বৃহস্পতিবার

ঢাকা, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

সর্বশেষ


মুখোমুখি

শূন্য থেকে মুসনাদ ই আহমেদের স্কাইটেকের স্বপ্নযাত্রা

প্রকাশ: ১৬ ডিসেম্বর ২০২৩, দুপুর ১১:০৭

টেকওয়ার্ল্ড প্রতিবেদক

Card image

ছবি: টেকওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ

২০১৬ সাল। হাঠাৎ দেশের সব কলসেন্টারের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। সে ধাক্কা লাগে মুসনাদের কল সেন্টারেও। অল্প সময়ে ভেঙে যায় সাজানো স্বপ্নের সম্ভাবনাময় সিঁড়িগুলো। এক ধাক্কায় ৪৫ জন কর্মী থেকে নেমে আসে ৯ জনে। যাদেরকে খুব যত্ন করে হাতে ধরে প্রশিক্ষণ দিয়ে নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সহযোদ্ধা হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন, দুর্দিনে তারাও মুসনাদকে ছেড়ে চলে যান।

সবারই বড় হওয়ার ইচ্ছে থাকে। স্বপ্ন থাকে নিজেকে ছাড়িয়ে যাবার। কিন্তু আমরা ক'জনই বা পারি সেই স্বপ্নকে ছুঁ'তে। ক'জনই বা পারি জীবনের হাজারো চড়াই-উতরাইকে যোগ্যতা, কর্মপ্রচেষ্টা, দক্ষতা ও পরিশ্রম দিয়ে জয় করতে! কিন্তু এমন অনেকে আছেন যারা দ্রুত সময়ের মধ্যে নিজের বুদ্ধিমত্তা ও নিরলস কঠোর পরিশ্রম দিয়ে সব প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে ঘুরে দাঁড়াতে পারেন। পড়ে গিয়েও পারেন উঠে দাঁড়াতে। পারেন এগিয়ে যেতে। আর যারা এটা পারেন, তারা হয়ে উঠেন অন্যের জন্য অনন্য উদাহরণ। হয়ে উঠেন তরুণদের জন্য এগিয়ে যাবার অনুপ্রেরণার উৎস।

আজ টেকওয়ার্ল্ড বাংলাদেশের পাঠকদের জন্য এমনই একজন সফল তরুণ উদ্যোক্তার ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প তুলে ধরছি। আমরা বিশ্বাস করি, এই উদ্যোক্তা দেশের লাখো তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য অনুপ্রেরণা।

তিস্তা নদীর তীরে দুরন্ত শৈশব
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার তিস্তা নদীর তীরে অবস্থিত গান্নারপার গ্রামে শিক্ষক পরিবারে জন্ম মুসনাদ ই আহমেদের। বাবা পেশায় ছিলেন স্কুল শিক্ষক। মা গৃহিণী। দুই বোন ও এক ভাই। তিন ভাই-বোনের মধ্যে মুসনাদ সবার ছোট। তিস্তা নদীর তীরে দুরন্তপনায় কাটে তার শৈশবের স্বর্ণালী দিনগুলো।

মুসনাদ বলেন, বাবা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে ব্যাচেলর অব কমার্স (বিকম) পাস করেছেন। ১৯৭১ সালে মৃক্তিযুদ্ধেও অংশগ্রহণ করেছেন। নিজের আদর্শ ও নীতিতে সৎ শিক্ষক বাবা লোভনীয় সরকারি চাকরির সুযোগ পেয়েও সেখানে যোগ দেননি। স্কুলে শিক্ষকতা করেই কোনরকমে সংসার চালাতেন।

কৈশোরের দুরন্তপনা
গান্নারপার প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়া শেষ করে গঙ্গাচড়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হন মুসনাদ। শিক্ষক বাবার সাথে তার সম্পর্ক ছিল বন্ধুসুলভ। বাবার তত্ত্বাবধানে কৈশোরের দিনগুলো কাটে পড়াশোনা ও খেলা-ধুলায়। ২০০২ সালে একই বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে পাস করেন তিনি।

তাকে নিয়ে বাবা-মার স্বপ্নের কথা বলতে গিয়ে মুসনাদ বলেন, বাবা-মায়ের স্বপ্ন ছিল আমাকে ঢাকায় পড়িয়ে বড় ডাক্তার বানাবেন। সেজন্য ছোটবেলা থেকেই বায়োলজি পড়ার বিষয়ের প্রতি অনেক ঝোঁক ছিল। সেই সাথে গল্প বই ও উপন্যাস পড়তে ভীষণ পছন্দ করতাম।

ঢাকায় যখন নিঃসঙ্গ মুসনাদ
২০০২ সালের মে মাস। তার দু’চোখ ভরা স্বপ্ন। আসেন যাদুর নগরী ঢাকায়। উঠেন রাজধানী ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট চাচার বাসায়। উচ্চমাধ্যমিকে পড়তে ভর্তি হন বিএএফ শাহীন কলেজে। কলেজ জীবনের স্মৃতি চারণ করে মুসনাদ বলেন, ছোটবেলা থেকেই আমি খুব বন্ধুবৎসল ও ভাল ছাত্র ছিলাম। সব ক্লাসেই অনেক বন্ধু ছিল। কিন্তু যখন ঢাকা শহরে আসি, তখন বাধা হয়ে দাঁড়ায় শহুরে কৃষ্টি-সংস্কৃতি ও নতুন পরিবেশ। গ্রাম থেকে উঠে আসার কারণে শহরের কোনো ক্লাসমেটই আমাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতে পারেনি। ভীষণ মন খারাপ হতো। কোন বন্ধু ছাড়াই কাটিয়ে দিই কলেজ জীবনের সোনালি দিনগুলো। অবশ্য এর নেচিবাচক প্রভাবও পড়ে উচ্চমাধ্যমিকের পড়াশোনায়।

