‘কিউএলইডি‘ ‘বনাম ‘ওএলইডি’ : কোন প্রযুক্তির টিভি বেছে নেবেন
নতুন টিভি কেনার পরিকল্পনা নিয়ে বাজারে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে আপনার চোখে পড়বে ওএলইডি (OLED) এবং কিউএলইডি (QLED)-এর জাদুময় নামের দিকে। HDR, 120Hz এবং HDMI 2.2-এর মতো টার্ম শুনলে প্রথমে একটু বিভ্রান্তি লাগতে পারে। তবে আসল পার্থক্য টেকনোলজিতে, এবং তা বোঝা গেলে সঠিক টিভি নির্বাচন সহজ হয়ে যাবে। ওএলইডি আপনাকে দিবে নিখুঁত কালো ও অসাধারণ চিত্রমান, আর কিউএলইডি-এর উজ্জ্বলতা ও বড় স্ক্রিনের সহজলভ্যতা অনেকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। চলুন বিস্তারিতভাবে জেনে নিই কোন প্রযুক্তির টিভি ২০২৫ সালে আপনার জন্য সেরা।
ওএলইডি ও কিউএলইডি প্রযুক্তি
ওএলইডি মানে ‘অর্গানিক লাইট ইমিটিং ডায়ড’ এবং কিউএলইডি, বিশেষত স্যামসাং-এর সংজ্ঞায়,‘কোয়ন্টাম ডট এলইডি টিভি’। মূল পার্থক্য হলো ওএলইডি একটি এমিসিভ (emissive) ডিসপ্লে, যেখানে প্রতিটি পিক্সেল নিজেই আলো উৎপন্ন করে। অন্যদিকে কিউএলইডি একটি ট্রান্সমিসিভ (transmissive) এলসিডি টিভি, যা একটি এলইডি ব্যাকলাইটের মাধ্যমে কাজ করে এবং সেই আলোকে কোয়ান্টাম ডট ফিল্ম দিয়ে আরও রঙিন করা হয়।
উভয় প্রযুক্তি স্মার্ট টিভি হিসেবে পাওয়া যায় এবং উভয়ই উজ্জ্বল রঙ এবং নিখুঁত ছবি দেখাতে সক্ষম। তবে বাস্তবে দেখা যায়, ওএলইডি এবং কিউএলইডি-এর অভিজ্ঞতা একেবারে আলাদা।
কিউএলইডি: মূলত একটি উন্নত এলসিডি
কিউএলইডি আসলে সাধারণ এলসিডি টিভির একটি উন্নত সংস্করণ। কোয়ান্টাম ডট মাইক্রোস্কোপিক অণু, যা আলোয় আঘাত করলে নিজের আলোর রঙ উৎপন্ন করে। কিউএলইডি-তে এই ডটগুলো একটি ফিল্মে থাকে এবং এলসিডি ব্যাকলাইট দ্বারা আলোকিত হয়। আলোর পথ এলসিডি স্তরের মধ্য দিয়ে যেতে গিয়ে চূড়ান্ত চিত্র তৈরি হয়।
স্যামসাং ২০১৫ সাল থেকে কোয়ান্টাম ডট ব্যবহার করছে এবং ২০১৭ সালে কিউএলইডি ব্র্যান্ডিং শুরু করে। বর্তমানে কিউএলইডি আরও উন্নত হয়েছে বলে দাবি করা হয়, তবে বাস্তবে উন্নতির মূল কারণ কোয়ান্টাম ডট নয়, বরং মিনি-এলইডি ব্যাকলাইট, ফুল-অ্যারে লোকাল ডিমিং এবং উন্নত ভিউইং অ্যাঙ্গেল। অন্য ব্র্যান্ড যেমন টিসিএল, ভিজিও এবং হাইসেন্সও কোয়ান্টাম ডট ব্যবহার করে, তবে তারা কিউএলইডি নামে বাজারজাত করে না।
ওএলইডি: এলসিডি নয়, একেবারেই ভিন্ন
ওএলইডি টিভিতে আলো উৎপাদন হয় পিক্সেল দ্বারা নিজেই। ফলে নির্দিষ্ট পিক্সেল বন্ধ করলে নিখুঁত কালো পাওয়া যায় এবং কনট্রাস্ট প্রায় অসীম হয়। LG, Sony, Sharp এবং Samsung ওএলইডি টিভি বাজারে নিয়ে আসে। সাম্প্রতিক ওএলইডি প্রযুক্তি যেমন QD-ওএলইডি বা MLA (Micro Lens Array) ওএলইডি, উজ্জ্বলতা এবং রঙের মান আরও উন্নত করেছে।
