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সেখানে চীনা ভাষায় ‘গোপন’ চিহ্নিত নথি, প্রযুক্তিগত ফাইল, সিমুলেশন এবং সামরিক সরঞ্জামের নকশা রয়েছে।
ফাঁস হওয়া তথ্যে মহাকাশ প্রকৌশল, সামরিক গবেষণা, জৈব তথ্যবিজ্ঞান এবং ফিউশন সিমুলেশনের তথ্যও অন্তর্ভুক্ত। এগুলো চীনের বিমান শিল্প করপোরেশন, বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ নির্মাতা সংস্থা এবং জাতীয় প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত।
সম্পূর্ণ তথ্যভান্ডারটি বিক্রির জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে, যার মূল্য কয়েক লাখ ডলার হতে পারে। ছোট অংশের নমুনাও বিক্রি হচ্ছে, লেনদেনের জন্য ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে এই দাবিগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা এখনো সম্ভব হয়নি।
মার্কিন সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান সেন্টিনেলওয়ান–এর পরামর্শক ডাকোটা ক্যারি বলেন, সুপারকম্পিউটার কেন্দ্রের জন্য এই ধরনের তথ্য স্বাভাবিক। বড় গণনামূলক কাজ, জটিল গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রমে এসব তথ্য ব্যবহৃত হয়। নমুনাগুলোর বিস্তৃতি কেন্দ্রটির বহুমুখী ব্যবহারই প্রমাণ করে।
যেভাবে হয়েছে তথ্য চুরি
প্রাথমিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হ্যাকার অত্যাধুনিক কৌশলের বদলে ব্যবস্থার দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়েছে। একটি আপসকৃত ভিপিএন ডোমেইনের মাধ্যমে সে প্রবেশাধিকার পায়। এরপর স্বয়ংক্রিয় সরঞ্জাম ব্যবহার করে প্রায় ছয় মাস ধরে ধাপে ধাপে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
সবচেয়ে কৌশলী দিক ছিল তথ্য সরানোর পদ্ধতি। একবারে বড় পরিমাণে তথ্য পাঠানো হয়নি, বরং ছোট ছোট অংশে স্থানান্তর করা হয়েছে। ফলে নিরাপত্তা ব্যবস্থার নজর এড়িয়ে যাওয়া সহজ হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই কৌশল নতুন নয়, তবে কার্যকারিতা বাস্তবসম্মত।
এই ঘটনা সত্য প্রমাণিত হলে চীনের ডিজিটাল অবকাঠামোর গভীর দুর্বলতা সামনে আসবে। বিশেষ করে যখন দেশটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উন্নত প্রযুক্তিতে নিজের অবস্থান শক্ত করতে কাজ করছে, তখন এমন সাইবার হামলা বড় ধাক্কা হিসেবে গণ্য হবে।
সূত্র : এনডিটিভি