অন্যদিকে, উচ্চমাধ্যমিক চূড়ান্ত পরীক্ষার তিন মাস আগে একদিন হঠাৎ দুঃসংবাদ পান মুসনাদ। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম শিক্ষক বাবা স্ট্রোক করেন। তার শরীর প্যারালাইজড হয়ে যায়। তখন জমি থেকে যে ফসল উৎপন্ন হতো তা দিয়ে কোনরকমে পরিবারের খরচ চলতো আবার চলতো না। এমন করুন টানাপোড়েনের মধ্য দিয়েও ২০০৪ সালে তিনি কৃতিত্বের সাথে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। এরপর আর্মি অফিসার হওয়ার জন্য আইএসএসবি প্রশিক্ষণের জন্য ভর্তি পরীক্ষা দেন। কিন্তু ভাগ্যদেবী প্রসন্ন হয়নি তার।

কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়েও হলো না পড়া  
২০০৫ সাল। এবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির হওয়ার পালা। বিভিন্ন নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দেন স্বপ্নবাজ এই তরুণ। একটা সময় ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়ে যান। ঢাকায় নতুন পরিবেশের সাথে নিজেকে খাপ খাওয়াতে না পারায় প্রচন্ড জেদ চেপে বসে তার মনে। সিদ্ধান্ত নেন যাদুর নগরী ঢাকা না ছাড়ার। যেকোন মূল্যেই নিজেকে যোগ্য, দক্ষ ও স্মার্ট করে তোলার প্রতিজ্ঞা করেন। তাই তার আর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া হলো না। টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার বিষয়ে ভর্তি হন ঢাকার এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে।

বাবার ব্রেইন স্ট্রোক, টাকার অভাবে বন্ধ পড়াশোনা  
উচ্চমাধ্যমিক পাস করতেই কেটে যায় প্রায় দুই বছর। জীবনের প্রয়োজনে নিজেকে আপডেট করেন অধ্যবসায়ী ছাত্র মুসনাদ। কথা-বার্তায়, চাল-চলনে, পোশাকে আনেন পরিবর্তন। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে বন্ধু পেতে অসুবিধা হয়নি তার। নতুন পরিবেশ, নতুন বন্ধু, জীবনটা বেশ ভালই চলছিল তার।

মুসনাদের ভাষ্য, পরিবারে বাবা ছিলেন একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। ব্রেইন স্ট্রোকের পর পরিবারে নেমে আসে অনিশ্চয়তার কালো ছায়া। এমন পরিস্থিতিতে আমার মনে হয়েছিল, যে পরিবারে প্রতিদিনের খাবার জোগানোই কষ্টকর, সেখানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াটা বিলাসিতা ছাড়া কিছুই না।

বিষয়টা অনেক আগে থেকেই উপলব্ধি করেছিলেন দূরদর্শী ও বিচক্ষণ মুসনাদ। তাই বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরু থেকে টিউশনি শুরু করেছিলেন। সেই টাকা দিয়েই পরপর তিনটি সেমিস্টার চালিয়ে নেওয়ার পর একটা সময়ে এসে সেমিস্টার ফি দেওয়া তার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। অবশেষে বন্ধ করে দেন পড়াশোনা। তখন পরিবারের সবাই তাকে গ্রামে ফিরে যাওয়ার অনুরোধ করেন। সবার নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে থেকে যান রাজধানী ঢাকায়। লক্ষ্য নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার।

মুসনাদের স্বপ্ন আকাশ ছোঁয়া
২০০৬ সাল। প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা বন্ধ, তাতে কি? ব্যক্তিগত পড়াশোনা একদিনের জন্যও বন্ধ হয়নি তার। নিজের প্রতি প্রবল আত্মবিশ্বাস ও ব্যতিক্রমী কিছু করার দৃঢ় মনোবল ও অদম্য ইচ্ছা তাকে সব সময় তাড়িয়ে বেড়াত।
  
আকাশ ছোঁয়া স্বপ্ন সম্পর্কে  মুসনাদ বলেন, সব সময় বড় কিছু করার স্বপ্ন দেখতাম। আর ভেতরে সে স্বপ্ন বাস্তবায়নের তাড়না উপলব্ধি করতাম। আমাকে অনেক বড় এবং ভাল কোন কিছু করতে হবে। মনের এই তাড়না থেকে ঢাকার ক্যান্টনমেন্টের এক চাচার বাসা থেকে বের হয়ে যাই নতুন কিছু করার উদ্দেশ্যে। শুরু হয় চ্যালেঞ্জিং জীবন। এরপর গিয়ে উঠি আর্মির আইএসএসবিতে পরীক্ষার সময় তৈরি হওয়া এক বন্ধুর কোচিং সেন্টারে। তখন কোচিং সেন্টারের স্টুডেন্ট পড়িয়ে এবং ম্যানেজারের কাজের বিনিময়ে থাকা-খাওয়ার অনুমতি মেলে।
  