ওএলইডি-এর বৈশিষ্ট্যগুলো কিউএলইডি এবং এলসিডি-এর তুলনায় অনেকাংশে চমকপ্রদ। পুরো স্ক্রিনে প্রায় সমান উজ্জ্বলতা থাকে, কোনো ব্যাকলাইট ফ্লিকারের সমস্যা নেই, এবং কোনো কোণ থেকে দেখলেও রঙ বা কনট্রাস্ট কমে না।
ওএলইডি এবং কিউএলইডি’র তুলনা
কালো এবং কনট্রাস্ট: ওএলইডি-এর পিক্সেল নিজেই আলোকিত হয়, তাই কালো নিখুঁত। কিউএলইডি-এ ব্যাকলাইট থাকায় কিছুটা ধূসর বা ব্লুমিং দেখা দিতে পারে।
উজ্জ্বলতা: কিউএলইডি টিভি সাধারণত ওএলইডি-এর চেয়ে উজ্জ্বল। উজ্জ্বল ঘরে বা HDR কনটেন্টে সুবিধা থাকে।
স্ক্রিন ইউনিফর্মিটি ও দৃষ্টি কোণ: ওএলইডি প্রায় সব কোণ থেকে চমৎকার মানের ছবি দেয়, কিউএলইডি/ এলইডি’র ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা থাকে।
রেজোলিউশন এবং রঙ: উভয়ই 4K এবং 8K রেজোলিউশন দিতে সক্ষম। QD-ওএলইডি রঙের মান আরও উন্নত।
স্ক্রিন সাইজ এবং দাম: ওএলইডি সাধারণত 42–97 ইঞ্চি পর্যন্ত আসে। ৭৭ ইঞ্চি ওএলইডি-এর দাম ২,২০০ ডলার থেকে শুরু। কিউএলইডি টিভি আরও ছোট এবং বড় আকারে পাওয়া যায় এবং ৭৫ ইঞ্চি কিউএলইডি তুলনামূলক সস্তা।
ওএলইডি বার্ন-ইন সম্পর্কে জানা জরুরি
বার্ন-ইন (Burn-in) ঘটে যখন একটি স্থায়ী ইমেজ যেমন চ্যানেল লোগো, নিউজ টিকার বা স্কোরবোর্ড দীর্ঘ সময় একই জায়গায় থাকে। ওএলইডি কিছুটা বেশি burn-in-এর ঝুঁকিতে থাকে, তবে সাধারণ ব্যবহারকারীর জন্য এটি তেমন সমস্যা নয়। নিয়মিত প্রোগ্রাম পরিবর্তন করলে burn-in হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম।
ভবিষ্যতের প্রযুক্তি
স্যামসাং এবং LG নতুন টেকনোলজিতে কাজ করছে। Emissive কিউএলইডি বা Micrওএলইডি-এর মাধ্যমে ওএলইডি-এর নিখুঁত কালো, উজ্জ্বলতা এবং রঙের সমন্বয় সম্ভব। Micrওএলইডি ইতিমধ্যেই বাজারে আছে, তবে দাম প্রাথমিকভাবে লক্ষাধিক ডলারের বেশি। এই প্রযুক্তিগুলো ওএলইডি এবং কিউএলইডি-এর সীমা আরও এগিয়ে দেবে।
২০২৫ সালে সেরা টিভি
ছবির মান ও কনট্রাস্টের দিক থেকে ওএলইডি সবসময় কিউএলইডি-এর চেয়ে এগিয়ে। কিউএলইডি-এর সুবিধা আছে বড় স্ক্রিনে এবং উজ্জ্বল কক্ষে, তবে ওএলইডি-এর নিখুঁত কালো, প্রাণবন্ত রঙ এবং সর্বাধিক ভিউইং অ্যাঙ্গেল তরুণদের জন্য ছবি দেখার অভিজ্ঞতাকে অন্য মাত্রায় নিয়ে যায়।
যদি ছবি ও কনট্রাস্ট গুরুত্বপূর্ণ হয় তাহলে ওএলইডি-ই সেরা পছন্দ। বাজেট এবং বড় স্ক্রিন গুরুত্বপূর্ণ হলে কিউএলইডি হতে পারে যৌক্তিক বিকল্প।
সূত্র: সিনেট