স্যামসাং গ্যালাক্সি জেড ট্রাই ফোল্ড : ভাঁজযোগ্য ফোনের ধারণাই বদলে গেল

Tech World Desk

টেক ওয়ার্ল্ড ডেস্ক

বৃহস্পতিবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫, ১৫:৫৩

স্যামসাং গ্যালাক্সি জেড ট্রাই ফোল্ড : ভাঁজযোগ্য ফোনের ধারণাই বদলে গেল

নতুন কিছু দেখলে প্রথম প্রতিক্রিয়া সবার প্রায় একই রকম— এটা কি সত্যিই দরকার ছিল? নাকি শুধু দেখানোর জন্য বানানো আরেকটা প্রযুক্তিগত কসরত? স্যামসাং গ্যালাক্সি জেড ট্রাইফোল্ড প্রথম দেখায় ঠিক এমন প্রশ্নই মাথায় আনে। তিন ভাঁজের ফোন। পকেটে রাখা যায় এমন ১০ ইঞ্চির ট্যাবলেট। অবাক হচ্ছেন? কিন্তু হাতে নিয়ে কিছু সময় ব্যবহার করার পর বোঝা যায়— এই ফোন শুধু চমক নয়! এটা ভাঁজযোগ্য ফোনের ধারণাটাকেই নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।

প্রথম দেখায় অবিশ্বাস

ভাঁজযোগ্য ফোন আমরা দেখেছি। বাজারে আছে। অনেকদিন ধরেই আছে। ফোন বন্ধ করলে সাধারণ ফোনের মতো। খুললে বড় স্ক্রিন। সাধারণত ৭.৬ বা ৮ ইঞ্চির কাছাকাছি। দেখতে ভালো, কাজেও আসে। কিন্তু কোথাও একটা অপূর্ণতা ছিল। ভিডিও দেখার সময়, গেম খেলার সময় কিংবা ওয়েব ব্রাউজিংয়ে।

গ্যালাক্সি জেড ট্রাইফোল্ড সেই জায়গাটায় আঘাত করেছে। এটি একবার নয়, দুইবার ভাঁজ হয়। খুললে পাওয়া যায় প্রায় ১০ ইঞ্চির একটি পূর্ণাঙ্গ ট্যাবলেট। পকেট থেকে বের করা যায়। আবার ভাঁজ করে রাখা যায়।

শুরুতে অনেকেই বলবেন, এটা অপ্রয়োজনীয় বা হাস্যকর। কিন্তু বাস্তব ব্যবহারে ছবিটা একটু আলাদা।

ট্রাইফোল্ড মানে কী আলাদা?

এই ফোনের মূল পার্থক্য এর স্ক্রিনের আকার নয়। পার্থক্য এর আকৃতিতে। সাধারণ ফোল্ড ফোন খুললে স্ক্রিন হয় প্রায় বর্গাকৃতি।

ট্রাইফোল্ডে স্ক্রিনটি আয়তাকার। ১৬:১০ অনুপাতের কাছাকাছি। ফলে ভিডিও সত্যিকার অর্থেই বড় লাগে। ইউটিউব, নেটফ্লিক্স, গেম— সবকিছুতেই পার্থক্য চোখে পড়ে।

একই ভিডিও সাধারণ ফোনে। তারপর সাধারণ ফোল্ডে। শেষে ট্রাইফোল্ডে। তুলনা করলে বোঝা যায়, কেন এই ডিজাইন গুরুত্বপূর্ণ।

আগেও কি ট্রাইফোল্ড ছিল?

হ্যাঁ। হুয়াওয়ের মেট এক্সটি ছিল। ২০২৪ সালে সেটি দেখা গেছে। তবে সেটির ভাঁজ ছিল ‘জেড’ আকৃতির। স্ক্রিন বাইরের দিকে ভাঁজ হতো। ফলে স্ক্রিন সব সময়ই খোলা থাকত। ঝুঁকি ছিল বেশি।

স্যামসাং ভিন্ন পথ নিয়েছে। এটি ‘ইউ’ আকৃতিতে ভাঁজ হয়। বাইরে একটি কভার ডিসপ্লে। ভেতরে মূল ডিসপ্লে, যেটি দুইবার ভাঁজ হয়। ব্যবহার করার সময় কভার স্ক্রিন পেছনে পড়ে থাকে। নিরাপত্তা বেশি। যদিও কিছু ক্ষেত্রে অসুবিধাও আছে। ভাল-মন্দ মিলিয়েই এই নকশা।

হাতে ধরলে কেমন লাগে?