স্কুল জীবন থেকেই মুসনাদের মনে তথ্যপ্রযুক্তির প্রতি আলাদা ভালোলাগা কাজ করত। তাই স্টুডেন্ট পড়ানোর পাশাপাশি সেই টাকা দিয়ে যুব উন্নয়নের পরিচালনায় তথ্যপ্রযুক্তি-বিষয়ক বিভিন্ন ক্যারিয়ারভিত্তিক প্রশিক্ষণে যোগ দেন। যেমন, কম্পিউটার এমএস অ্যাপ্লিকেশন, স্পোকেন ইংলিশ কোর্স ও বিসিকে উদ্যোক্তা উন্নয়ন কোর্স সম্পন্ন করেন।

২০১৬ সাল। হাঠাৎ দেশের সব কলসেন্টারের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। সে ধাক্কা লাগে মুসনাদের কল সেন্টারেও। অল্প সময়ে ভেঙে যায় সাজানো স্বপ্নের সম্ভাবনাময় সিঁড়িগুলো। এক ধাক্কায় ৪৫ জন কর্মী থেকে নেমে আসে ৯ জনে। যাদেরকে খুব যত্ন করে হাতে ধরে প্রশিক্ষণ দিয়ে নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সহযোদ্ধা হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন, দুর্দিনে তারাও মুসনাদকে ছেড়ে চলে যান।

সময়ের স্রোত বয়ে চলে। কোনরকমে স্টুডেন্ট পড়িয়ে সেই টাকা দিয়ে তথ্যপ্রযুক্তি ক্যারিয়ার বিষয়ে সফটস্কিল ডেভেলপমেন্টের উপর প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেকে চাকরির জন্য একটু একটু করে প্রস্তুত করতে থাকেন স্বপ্নবাজ এই তরুণ।

ইংরেজি শেখার প্রাণান্ত চেষ্টা
ইংরেজিতে খুব সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলা শুরু করেন মুসনাদ। এতো সুন্দর করে ইংরেজি বলার পেছনের রহস্য কী? জবাবে ইংরেজিতে দক্ষতা অর্জনের অভিজ্ঞতার কথা বললেন তিনি। তার ভাষ্য, আমি ইংরেজি শেখার জন্য বি. রহমান ও এফএম ম্যাথড কোর্সে যোগ দেই। দ্রুত পড়ার অভ্যাস গড়তে নিজস্ব কৌশল বের করি। প্রতিদিন উত্তরা থেকে বনানী বাসে চড়ে আসার সময় পথের পাশে যত ইংরেজিতে সাইনবোর্ড থাকত, সেগুলো দ্রুত পড়ার চেষ্টা করতাম। একদিন ‘হেলভেটিয়া’ রেস্তোঁরার বানান পড়া নিয়ে ঘটে বিপত্তি। হেলভেটিয়া ইংরেজি বানানের ‘এল টি এ’ তিনটি লেটারই উল্টো করে দেওয়া। তাই সাইনবোর্ডে বুঝতে না পেরে রেস্তোঁরার ভেতরে গিয়ে খাবারের মেনু কার্ডে গিয়ে আসল বানানটা দেখে সঠিকটা বুঝতে পারি।

কলসেন্টারের সাথে সখ্যতা 
২০০৮ সাল। সফটস্কিল ডেভেলপমেন্টের উপর বিভিন্ন ক্যারিয়ার-ভিত্তিক প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ফিরে পান অধ্যবসায়ী মুসনাদ। কেননা তিনি ছোটবেলা থেকেই সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলেন। আচার-আচরণ, কথা ও ব্যবহার দিয়ে খুব সহজে মানুষকে মুগ্ধ করতে পারতেন। এখন ইংরেজিতেও বেশ দক্ষ। দক্ষতা উন্নয়নের প্রশিক্ষণ নেওয়ার সময় জানতে পারেন কল সেন্টারের সেলস এবং কাস্টমার সার্ভিস চাকরির বিষয়ে।

স্বপ্নবাজ এই তরুণ বলেন, পেশাগত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ নিতে যোগ দিই আল আমির ইন্টারন্যাশনাল কল সেন্টারে। তিন মাস প্রশিক্ষণ শেষে কল সেন্টারে চাকরির জন্য চেষ্টা করি। তখন দেশে হাতে গোনা কয়েকটি কলসেন্টার চালু হয়। এগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল আন্তর্জাতিকমানের কল সেন্টার ‘এইচএমসি টেকনোলজি লিমিটেড’। সেখানে চাকরির বিজ্ঞাপন দেখে ইন্টারভিউ দেই। দিন যায়, সপ্তাহ যায়। কোন সাড়া নেই। ভাবছি চাকরি হবে না। দুই মাস পর কল আসে। জানানো হয় আমার চাকরিটা হয়েছে। যোগ দেই কাস্টমার সার্ভিস অ্যাজেন্ট হিসেবে। রাতে আট ঘণ্টা কলসেন্টারে ডিউটি। আবার সকালে ৫ ঘণ্টা ঘুমিয়ে বন্ধুর কোচিং সেন্টারে ৬-৭ ঘণ্টা স্টুডেন্ট পড়াই।

চাকরি বদল
চাকরিতে অল্পদিনেই খুব ভাল পারফরমেন্স দেখালেন আত্মবিশ্বাসী মুসনাদ। কাজের প্রতি তার সততা, বিশ্বস্ততা, আন্তরিকতা, একনিষ্ঠতা সমস্ত কাজে প্রভাব পড়ে। অর্জনের ঝুলিতে যোগ হতে শুরু হয় কল সেন্টারের অভিজ্ঞতা। ওই সময় এইচএমসি টেকনোলজিতে বেতন পেতেন ৯ হাজার টাকা। এ দিয়ে চলা কষ্ট হতো। আরও ভাল বেতনের আশায় ইন্টারভিউ দেন ‘লিগ্যাটো সার্ভিসেস লিমিটেড’ নামে আরেকটি কলসেন্টারে।

আত্মবিশ্বাসী মুসনাদ বলেন, কাস্টমার সার্ভিস বিষয়ে অভিজ্ঞতা নিয়ে ২০০৯ সালের জুন মাসে যোগ দেই লিগ্যাটো সার্ভিসে। বেতন ধরা হয় ২৪ হাজার ৫০০ টাকা। আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয় কাস্টমার রিলেশনস এক্সিকিউটিভ হিসেবে। কলসেন্টারে কাজকে ভালবেসে ফেলি। আত্মনিবেদিত মনোভাব নিয়ে কাজ করায় দেওয়া হয় প্রোমশন। প্রথমে টিম লিডার, পরে অপারেশন সুপার ভাইজার এবং শেষে কোয়ালিটি অ্যান্ড অপারেশন সুপার ভাইজার হই। আমার স্মার্ট ও ডায়নামিক নেতৃত্বে টিমে আসে গতিশীলতা। কোম্পানির ব্যবসায় যোগ হতে থাকে লাভের অংশ।

স্বপ্নবাজ এই তরুণের দুচোখ ভরা ছিল আরও ভাল কিছু করার স্বপ্ন। কেননা এখান থেকে তিনি রপ্ত করেন আন্তর্জাতিক কল সেন্টার পরিচালনার সকল কলা-কৌশল। অন্যদিকে, চাকরিতে বেতন বাড়ানোর ফলে বন্ধুর কোচিং সেন্টার ছেড়ে দেন। উঠেন পরিচিত একজনের বাসায় সাবলেট হিসেবে। বন্ধুর সাথে আলোচনা করে মঞ্জু স্যারের অনুমতি নিয়ে উত্তরায় ম্যাবস কোচিং সেন্টারের শাখা চালু করেন।

ভাগ্যদেবী যখন প্রসন্ন হয়
২০১১ সালের মাঝামাঝি। লিগ্যাটো কলসেন্টারে কোয়ালিটি অ্যান্ড অপারেশন সুপার ভাইজার হিসেবে অসাধারণ পারফরমেন্স দেখানোতে মার্কেটে মুসনাদের ডিমান্ড বেড়ে যায়। কলসেন্টার ইন্ডাস্ট্রিতে অনেকেই পছন্দ করতে শুরু করে। সে কারণে ডিজিকন টেকনোলজিস লিমিটেডের বিজনেস কনসালটেন্ট তাকে ডিজিকনে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেন। বিপত্তি বাধে তার একাডেমিক যোগ্যতা নিয়ে। ডিজিকনে গ্র্যাজুয়েট ছাড়া কাউকে চাকরিতে নেওয়া হয় না। তবুও তার যোগ্যতা ও দক্ষতা জন্য ডিজিকনের কর্তৃপক্ষ বিশেষ নিয়ম করে তাকে কোয়ালিটি অ্যানালিস্ট হিসেবে চাকরিতে নেওয়া হয়। শর্ত দুই বছরে পড়াশোনা করে তাকে গ্র্যাজুয়েটের সার্টিফিকেট জমা দিতে হবে। অদম্য অধ্যবসায়ী মুনসাদ সে চ্যালেঞ্জও গ্রহণ করে চাকরির পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ে পুনরায় একাডেমিক জীবন শুরু করেন। ডিজিকনে দিনে ডিউটি থাকায় কোচিং সেন্টারের পার্টারশিপ ছেড়ে দেন।

যে স্বপ্ন তাকে ঘুমাতে দেয়নি
দিনের বেলায় ডিউটি থাকায় রাতে ফ্রি হয়ে যান মুসনাদ। তখন ভাবেন এখন রাতে আমাকে নিজের জন্য কিছু করতে হবে। এ চিন্তা তাকে রাতে ঘুমাতে দেয়নি। মুসনাদ বলেন, তখন আমি আন্তর্জাতিক কল সেন্টারে ৫ বছর টেলি মার্কটিং কাস্টমার সার্ভিসেস কাজের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে ফ্রিল্যান্সার মার্কেটপ্লেজগুলোতে যেমন, ওডেস্ক (বর্তমান আপওয়ার্ক), ইল্যান্স, ফ্রিল্যান্সার ডটকমে আমার সংশ্লিষ্ট কাজের বিষয়ে নিজের প্রোফাইল (গিগ) তৈরি করে কাজের সন্ধান করতে থাকি।

প্রাণান্ত চেষ্টার ফলে ২০১১ সালের শেষের দিকে এসে একটা আমেরিকান কোম্পানির ঘন্টায় সাড়ে ৩ ডলারের টেলি মার্কটিংয়ের কাজ পান মুসনাদ। ক্লায়েন্টের ডিমান্ড অনুসারে মন-প্রাণ ঢেলে দিয়ে শুধু কাজ করতে থাকেন। কখন যে ৪০০ ডলার হয়ে গেছে বুঝতে পারেননি। তখনও তার কোন একাউন্ট ছিল না। টাকাও আনতে পারছিলেন না। পরে পেওনিয়ারে একাউন্ট খুলে ৬ মাসের চেষ্টার পর টাকা আনতে সক্ষম হন।