কাগজে-কলমে এই ফোন ভয়ংকর মনে হয়। ১২.৯ মিলিমিটার পুরু। ওজন ৩০০ গ্রামের বেশি। শুনলেই মনে হয়— এটা তো ইট।

কিন্তু হাতে নিলে অনুভূতি ততটা ভয়াবহ নয়। অবশ্যই এটি চিকন নয়। হালকা নয়। তবে অস্বস্তিকরও নয়।

একটি তথ্য মনে রাখা দরকার। এটি আগের অনেক জেড ফোল্ডের চেয়েও পাতলা। জেড ফোল্ড ১ থেকে ৫, সবকটির চেয়ে পাতলা। তাই বিষয়টা পুরোপুরি আপেক্ষিক।

বন্ধ অবস্থায় ফোনটি একটু ভারী লাগে। কিন্তু খোলার পর দৃশ্য বদলে যায়।

খুললে বদলে যায় অভিজ্ঞতা

পুরো খুললে ফোনটি হয়ে যায় ৩.৯ মিলিমিটার পুরু। হাতে নেওয়া ট্যাবলেটের মতো। ওজন তখন আর তেমন বোঝা যায় না। সাধারণ ১০ ইঞ্চির ট্যাবলেটের ওজন প্রায় ৫০০ গ্রাম। সেখানে ৩০৯ গ্রাম হঠাৎই হালকা মনে হয়।

পাতলা ও প্রশস্ত হওয়ায় হাতে ধরে রাখা সহজ। এই জায়গায় এসে বোঝা যায়— এই ফোনের আসল শক্তি কোথায়।

ব্যাটারি ও চার্জিং 

এত পাতলা শরীরে ব্যাটারি রাখা সহজ নয়। এখানে ব্যাটারি ৫৬০০ এমএএইচ। তিন ভাগে ভাগ করা। এটি স্যামসাংয়ের সবচেয়ে বড় ফোল্ডেবল ব্যাটারি। কিন্তু ১০ ইঞ্চির স্ক্রিনের জন্য এটি আসলে কম।

এখানে সিলিকন-কার্বন ব্যাটারি থাকলে আরও ভালো হতো। ভালো দিক হলো চার্জিং। ৪৫ ওয়াট ফাস্ট চার্জিং। বক্সে চার্জার আছে। এটি বিরল ঘটনা। 

১৫ ওয়াট ওয়্যারলেস চার্জিংও আছে। আইপি৪৮ রেটিংও রাখা হয়েছে।

পারফরম্যান্স ও ক্যামেরা

ভেতরে আছে স্ন্যাপড্রাগন ৮ এলিট (গ্যালাক্সির জন্য)। সর্বশেষ নয়। তবে একেবারেই দুর্বল নয়। ১৬ জিবি র‍্যাম ও ৫১২ জিবি স্টোরেজ।

ক্যামেরা মূলত জেড ফোল্ড ৭-এর মতো। ২০০ মেগাপিক্সেল প্রাইমারি ক্যামেরা। তবে বাকি ক্যামেরাগুলো গড়পড়তা। ১০ মেগাপিক্সেল জুম ও ১২ মেগাপিক্সেল আলট্রাওয়াইড।

ফ্ল্যাগশিপ দামের তুলনায় এখানে আরও ভালো ক্যামেরা আশা করা যেত।

বড় স্ক্রিনে নতুন ব্যবহার

এই ফোনে সফটওয়্যারই আসল নায়ক। ফাইল ম্যানেজারে একসঙ্গে তিন কলাম দেখা যায়। ইউটিউবে ভিডিও চলতে থাকে, পাশে কমেন্ট স্ক্রল করা যায়। ওয়েব ব্রাউজিংয়ে জায়গার অভাব নেই।

একসঙ্গে তিনটি অ্যাপ চালানো যায়। প্রতিটা অ্যাপ শ্বাস নেওয়ার জায়গা পায়। আর সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয়— এই একমাত্র স্যামসাং ফোন যেখানে মনিটর ছাড়াই স্যামসাং ডেক্স চালানো যায়। কিবোর্ড-মাউস লাগিয়ে পুরো ডেস্কটপ অভিজ্ঞতা।

ফোন খোলার জন্য একটি ছোট লিপ রাখা হয়েছে। ধরতে সুবিধা। ম্যাগনেট শক্ত। ভাঁজ খুলে বন্ধ করা মসৃণ। ভুলভাবে ভাঁজ করতে চাইলে ফোন নিজেই সতর্ক করে। ভাইব্রেশন দেয়।

সীমাবদ্ধতা কোথায়?

মাঝের স্ক্রিন সবচেয়ে নাজুক। দুই জায়গায় ভাঁজ। দুই রকম বক্রতা। ভাঁজের দাগ চোখে পড়ে। বাম দিকের দাগ একটু কম। ডান দিকের বেশি।

ভেতরের স্ক্রিনের উজ্জ্বলতা ১৬০০ নিট। বাইরে ২৬০০। রোদে ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে তো?

দর-দাম

দুটি স্ক্রিন, দ্বিগুণ যন্ত্রাংশ ফলে দামও দ্বিগুণ। কোরিয়া থেকে আমদানি করা ইউনিটের দাম প্রায় ২৫০০ ডলার। যুক্তরাষ্ট্রে ২৫০০ থেকে ৩০০০ ডলারের মধ্যে হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এটি সবার জন্য নয়। কিন্তু যারা জানেন, কেন কিনছেন— তাদের জন্য হয়তো যুক্তিসংগত।

মার্কেস ব্রাউনলির রিভিউ অবলম্বনে