ফ্রিল্যান্সার হিসেবে জীবনে প্রথম একসাথে এতগুলো টাকা হাতে পাওয়ার অনুভূতি ব্যক্ত করে উচ্ছ্বাসিত মুসনাদ বলেন, ওই দিন মনে কি যে আনন্দ পেয়েছিলাম! যা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। এরপর আমার ফ্রিল্যান্সিং কাজের প্রতি ভালোবাসা ও আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। কাজে আরও আন্তরিক হয়ে সময় দিতে শুরু করি। ফলও পেতে থাকি। একের পর এক কাজ আসতে শুরু করে। সবই টেলি মার্কেটিং ও টেলি সেলসের। দিনে অফিস। রাতে ফ্রিল্যান্সিং। এভাবে চলছিল আমার ক্যারিয়ার গড়ার জীবন সংগ্রামের দিনগুলো।

ডিজিকন ছেড়ে এডিসনে  
একদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা, অন্যদিকে ডিজিকনের কলসেন্টারে কোয়ালিটি অ্যানালিস্ট হিসেবে চাকরি। রাতে ফ্রিল্যান্সিং করায় প্রতিদিন সকালে নিয়ম করে অফিসে আসতে তার ভীষণ কষ্ট হতো। একটা সময়ে এসে অফিসে ঠিক মতো উপস্থিত হওয়া নিয়ে বাধে বিপত্তি। প্রায়ই দেরিতে অফিসে যাওয়া নিয়ে ম্যানেজমেন্ট নানান কথা বলতেন।

মুসনাদ বলেন, ২০১২ সালে এসে পরিস্থিতি এমন হয় যে, ডিজিকনের চাকরিটা আর করা সম্ভব হচ্ছিল না। তখন ছেড়ে দিই। যোগ দেই এডিসন গ্রুপের মোবাইল ব্র্যান্ড সিম্ফনির কলসেন্টারের কো-অর্ডিনেটর হিসেবে। দিনে অফিসে ৮ ঘণ্টা চাকরি। রাতে আমেরিকার একটা টেলিকম সেন্টারে ৮-১০ ঘণ্টা  ফ্রিল্যান্সিং করি। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র ৪-৫ ঘণ্টা ঘুমানোর সুযোগ হতো। এভাবে চলতে থাকে দিন, সপ্তাহ, মাস ও বছর। সময় বয়ে চলে। কেটে যায় ২০১২ সাল।

দুই রুমের বাসায় তিন ল্যাপটপ দিয়ে শুরু স্বপ্নযাত্রা
২০১৩ সাল। স্বপ্ন বাস্তবায়নে ভাড়া নেন দুই রুম। যুব উন্নয়নের প্রশিক্ষণের সময় অনেক কষ্টে একটা স্যালুরণ ডি ল্যাপটপ কিনেছিলেন। এটি দিয়েই করতেন ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজ। পরে এডিসন গ্রুপের অফিস থেকে দেওয়া ল্যাপটপ, নিজের ল্যাপটপ ও কোচিংয়ের স্টুডেন্টেদের মধ্য থেকে যাদের ল্যাপটপ ছিল তাদের একজন, এই তিনজন মিলে যাত্রা শুরু হয় স্বপ্নের উদ্যোগের। দুই রুমের বাসার ড্রয়িং রুমকে অফিস করে চলছিল ফ্রিল্যান্সিং কার্যক্রম।

ক্লায়েন্ট যখন স্বপ্ন গড়ার নেপথ্যের কারিগর
২০১৩ সালের জুলাই মাস। কমিটমেন্ট অনুসারে সময় মতো ক্লায়েন্টদের গুণগতমানসম্পন্ন কাজ করে দিতেন মুসনাদ। কাজে খুশি হয়ে ক্লায়েন্টরা তাকে একটা কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করার তাগিদ দেন। তারা বলেন, তুমি একটা টিম তৈরি করলে ভাল কিছু করতে পারবে। মুসনাদ ভাবেন হাতে তো মাত্র দেড় লাখ টাকা জমানো আছে। তখন সিম্ফনির কল সেন্টারের সেলারি একাউন্ট দিয়ে ব্যাংক থেকে ৩ লাখ ২৫০০০ হাজার টাকা লোন নেন। সেপ্টেম্বর মাসে কোম্পানি চালু করার সিদ্ধান্ত নেন।

স্বপ্ন যখন ডানা মেলে
২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর। লোনের টাকা, এডিসন গ্রুপের চাকরির সেলারি ও ফ্রিল্যান্সিংয়ের আয়ের টাকায় ১ হাজার ৪৫০ স্কয়ার ফিটের অফিস ভাড়া নেন মুসনাদ। এক রুমে নিজে থাকতেন। অন্য রুমে  ১২টা ওয়ার্ক স্টেশন সেটআপ করেন। অফিসের ডেকরেশন, ভাড়ার খরচ এবং বাকি টাকা দিয়ে ল্যাপটপ কিনেন।

মুসনাদ বলেন, আমার সব মিলে ল্যাপটপ ছিল ৫টা। বাকি থাকে ৭টি। তখন কোচিংয়ে পড়ানো স্টুডেন্টেদের মধ্যে যাদের ল্যাপটপ ছিল তাদের ডেকে ১২ হাজার টাকা করে দেওয়ার চুক্তিতে চাকরি দেওয়া শুরু করি। একে একে নতুন নতুন প্রজেক্ট আসা শুরু হয়। পরে ৪টা স্টেশন করি। এরপর ৪টা থেকে ২৫টা করে ফেলি। তখন ওই বিল্ডিংয়ের উপরের ফ্লোর ভাড়া নিয়ে সেখানে থাকি। আর নিচের পুরোটা অফিস করে ফেলি।

সীমানা ছাড়িয়ে কাজ করবে স্কাইটেক
দিন দিন কোম্পানির আয়ের পরিমাণ বেড়ে গেলে ট্রেড লাইসেন্স করা জরুরি হয়ে উঠে। তখন কোম্পানির নামের প্রয়োজন হয়। পরিচালনা পরিষদের সবার মতামত নিয়ে নাম দেওয়া হয় ‘স্কাইটেক সলিউশনস’। উদ্দেশ্য কোম্পানির কাজ হবে সীমাহীন। সারা পৃথিবীর কাজই করবে স্কাইটেক।

এডিসন গ্রুপ থেকে কেইমুতে
২০১৫ সালের জানুয়ারি মাস। এডিসন গ্রুপের সিম্ফনি মোবাইলের কলসেন্টারের কো-অর্ডিনেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করে চাকরিটা ছেড়ে দেন তিনি। হেড অব কাস্টমার সার্ভিস হিসেবে যোগ দেন অনলাইন প্লাটফর্ম কেইমু ডটকমে।

অধ্যবসায়ী মুসনাদ বলেন, চাকরি জীবনে লক্ষ্য ছিল একটা ডিপার্টমেন্টের হেড হওয়া, সেটা হয়েছি। ব্যবসার লক্ষ্য ছিল সফল একজন উদ্যোক্তা হওয়া। সেটি হওয়ার সাধনায় আছি। ২০১৫ সালের শেষের দিকে কেইমুর চাকরিটাও ছেড়ে দেই। পুরো মনোযোগ দেই নিজের উদ্যোগে। চাকরি ছাড়ার পর রাতে তো আমেরিকার প্রজেক্টে ফ্রিল্যান্সিং করি। দিনের বেলায় বেকার। তখন দিনে কাজের জন্য অস্ট্রেলিয়ার প্রজেক্ট এনে কাজ শুরু করি। কোম্পানির আয় বৃদ্ধি হওয়ার সাথে সাথে ওই বিল্ডিংয়ের তিনতলার ফ্লোরও নিয়ে নিই। ২৫টা স্টেশন থেকে করে ফেলি ৪৫টিতে। সময় দ্রুত বয়ে চলে।

আমি কিছু সার্ভিস ডিজাইন করেছি যেগুলো দিয়ে আমেরিকার মার্কেটে সরাসরি কাস্টমারদের সাথে সেলস এবং মার্কেটিংয়ের কাজ করি। আমি সরাসরি কনট্রাক্টলি ও কনট্রাক্টে কাজ করি, যার ফলে বাংলাদেশে বসে আমেরিকার মার্কেট থেকে কাজ আনার সময় মাঝে যে থার্টপার্টির ক্লায়েন্ট ছিল তারা আর থাকল না। থার্টপার্টির ক্লায়েন্টদের সরিয়ে দিয়ে আমি নিজেই যখন ক্লায়েন্ট হয়ে যাই তখন সেখানে একটা কোম্পানি তৈরি করার প্রয়োজন হয়। তখন আমেরিকার নিয়ম-কানুন মেনে সেখানে একটা নতুন কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করি।

বিশ্ববিদ্যালয়কে বিদায়
দিনে অফিস। রাতে নিজের কোম্পানির পুরো ম্যানেজমেন্টের কাজ। বিদেশের ক্লায়েন্টের কাছ থেকে প্রজেক্ট আনা। টিম লিডার হিসেবে কর্মীদের দিয়ে সব কাজ করিয়ে নেওয়া। আবার সে কাজ ক্লায়েন্টকে বুঝিয়ে দেওয়া। সবই এক হাতে সামলাতেন মুসনাদ। এরই ফাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা। সবই চলছিল সমান তালে। কঠোর পরিশ্রম, অবিরাম সাধনা ও অধ্যবসায়ের পর ২০১৪ সালে মুসনাদ বিবিএ পাস করেন। হন গ্র্যাজুয়েট।

প্রকৃতির প্রতিবাদ
শরীরের প্রতি দিনের পর দিন অযত্ন ও অবহেলার ফলে একটা সময়ে এসে প্রতিবাদ শুরু করে মুসনাদের শরীর। কিডনীতে ধরা পড়ে সমস্যা। ডাক্তার তাকে প্রতিদিন কম করে ৭ ঘণ্টা ঘুমানোর নির্দেশ দেন। ততদিনে তার কোম্পানি থেকে ভাল পরিমাণে টাকা আয় হওয়া শুরু হয়ে যায়।

ভেঙে যায় স্বপ্নের সিঁড়ি
২০১৬ সাল। হাঠাৎ দেশের সব কলসেন্টারের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। সে ধাক্কা লাগে মুসনাদের কল সেন্টারেও। অল্প সময়ে ভেঙে যায় সাজানো স্বপ্নের সম্ভাবনাময় সিঁড়িগুলো। এক ধাক্কায় ৪৫ জন কর্মী থেকে নেমে আসে ৯ জনে। যাদেরকে খুব যত্ন করে হাতে ধরে প্রশিক্ষণ দিয়ে নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সহযোদ্ধা হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন, দুর্দিনে তারাও মুসনাদকে ছেড়ে চলে যান। অর্জিত স্বল্প অভিজ্ঞতার আলোকে তারা শুরু করেন নতুন নতুন কলসেন্টার উদ্যোগ। যদিও সে উদ্যোগ আলোর মুখ দেখেনি।

ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয়ে নতুন যাত্রা
‘যদি লক্ষ্য থাকে অটুট, বিশ্বাস হৃদয়ে, হবেই হবেই দেখা, দেখা হবে বিজয়ে’ কণ্ঠ শিল্পীর এই কথাগুলোকে হৃদয়ে ধারণ করেন মুসনাদ। দীক্ষা নেন ঘুরে দাঁড়ানোর মন্ত্রে। দৃঢ় প্রত্যয়ে শুরু করেন নতুনভাবে সব কার্যক্রম। আগের ব্যবসায় আয় হওয়া ব্যাংকে জমানো ১০ লাখ ফিক্স ডিপোজিট ভেঙে ৯ জনকে নিয়ে আবার কার্যক্রম চালু করেন। মাত্র ৬ মাসে ব্যবসায় আসে সাড়ে তিন কোটি মার্কিন ডলারের কাজ। তার স্বপ্নে যোগ হয় নতুন পালক। ৯ জন থেকে কর্মী বেড়ে দাঁড়ায় ৫৫ জনে। মাসে বেতন দিতে হতো ৪০ লাখ টাকা। মাসে আয় থাকতো ১৫ লাখ টাকার বেশি। দুরন্ত গতিতে এগিয়ে যেতে থাকে তার স্বপ্ন। সেই যে ঘুরে দাঁড়ানো, আর পেছনে ফিরে থাকাতে হয়নি তাকে।

নতুন সৃষ্টির নেশায় সৃজনশীল মুসনাদ
২০১৭ সাল। দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকা, কানাডার বিভিন্ন ক্লায়েন্টের জন্য কাজ করার পর মুসনাদ উপলব্ধি করেন যে তার নিজেই ক্লায়েন্ট হওয়ার সময় এসে গেছে। সরাসরি আমেরিকার মার্কেটে কাজ করবেন। মাঝে কোন মিডিয়েটর বা মাধ্যম থাকবে না। যে কাজের মাধ্যমে জন্ম হবে সৃজনশীল মুসনাদের। সেলস এবং মার্কেটিং নিয়ে এমন কিছু সার্ভিস ডিজাইন করবেন যেগুলো দেশের বিপিও ইন্ডাস্ট্রিতে কলসেন্টারে ব্যবহার করা যাবে। সেই সাথে আন্তর্জাতিক বাজারেও সেগুলোর চাহিদা থাকবে।

এ বিষয়ে তার ভাষ্য, আমি কিছু সার্ভিস ডিজাইন করেছি যেগুলো দিয়ে আমেরিকার মার্কেটে সরাসরি কাস্টমারদের সাথে সেলস এবং মার্কেটিংয়ের কাজ করি। আমি সরাসরি কনট্রাক্টলি ও কনট্রাক্টে কাজ করি, যার ফলে বাংলাদেশে বসে আমেরিকার মার্কেট থেকে কাজ আনার সময় মাঝে যে থার্টপার্টির ক্লায়েন্ট ছিল তারা আর থাকল না। থার্টপার্টির ক্লায়েন্টদের সরিয়ে দিয়ে আমি নিজেই যখন ক্লায়েন্ট হয়ে যাই তখন সেখানে একটা কোম্পানি তৈরি করার প্রয়োজন হয়। তখন আমেরিকার নিয়ম-কানুন মেনে সেখানে একটা নতুন কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করি।

স্থানীয় উদ্যোক্তাদের ভরসা
সময়ের পালা-বদলে স্কাইটেকের কাজের পরিধি বাড়তে থাকে। তাই দেশের ৭-৮ টি কলসেন্টারের উদ্যোক্তাদের নিয়ে সেলস ও কাস্টমার সার্ভিসের কাজগুলো করে যাচ্ছেন স্বপ্নবাজ এই উদ্যোক্তা। এতে উদ্যোক্তাদেরও কর্মসংস্থান হচ্ছে। অন্যদিকে বৈদাশিক আয়ও যোগ হচ্ছে দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে।

আন্তর্জাতিক বাজারে বিপিও সেবা দিচ্ছে স্কাইটেক
স্কাই টেক সলিউশনস মূলত আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া এবং কানাডার বাজারে বিপিও সেবা দিচ্ছে। যার মধ্যে বেশিরভাগ ক্লায়েন্টই আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়ার। কানাডাতেও রয়েছে বেশ কিছু ক্লায়েন্ট। এদের মধ্যে আমেরিকার কিছু লোনদাতা, লজিস্টিকস ও লোকাল সার্ভিস প্রোভাইডার কোম্পানির পক্ষে টেলিমার্কেটিং সার্ভিস দিয়ে থাকে।

মুসনাদের ভাষ্য, স্কাইটেক বিজনেস টু বিজনেস (বিটুবি) এবং বিজনেস টু কাস্টমার (বিটুসি) প্রসেস নিয়ে কাজ করে থাকে। এছাড়াও  প্রতিষ্ঠানটি আমেরিকার ৩০ টি স্টেটের প্রায় ৫০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠানের হয়ে তাদের গ্রাহক খুঁজে দিতে সাহায্য করে। সেই সাথে আমেরিকার বেশ কিছু ই-কমার্স এবং ফুড ডেলিভারি কোম্পানির ভয়েস কাস্টমার সাপোর্ট, চ্যাট সাপোর্ট এবং ইমেইল সাপোর্ট দিয়ে থাকে। অস্ট্রেলিয়াতে কোম্পানিটি সোলার অ্যাপয়েনমেন্ট সেটিং এবং দেশটির সরকারের এনার্জি সেভিং প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে টেলিমার্কেটিং সেবার মাধ্যমে অ্যাপয়েনমেন্ট সেট করে থাকে। আর কানাডার একটি গ্রাহকের হয়ে আমেরিকা, লন্ডন এবং কানাডাতে তারা গুগল ম্যাপ এসইও সাপোর্টসহ দেশগুলোর লোকাল কোম্পানির লিড জেনারেশন, ব্যাক অফিস সাপোর্ট এবং কাস্টমার সাপোর্ট দিয়ে থাকে।

স্কাইটেক সলিউশনসের বাৎসরিক আয় 
কোম্পানির আয় নিয়ে সফল এই উদ্যোক্তা বলেন, স্কাইটেক সলিউশনসে বর্তমানে সাড়ে ৬০০ কর্মী কাজ করছেন। এতে করে এখান থেকে আমাদের যে আয় হয় তা হিসেব করলে গড়ে আয় দাঁড়াবে সাড়ে ৫ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি। বাংলাদেশ বসেই বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে টেলি-মার্কেটিং সেবা দিয়ে আমাদের তরুণ-তরুণীরা আন্তর্জাতিক বাজার থেকে এই টাকা আয় করছেন।

নতুনদের প্রতি পরামর্শ
যারা কলসেন্টার কাস্টমার সার্ভিসেস সেক্টরে উদ্যোক্তা হিসেবে আসতে চায় তাদের প্রতি মুসনাদের পরামর্শ হলো, কারো মনে যদি শূন্য থেকে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রবল ইচ্ছে ও জেদ থাকে, তাহলে সে একদিন লক্ষ্যে পৌঁছাবেই। পৃথিবীর কোন শক্তিই তাকে সে লক্ষ্য থেকে সরাতে পারবে না। তবে প্রথমে একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্য স্থির করতে হবে। যে বিষয়ে স্কিল আছে সে বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ নিয়ে একটা স্কিলসেট তৈরি করতে হবে। সময়ের সাথে সাথে মার্কেটে কাজের ধরণ, চাহিদা, টেকনোলজি সব পরিবর্তন হয়। সেটা নিয়ে প্রচুর পড়াশোনা করতে হবে। দেশ ও আন্তর্জাতিক কলসেন্টার কাস্টমার সার্ভিসের পুরো বিষয়গুলো আপডেট বিষয়ে ধারণা রাখতে হবে। কাজের প্রতি সৎ, অধ্যবসায়ী, আত্মনিবেদিত ও আন্তরিক হতে হবে। জীবনে সফল হতে কঠোর পরিশ্রমের কোন বিকল্প নেই।

বিপিও খাতের চ্যালেঞ্জ
বিপিও খাতের অনেকগুলো চ্যালেঞ্জের মধ্যে কিছু চেলেঞ্জের বিষয়ে তুলে ধরেন মুসনাদ। তিনি বলেন, এই সেক্টরের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে পেমেন্ট গেটওয়ে ইস্যু। এরপরেই আছে মানবসম্পদ তৈরি করা, সংশ্লিষ্ট সরকারী নানা দপ্তরে যেসব কার্যক্রম আছে, সেগুলোকে আরও তরান্বিত করা। যেমন, আইপি চেঞ্জ করা, ব্যান্ডউইথ বাড়ানো, কলসেন্টার পরিধি বাড়ানো ইত্যাদি অনুমোদন নেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের অনেক সময় প্রয়োজন হয়। এছাড়াও আমাদের মত রেজিস্টার্ড কলসেন্টারগুলোর জন্য ভয়েস ওভার ইন্টারনেট প্রটোকল (ভিওআইপি) বা ভয়েস ব্যান্ডউইথ লিমিট তুলে দেওয়া প্রয়োজন। আর যদি এই সেবাকে রেস্ট্রিকশনের মধ্যে রাখেই, তাহলে অনুমোদনের সময় এবং যাচাই বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সময়টাকে কমিয়ে আনতে হবে। এইগুলোই এখন আমাদের কাছে চ্যালেঞ্জ মনে হয়।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা  
মুসনাদ বলেন, আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হচ্ছে, আমার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক মার্কেটের পাশাপাশি আমাদের দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে আন্তর্জাতিক মানের সেবা দেওয়া। আমরা দেশের বাজারে আন্তর্জাতিকমানের সেবা দিতে চাই। সেই লক্ষ্যে আমাদের কার্যক্রম চলছে। এ ভবনে আমাদের সাড়ে ৩০০ কর্মী কাজ করছে। পান্থপথে আরও একটা অফিস আছে। আগামী ২০২৫ সালে আমাদের কার্যক্রমের পরিধি আরও বড় করার পরিকল্পনা রয়েছে। আমি একজন স্বপ্নবাজ মানুষ। এখনও আমার ব্যবসাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখি। এটাকে নিয়ে অনেক দূর যেতে চাই।
 

সংবাদটি পঠিত হয়েছে: ২২৬৫ বার

SPACE FOR AD (760 X 180)

মুখোমুখি সম্পর্কিত নিউজ